সাকিব আল হাসান। বিশ্বসেরা এই অলরাউন্ডারের জন্মদিন আজ। ৩১ বছরে পা দিলেন বাংলাদেশের কীর্তিমান এই ক্রিকেটার।

১৯৮৭ সালে আজকের এই দিনে মাগুরা জেলায় জন্মগ্রহণ করেন সাকিব।

শুক্রবার মিরপুরে নিজের রেস্তোরায় ভক্তদের সাথে জন্মদিনের আগাম কেক কাটেন এই টাইগার অধিনায়ক। যেকোনো দুঃসময়ে তার পাশে থাকার জন্য ভক্তদের ধন্যবাদ জানান সাকিব। এ সময় তিনি ভক্তদের কাছে দোয়া চেয়ে বলেন, বাংলাদেশ দলকে যেন সামনে এগিয়ে নিতে পারেন।

নিদাহাস ট্রফি জিততে না পারার আফসোস এখনো যাচ্ছে না সাকিবের, ‘খুব কাছ থেকে ফিরে আসছি। জানি আপনারা হতাশ। খুব কাছ থেকে ফিরে আসছি, এটা মেনে নেওয়াও কঠিন। চেষ্টা করছি এভাবে যেন বারবার ফিরে আসতে না হয়। সবাই আমাদের জন্য দোয়া করবেন, যেন বাংলাদেশ দলকে সামনে এগিয়ে নিতে পারি। সামনে বড় সিরিজ, টুর্নামেন্ট আছে। আগামী বছর বিশ্বকাপ আছে।’

শিরোপা জিততে না পারলেও নিদাহাস ট্রফিতে বাংলাদেশের প্রাপ্তি কম দেখছেন না সাকিব, ‘এই সিরিজের চারটি ম্যাচই ভালো খেলেছি। প্রমাণ করেছি আমরা পারি। এটা ধরে রাখাই আমাদের লক্ষ্য। এটি যেন ধরে রাখতে পারি, যে ভুলগুলো করেছি, সেগুলো যেন শুধরে নিতে পারি। টি-টোয়েন্টির মতো সংক্ষিপ্ত সংস্করণে ছোট ছোট বিষয় অনেক বড় হয়ে ওঠে। ৫-১০ রান, এক-দুটি বাউন্ডারি বড় হয়ে ওঠে।’

Posted by Shakib Al Hasan on Freitag, 23. März 2018

সাকিবের ক্রিকেট ক্যারিয়ার 

২০০৬ সালের ৬ আগস্ট জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় সাকিব আল হাসানের। একই বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেই খুলনায় টি-২০ ও পরের বছর চট্টগ্রামে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট অভিষেক হয়।

ওয়ানডে অভিষেকের পরের বছরই ভারতের বিপক্ষে চট্টগ্রামে টেস্টে অভিষেক হয় সাকিবের। আর ২০০৬ সালে খুলনায় জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ক্রিকেটের সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ম্যাচ খেলেন তিনি।

২০০৯ সালে একমাত্র বাংলাদেশী অলরাউন্ডার হিসেবে ওয়ানডে অলরাউন্ডার র‌্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষস্থান দখল করেন তিনি। এরপর টেস্টেও এক নম্বর আসনটি পাকা করেন। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ক্রিকেটের তিন ফরম্যাটে সেরা অলরাউন্ডার হন সাকিব। সম্প্রতি ইনজুরির কারণে বেশ কয়েকটি ম্যাচে মাঠে নামতে না পারায় অলরাউন্ডারের টি-২০ ফরম্যাটে তিন নম্বরে নেমে গেছেন এই বাঁ-হাতি অলরাউন্ডার।

ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে তিন শ’টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন সাকিব।

৫১ টেস্টে ৯৬ ইনিংসে ব্যাট করে ৪০.৩৮ গড়ে ৩৫৯৪ রান করেছেন। রয়েছে পাঁচটি সেঞ্চুরি ও ২২টি হাফসেঞ্চুরি। সাদা পোশাকে তার সর্বোচ্চ ইনিংস ২১৭। এটি আবার বাংলাদেশের ইতিহাসেও সর্বোচ্চ। সমান টেস্টে ৮৬ ইনিংসে বল করে পেয়েছেন ১৮৮টি উইকেট। যেখানে বোলিং গড় ৩২.৩৭ ও ইকোনোমি ৩.০১।

ওয়ানডেতে ১৮৫ ম্যাচে ১৭৪ ইনিংসে ৩৪.৯৫ গড়ে ৫২৪৩ রান করেছেন সাকিব। সেঞ্চুরি হাঁকিয়েছেন সাতটি। হাফ সেঞ্চুরি ৩৭টি। বল হাতে ওয়ানডেতে শিকার করেছেন ২৩৫টি উইকেট। সেরা ৪৭ রানে ৫ উইকেট।

আর টি-২০তে ৬৩ ম্যাচে ৬৩ ইনিংসে ২২.৪৯ গড়ে করেছেন ১২৩৭ রান। অর্ধশত সাতটি। বল হাতে নিয়েছেন ৭৫টি উইকেট।

আরো কিছু কথা…

তরুণ বয়সেই খেলাপাগল ছিলেন সাকিব। তার বাবা খুলনা বিভাগের হয়ে খেলতেন এবং এক কাজিন বাংলাদেশ জাতীয় দলের হয়ে। এরকম ফুটবল পাগল পরিবারে বড় হওয়া সত্ত্বেও সাকিবের ক্রিকেট দক্ষতা ছিল অসাধারণ। গ্রাম-গ্রামান্তরে তাকে খেলার জন্য ভাড়া করে নিয়ে যাওয়া হত। এরকমই এক ম্যাচে সাকিব এক আম্পায়ারকে অভিভূত করেছিলেন যিনি পরবর্তীতে সাকিবকে ইসলামপুর পাড়া ক্লাব ( মাগুরা ক্রিকেট লীগের একটি দল) এর সাথে অনুশীলন করার সুযোগ করে দেন।

সাকিব তার স্বভাবসুলভ আক্রমণাত্মক ব্যাটিং ও দ্রুতগতির বোলিং অব্যাহত রাখেন, সেই সাথে প্রথমবারের মত স্পিন বোলিং নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন ও সফল হন। ফলস্বরূপ, ইসলামপুর দলে খেলার সুযোগ পান এবং প্রথম বলেই উইকেট তুলে নেন। সত্যিকারের ক্রিকেট বল দিয়ে এটাই ছিল তার প্রথম করা বল। এর আগ পর্যন্ত তিনি টেপড টেনিস বল দিয়েই খেলতেন তিনি।

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সাকিব অনূর্ধ্ব​-১৯ দলে খেলার সুযোগ পান। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব​-১৯ ত্রি-দেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে (অপর দুটি দেশ ছিল ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা) মাত্র ৮৬ বলে সেঞ্চুরি করে ও তিনটি উইকেট নিয়ে দলকে জেতাতে সহায়তা করেন তিনি। ২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সাকিব অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ১৮টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। ৩৫.১৮ গড়ে তিনি মোট ৫৬৩ রান সংগ্রহ করেন এবং ২০.১৮ গড়ে নেন মোট ২২টি উইকেট।

একজন অল-রাউন্ডার হওয়া সত্ত্বেও ২০০৮ সালের অক্টোবরে নিউজিল্যান্ডের বাংলাদেশ ট্যুরের আগ পর্যন্ত সাকিবকে বোলার নয়, ব্যাটসম্যান হিসেবেই গণ্য করা হত। টেস্টে সাত নম্বরে ব্যাটিংয়ে নামলেও ওয়ানডেতে কিন্তু প্রথম পাঁচ ব্যাটসম্যানের মধ্যেই থাকতেন তিনি। ট্যুরের আগ দিয়ে কোচ জিমি সিডন্স জানালেন, সাকিবকে স্পেশালিস্ট বোলার হিসেবেই টেস্ট সিরিজ খেলানো হবে।

কোচকে হতাশ করেননি সাকিব। উদ্বোধনী টেস্টের প্রথম ইনিংসেই তিনি ৩৭ রান দিয়ে তুলে নেন ৭টি উইকেট। তখন পর্যন্ত কোন বাংলাদেশী বোলারের টেস্টে এটাই ছিল বেস্ট বোলিং ফিগার। বাংলাদেশ সিরিজ হারে ২-০ তে, কিন্তু সাকিব ১৭.৮০ গড়ে ১০টি উইকেট নিয়ে সিরিজের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হন। ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জয় পায়। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ওয়ানডেতে এটাই ছিল বাংলাদেশের প্রথম জয়। শেষ পর্যন্ত অবশ্য স্বাগতিক দল সিরিজ হারে ২-১ এ। সাকিব ৩ ম্যাচে ৫ উইকেট তুলে নিয়ে মাশরাফি মর্তুজা (৭ উইকেট)’র পেছনে থেকে সিরিজে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী হন।

পরের মাসেই বাংলাদেশ দল দুটি টেস্ট, তিনটি ওয়ানডে ও একটি টি-২০ খেলতে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে যায়। সাকিবের বোলিং পারফরম্যান্স এখানেও অব্যাহত থাকে। প্রথম টেস্টের প্রথম দিন সাকিব উইকেটশূন্য থাকলে মোহাম্মদ সালাহউদ্দীন, বাংলাদেশের তৎকালীন সহকারি কোচ, তাকে বলে ‘ফ্লাইট’ দেয়ার পরামর্শ দেন। গুরুর উপদেশ শিরোধার্য করে সাকিব দ্বিতীয় দিনেই পাঁচ-পাঁচটি উইকেট তুলে নেন। দ্বিতীয় টেস্টে সাকিব আবারও এক ইনিংসে পাঁচ উইকেট তুলে নেন। সিরিজ শেষে সাকিবের ঝুলিতে জমা হয় ২০.৮১ গড়ে ১১টি উইকেট।

সাকিবের বোলিং দেখে মুগ্ধ অস্ট্রেলিয়ার সাবেক লেগ স্পিনার ক্যারি ও’ কীফে তাকে ‘বিশ্বের সেরা ফিঙ্গার স্পিনার’ হিসেবে অভিহিত করেন। ২০০৮ এর ডিসেম্বর মাসে শ্রীলঙ্কা এদেশে দুটি টেস্ট ও একটি ত্রি-দেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্ট (অপর দলটি ছিল জিম্বাবুয়ে) খেলতে আসে। দুটো টেস্টই শ্রীলঙ্কা জিতে নেয়। সেই সাথে ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ফাইনালও। গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে অবশ্য সাকিবের করা ৯২* রানের ইনিংসটি বাংলাদেশকে শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে সিরিজের একমাত্র জয়ের স্বাদ এনে দেয়। সাকিব ম্যান অব দ্য ম্যাচ নির্বাচিত হন। ২০০৯ সালের ২২ জানুয়ারি সাকিব আইসিসি’র ওডিআই অল-রাঊন্ডার র‌্যাঙ্কিংয়ে ১ নম্বরে উঠে আসেন।

এরপর ২০১১ সালে আইপিএল এর নিলামে তাকে ৪ লাখ ২৫ হাজার ডলারের বিনিময়ে কলকাতা নাইট রাইডার্স কিনে নেয়। দীর্ঘ সময় দলটির হয়ে খেলেন তিনি। আইপিএলের এবারের আসরে সাকিবকে দলে ভেড়ায় সানরাইজার্স হায়দরাবাদ।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here