আওয়ামী লীগ-বিএনপি গলায় গলায় পিরিত!

শুক্রবার, ৩০ মার্চ ২০১৮

কামরুজ্জামান খান, খুলনা থেকে : বাংলাদেশের অন্য যে কোনো এলাকার চেয়ে খুলনার রাজনৈতিক অঙ্গনের চিত্র অনেকটা ভিন্ন। বলতে গেলে পুরোপুরি উল্টো। এখানে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে বেজায় ভাব! অনেকে বলেন, গলায় গলায় পিরিত। কেউবা বলেন, মানিক জোড়। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড যে যার মতো করে করলেও দুদলের নেতাদের মধ্যে আড্ডাবাজি ও ব্যবসা-বাণিজ্য চলে সমানতালে। অনেকেই আবার আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। প্রতিপক্ষ বা প্রতিদ্ব›দ্বী হিসেবে পরিচিত বড় দল দুটির রাজনৈতিক কার্যালয়ও অনেকটা কাছাকাছি অবস্থিত। দলীয় কার্যালয়ের বাইরে বিএনপি বড় ধরনের সভা সমাবেশের তেমন অনুমতি না পেলেও কেসিসি নির্বাচনকে সামনে রেখে তাদের প্রচার-প্রচারণা চলছে সমানতালে। স্মার্টকার্ড বিতরণ কর্মসূচিকেও তারা কাজে লাগাচ্ছে প্রচারণায়। মোট কথা, সম্প্রীতি ও সাংগঠনিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে আগেভাগেই কেসিসি নির্বাচনের মাঠ গুছিয়ে নিচ্ছে বিএনপি। গুঞ্জন রয়েছে- কেসিসির কাউন্সিলর পদে বিএনপির আধিক্য থাকলেও এখানে অনেক ঠিকাদারি কাজের ভাগ-বাটোয়ারা হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের সমঝোতায়।

২০১৫ সালে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জ্বালাও-পোড়াও, নাশকতা এবং অরাজকতার সময় খুলনার চিত্র কিছুটা হলেও স্বস্তিদায়ক ছিল। তাই বিএনপি নেতাকর্মীদের নামে মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তারের সংখ্যাও কম। বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামীর এখানে প্রকাশ্যে তৎপরতা না থাকলেও তারা ঠিকই মিশে আছে ধানের শীষে।

সরেজমিন দেখা গেছে, নির্বাচন কমিশনের স্মার্টকার্ড বিতরণ কর্মসূচিকে ঘিরে কেসিসির সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা বেশ সরব। এই সুযোগে তারা ব্যানার, ফেস্টুনে (স্থানীয় ভাষায় প্যানা) ছেয়ে ফেলছে এলাকা। আওয়ামী লীগের সঙ্গে পাল্লা দিয়েছে রয়েছে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। বরং তারা আরেক ধাপ এগিয়ে বিলি করছে বিভিন্ন ধরনের লিফলেট। আবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ও তারেক রহমানের মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে দেয়ালে ও বহুতল ভবনজুড়ে টাঙানো হয়েছে বড় বড় ব্যানার। লাগানো হয়েছে পোস্টার। স্মার্টকার্ড যেদিন যেসব স্থানে বিতরণ করা হচ্ছে বিএনপির নেতাকর্মীরা সেখানে গিয়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নির্বাচনী আমেজে ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করছেন। এ ছাড়া কেসিসির ৩১টি ওয়ার্ডের একাধিক মহল্লা ঘুরে দেখা গেছে বিএনপির অসংখ্য পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন। বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে বিএনপির ফ্রি স্টাইল প্রচার-প্রচারণার খবর। ২৮৮টি ভোটকেন্দ্রভিত্তিক কাজ করছে তারা।

অন্যদিকে ৩১টি ওয়ার্ডের প্রায় সবখানেই রয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যালয়। যার অধিকাংশই বলতে গেলে অনেকটাই পাশাপাশি, কাছাকাছি। দলীয় কার্যালয়গুলো সকাল থেকেই নেতাকর্মীদের আনাগোনায় মুখরিত দেখা গেছে। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নেতাকর্মীদের তৎপরতা বাড়ে। আড্ডা গল্পের ছলে চলে রাজনীতি। সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা চালায় জনসংযোগ প্রচারণা।

এ প্রসঙ্গে খুলনা মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, খুলনা সিটি করপোরেশনের (কেসিসি) সাবেক মেয়র ও বাগেরহাট-৩ আসনের বর্তমান সাংসদ তালুকদার আবদুল খালেক বলেন, খুলনায় বিএনপির আগাগোড়াই ভালো অবস্থান। থানার পাশে তাদের দলীয় কার্যালয়, তারা সেখানে সংগঠনের কাজকর্ম করে। আওয়ামী লীগ তাদের কোনো কাজে বাধা দেয় না। কেসিসি নির্বাচনে বিএনপির সম্ভাব্য মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীদের প্রচারণা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাধা না পেয়ে তারা এসব করছে। আমাদের কাজ আমরা করছি। বিএনপির কাজে বাধা দেয়া আওয়ামী লীগের কাজ না।

মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও খুলনা-২ আসনের সাংসদ আলহাজ মিজানুর রহমান বলেন, রাজনীতি করা গণতান্ত্রিক অধিকার। বিএনপির প্রচার-প্রচারণা ও কর্মকাণ্ডে আওয়ামী লীগ বাধা দিতে পারে না, দেয় না। তবে তারা কোনো ধরনের উল্টাপাল্টা কাজ করলে, প্রচারণা চালালে অবশ্যই প্রতিহত করা হবে। তিনি বলেন, খুলনা আওয়ামী লীগ অতীতের চেয়ে অনেক বেশি সংগঠিত। মানুষকে ভুল বুঝিয়ে যে কারণে গতবার এখানে ভোটের ফ্লু ঘুরানো হয়েছিল এবার সবাই তা বুঝতে পেরেছে। আওয়ামী লীগের প্রস্তুতিও এবার বেশ ভালো।

খুলনা সদর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি এডভোকেট সাইফুল ইসলাম বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ঘরে থাকতে পারেনি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান দখল হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ প্রতিহিংসার রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না বলেই এখানকার বিএনপির নেতাকর্মীরা ভালো আছে। প্রায়ই আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতারা আড্ডা-গল্পে মশগুল থাকেন। এটা খুলনার রাজনীতির একটা ভালো সংস্কৃতি বলে মনে করেন তিনি।

তবে খুলনা মহনগর বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সাংসদ নজরুল ইসলাম মঞ্জু অভিযোগ করে বলেন, এখানে রাজনীতি ও নির্বাচন করার পরিবেশ নেই। সবার জন্য সমান অধিকার নেই। বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশ হুমকি দেয়, বাধা দেয়। অনেক প্রতিক‚লতার মধ্যেও এখানে বিএনপি কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, দলের চেয়ারপারসন কারাগারে। এ অবস্থার মধ্যেও দল কেসিসি নির্বাচনে অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নিলে খুলনা বিএনপি সব পর্যায়ে প্রস্তুত রয়েছে।

খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কেসিসির বর্তমান মেয়র মনিরুজ্জামান মনি বলেন, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে এখানে সব সময় শক্তিশালী। নেতাকর্মীরা মামলা-হামলা উপেক্ষা করে দলের জন্য কাজ করে। তারা সচেতন ও সংগঠিত। বাধা উপেক্ষা করে মিছিল সমাবেশ করে। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী রাজনৈতিক দল। কেসিসি নির্বাচনের জন্য খুলনা বিএনপি প্রস্তুত রয়েছে। ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাজ চলছে।

প্রসঙ্গত, গত বছরের ১৮ জুলাই কেসিসি এলাকায় স্মার্টকার্ড বিতরণ কর্মসূচি উদ্বোধনের পর ২০ জুলাই তা শুরু হয়। ৩১টি ওয়ার্ডে পর্যায়ক্রমে এ কাজ চলছে। আগামী ২৬ এপ্রিল স্মার্টকার্ড বিতরণ শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here