বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, সংস্কৃতি সভ্যতার ভিত্তি আর অপসংস্কৃতি বিবেকের দরজায় তালা লাগায়।
বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদ মিলনায়তনে ‘দেশীয় সংস্কৃতির বিকাশে আমাদের করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব বলেন।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, সংস্কৃতি হচ্ছে সুন্দরের সাধনা। সংস্কৃতি সভ্যতার ভিত্তি। সভ্যতা সংস্কৃতির উন্নতরূপ। সংস্কৃতি সুন্দরের পথ দেখায় আর অপসংস্কৃতি মানুষকে অসুন্দরের পথে নিয়ে যায়। অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। অপসংস্কৃতি জাতীয় মূল্যবোধকে গলাটিপে হত্যা করে, বিবেকের দরজায় কড়া লাগায়। অপসংস্কৃতি মানুষকে তার মা, মাটি ও দেশের প্রতি ভালবাসা থেকে দূরে সরিয়ে নেয়।
তিনি বলেন, তরুণরা অপসংস্কৃতিতে আকৃষ্ট হচ্ছে। তার কারণ এতে চমক আছে, উত্তেজনা আছে আর আছে ক্ষণিক আনন্দ। এর একটা মোহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে একটি দেশের ভবিষ্যত হলো সেই দেশের তরুণ সমাজ। অপসংস্কৃতির হিংস্র ছোবলে এ তরুণ সমাজ যদি বিপথগ্রামী হয়, তাহলে জাতির ভবিষ্যৎ অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে।
তিনি বলেন, কোনো দেশের সভ্যতা ও কৃষ্টি কেমন ঐতিহ্যমণ্ডিত, তা তার সংস্কৃতির স্বরূপেই বোঝা যায়। সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল যখন দূষিত হয়, তখনই জাতির অধঃপতন শুরু হয়।
তিনি কিছুটা হতাশার সূরে বলেন, বর্তমানে সংস্কৃতির চাবিকাঠি কর্পোরেট বেনিয়াদের হাতে চলে গেছে। তারা কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢেলে মিডিয়ার মাধ্যমে খেয়াল খুশিমতো বাণিজ্যকে সংস্কৃতির উপকরণ বলে প্রচার-প্রচারণা চালায়। মিডিয়ার বদৌলতে ফুলে-ফেঁপে তা দেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত অপসংস্কৃতির প্লাবন বইয়ে দেয়।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন, আমাদের মনে রাখতে হবে সংস্কৃতি গ্রহণ বর্জনের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। একসময় বাঙালি মুসলমান ঠিকমতো শিক্ষার মূল্যায়ন করতে পারেনি। তারা ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষা-ব্যবস্থা বর্জন করেছিল। কিন্তু জীবনযাপনের নানা ধাক্কায় একসময় তারা অনুভব করে এভাবে পিছিয়ে থাকলে অগ্রগতির দৌড়ে এই সমাজ পিছিয়ে থাকবে। সুতরাং শুরু হয় শিক্ষাগ্রহণ।
মহীয়সী নারী রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন মেয়েদের শিক্ষার জন্য স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ঘরে ঘরে গিয়ে অভিভাবকদের মেয়েদেরকে স্কুলে পাঠানোর জন্য সম্মত করান। এভাবে বাংলার মুসলিম সমাজে শিক্ষার আলো প্রবেশ করে।
সাংবাদিকদের এ নেতা বলেন, সংস্কৃতিকে বাঁচাতে হলে গ্রামকে হৃষ্টপুষ্ট করতে হবে আবহমান ঐতিহ্যের রূপরসে। সঙ্গে নাগরিক সুবিধাও পৌঁছাতে হবে গ্রামীণ জনপদে। তবে গ্রামবাসীকে পুরবাসীর ড্রয়িংরুমের অন্তর্জালে বন্দি করা যাবে না কিছুতেই। ফিরিয়ে আনতে হবে গ্রামের খোলা প্রান্তর, সবুজ খেলার মাঠ। নদী, খাল, বিল, জলাশয়কে দখলমুক্ত করে নাইয়রী আনার, নৌকাবাইচের উপযোগী করতে হবে।
লোকনৃত্য, জারি, সারি, আউল,বাউল, মুর্শিদী, ভান্ডারী,ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, লোকগীতি, ফোক ও ফোকলোর, লালনগীতি, নজরুলগীতি, রবীন্দ্রগীতি, হাসান রাজার গান হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না।
তিনি বলেন, সুস্থ সংস্কৃতির জন্য শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা ও সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলে। এরা একে অন্যের পরিপূরক। সুস্থ সংস্কৃতি চাইলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আলোকিত মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। সুস্থ সংস্কৃতিচর্চার মাধ্যমেই আলোকিত মানুষ গড়া সম্ভব। মনে রাখবেন অপশক্তিকে প্রতিহত করার অন্যতম উপায় হলো সুস্থ সংস্কৃতিচর্চা।
কাদের গনি চৌধুরী বলেন,আমাদের সংস্কৃতির মেরুদণ্ডে আঘাত এসেছে বার বার। উর্দুকে জাতীয় ভাষা বলে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন জিন্নাহ। পারেননি। বিগত সরকার আমাদের বাকস্বাধীনতা কেড়ে নিতে চেয়েছিল।পারেনি। ছাত্ররা রুখে দিয়েছে। বাংলা ভাষা, বাক স্বাধীনতা আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া যাবে না।
সামাজিক সাংস্কৃতিক ফাউন্ডেশনের সভাপতি লায়ন আনোয়ারা বেগম নিপার সভাপতিত্বে ও মঞ্জুর হোসেন ইসার সঞ্চালনায় আলোচনায় রেজাবুদ্দৌলা চৌধুরী, তাশিক আহমেদ, কামরুল হাসান দর্পণ,এম এ সায়েম মাসুম,সিদ্দিক আল মামুন, কাদের মনসুর, আকতার হোসেন, মোল্লা নাসির হোসেন বক্তব্য রাখেন।
সূত্র: যুগান্তর