
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন জমে উঠেছে– এ কথা বলা না গেলেও প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দুই দলের মধ্যে কথার লড়াই ক্রমশ তীব্রতা পাচ্ছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায়। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ না থাকায় এবার বিএনপিকে দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হচ্ছে। তাই ধারণা করা হয়েছিল, নির্বাচনটা বড়জোর ফ্রেন্ডলি ম্যাচ হতে যাচ্ছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচার যত এগোচ্ছে ততই বিশেষ করে দুই দলের দুই শীর্ষ নেতা পরস্পর বাক্যবাণ ছুড়ছেন।
জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান অব্যাহতভাবে বিএনপিকে ‘চাঁদাবাজদের’ দল বলে যাচ্ছেন। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান মুক্তিযুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যায় জামায়াতের ভূমিকা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে দুপক্ষের এ কথার লড়াই সংঘাত-সংঘর্ষে রূপ নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
প্রসঙ্গত, ইদানীং তা না বললেও বিএনপি বরাবরই নির্বাচনের পর জাতীয় সরকার গঠনের কথা বলে আসছিল। খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে বিএনপির গুলশান কার্যালয়ে শোক জানাতে গিয়ে গত ১ জানুয়ারি জামায়াতের আমিরও সাংবাদিকদের বলেছিলেন, আগের মতোই তারা একসঙ্গে কাজ করতে চান। তারেক রহমানকেও তিনি এ কথা বলে এসেছেন। তিনি তখন এটাও বলেছিলেন, নির্বাচনের পর সরকার গঠনের আগে বিএনপি ও জামায়াত আবারও বৈঠক করবে।
বিএনপির পক্ষ থেকে এ নিয়ে হ্যাঁ বা না কিছু বলা হয়নি। জামায়াতের আমিরের ওই বক্তব্য তাই বিশ্লেষকদের কাছে ইঙ্গিতবহ মনে হয়। অনেকে, বিশেষত আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা ‘ভাগাভাগির নির্বাচন’ বলে প্রচারণা চালান।
নির্বাচনটি কেমন হতে যাচ্ছে, সে সম্পর্কে চূড়ান্ত মন্তব্য করতে অন্তত ১০-১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু কথার লড়াইয়ে এ ইঙ্গিতও মেলে যে, দুপক্ষই এখনও নিজ নিজ সমীকরণ নিয়ে এগোচ্ছে। বিএনপি যেমন আগের মতো যে কোনো শর্তে জামায়াতকে কাছে রাখা জরুরি মনে করছে না, তেমনি জামায়াতও ইতিহাসে এই প্রথম বড় কোনো নির্বাচনী সাফল্য পাওয়ার সম্ভাবনা হেলায় হারাতে রাজি নয়।
এ পরিস্থিতিতে নতুন যে ঘটনা ঘটছে তা হলো, দুপক্ষের কাছেই আওয়ামী লীগের ভোটারদের কদর বেড়েছে। অথচ দুই দল সম্মিলিতভাবেই আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের বাইরে রাখতে অন্তর্বর্তী সরকারকে সমর্থন দিয়েছিল।
কিছুদিন আগেও দুদলের নেতারা ‘ফ্যাসিস্ট’ বিশেষণ ছাড়া আওয়ামী লীগের নাম নেননি। আর এখন দুদলই অন্তত ভোটের মাঠে পারতপক্ষে ওই শব্দটি মুখে আনছেন না। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল তো গত শুক্রবার তাঁর সংসদীয় আসনভুক্ত ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার শোল্টিহরি বাজারে নির্বাচনী গণসংযোগকালে বলেছেন, ‘আমাদের হাসিনা আপা চলে গেছেন ভারতে। এলাকার সমর্থক-কর্মীদের বিপদে ফেলে গেছেন কেন? আমরা আছি আপনাদের পাশে। যারা অন্যায় করেছে, তাদের শাস্তি হবে। যারা অন্যায় করেনি, তাদের কোনো শাস্তি হতে দেব না’ (প্রথম আলো অনলাইন)।
অন্যদিকে গত শুক্রবার কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম) আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের নির্বাচনী সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছেন আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা সালাউদ্দিন আহমেদ মজুমদার। তিনি ডা. তাহেরের গুণগান গেয়ে ‘জায়গামতো’ সবাইকে ভোট দিতে বলেন। এরপর ডা. তাহের হাতে মাইক নিয়ে বলেন, ‘সালাউদ্দিনের বাবা এই এলাকায় আমার অভিভাবক ছিলেন। সে কী বলতে চেয়েছে, আপনারা বুঝেছেন তো? কোথায় ভোট দেওয়ার কথা বলেছে, আপনারা বুঝে নিয়েন।’
আওয়ামী লীগের ভোট টানতে বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে এ প্রতিযোগিতা তপশিল ঘোষণার আগেই শুরু হয়। গত ১৩ নভেম্বর এই স্তম্ভেই মির্জা ফখরুলের অনুরূপ এক বক্তব্যের সূত্র ধরে ‘বিএনপি-জামায়াত কেন নৌকার ভোটার পেতে চায়’ শিরোনামে নিবন্ধ লিখেছিলাম। সেখানে আওয়ামী লীগের ভোট টানতে জামায়াতের কৌশল নিয়েও কিছু কথা বলেছিলাম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী পরিস্থিতি তুলে ধরে জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোটারদের বলছে, গত দেড় বছরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে তারা কোনো মামলা দেয়নি।
লীগের ওপর অত্যাচার সব করেছে বিএনপি। যদিও বাস্তবে এ ক্ষেত্রে কোনো দলই কম যায়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে তো বর্তমান ও সাবেক ছাত্রলীগ সন্দেহে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অনেক শিক্ষকও বিশেষত ছাত্রশিবিরের মববাজি থেকে রেহাই পায়নি। জামায়াত আওয়ামী লীগের ভোটারদের ভয় দেখাচ্ছে এই বলে– বিএনপি ক্ষমতায় এলে শেষোক্তদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতন বাড়িয়ে দেবে। বিএনপিও একই ভয় দেখাচ্ছে।
এ কথা আমি আগেও বলেছি, মূলত প্রায় একই ভোটব্যাংকনির্ভর হওয়ায় বিশেষত ইসলামপন্থিদের ভোট যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হারে জামায়াতের কাছে চলে যাবে, যারা আগে নৌকা ঠেকানোর প্রশ্নে চোখ বন্ধ করে বিএনপির পেছনে দাঁড়াতেন। বিএনপি এ ঘাটতি পূরণ করতে চায় নৌকার সমর্থকদের দিয়ে। অন্যদিকে শুধু ইসলামপন্থিদের ভোট দিয়ে জামায়াতের পক্ষে বিএনপির সঙ্গে এঁটে ওঠা দুরূহ।
তাই একদিকে দলটি এমনকি তার অনেক সমর্থককে অবাক করে দিয়ে উদারপন্থি ভোট টানতে ‘অ্যাক্রস দ্য লাইন’ খেলছে। কোনো নারী প্রার্থী না দিলেও ইতিহাসে এই প্রথম একজন হিন্দু প্রার্থী দিয়েছে। খ্রিষ্টানসহ অমুসলিমদের সভায় গিয়ে বোঝাচ্ছে, ক্ষমতায় গেলে তাদের চিরাচরিত শরিয়া আইন চালুর দাবি কার্যকর করবে না। তাদের এ প্রকল্পেরই অংশ যে কোনো উপায়ে আওয়ামী লীগের ভোট টানা।
বিএনপি আরেকটা কারণেও নৌকার ভোটারদের মন জয় করতে চাচ্ছে, বলা যায়। তারা ধরেই নিয়েছে– নির্বাচনে জয় তাদেরই হবে। সম্ভবত সে কারণে ইদানীং জাতীয় সরকার নিয়ে তেমন উচ্চবাচ্য করছে না তারা। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা যেমন বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিসরে প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে, তেমনি আওয়ামী লীগের ভোট বর্জন কর্মসূচি সফল হলে হতাশাজনক ভোটার উপস্থিতি ওই প্রশ্নকে আরও জোরালো করে দেবে। সম্ভাব্য সরকার হিসেবে বিএনপি এ ঝামেলা এড়াতে চায়।
এটাও লক্ষণীয়, সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে যে গণভোট হতে চলেছে, তা নিয়েও বিএনপি এক প্রকার নীরব। কোথাও দলটি সরকার তো দূর স্থান, জামায়াত-এনসিপির মতো করেও হ্যাঁ ভোট চাচ্ছে না। কারণ অনেকাংশে ভিন্ন হলেও গণভোট প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অবস্থান একই। তাই বিএনপি চায়, নৌকার সমর্থকরা ভোটকেন্দ্রে আসুক এবং ধানের শীষের সঙ্গে গণভোটের ব্যালটে ‘না’ ভোট দিক। এতে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতাও বৃদ্ধি পাবে।
কিন্তু আওয়ামী লীগের ভোটারদের নিয়ে বিএনপি-জামায়াতের নিজস্ব পরিকল্পনা কতটুকু সফল হবে? প্রথমত, সাধারণভাবে নৌকার ভোটাররা ভোট বর্জন করতে পারে। তবে তাদের মন জয়ে প্রার্থীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা সংশ্লিষ্ট এলাকায় নৌকার সমর্থকদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে যেতেও পারে। এ ক্ষেত্রে নানা ঐতিহাসিক কারণে বিএনপিরই এগিয়ে থাকার কথা।
তবে বিএনপি যদি আসলেই পুরোনো প্রতিহিংসার রাজনীতির অবসান চায় এবং জামায়াতকে নির্দিষ্ট গণ্ডিতে আটকে রেখে বড়জোর আগের মতো নিজের লেজুড় হিসেবে রাখতে চায়, তাহলে অন্তত আগামী পাঁচ বছর আওয়ামী লীগের তৃণমূলের সমর্থনের ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল
সূত্র: সমকাল