
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এই নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক জোট বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী তাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তাদের ইশতেহারে অতি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেছে। অর্থনৈতিক দর্শনে প্রবৃদ্ধি, সংস্কার এবং জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি অভিন্ন থাকলেও তার কৌশলগত দিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং টালমাটাল অর্থনৈতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে অনুষ্ঠিতব্য নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক হয়ে উঠেছে অর্থনীতি। কোন দল কীভাবে অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে পারবে তারই বিবেচনা হবে আসন্ন নির্বাচনে।
বিএনপির অর্থনৈতিক ইশতেহারের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তর এবং এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করার ঘোষণা। এটা নিঃসন্দেহে একটি উচ্চাবিলাষী পরিকল্পনা। বর্তমানে আমাদের দেশের যে প্রবৃদ্ধি রয়েছে তার দ্বিগুণেরও বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারলে এ পরিকল্পনার কাছাকাছি যাওয়া সম্ভব হতে পারে।
আগামী এক দশক ধরে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৪৫০-৪৬০ বিলিয়ন ডলার। তাতে ব্যাপক অর্থনৈতিক সংস্কার প্রয়োজন হবে।
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর ডেটা অনুযায়ী, গত তিন মাস ধরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে গত জানুয়ারি মাসে তা ৮ দশমিক ৫৯ শতাংশে পৌঁছেছে। মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশে নামিয়ে প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা বিরাট চ্যালেঞ্জ। যেখানে বছরেরও বেশি সময় ধরে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি নিম্নমুখী। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিম্নমুখী; যার প্রভাব পড়েছে উৎপাদনে।
ফলে সাইড এফেক্ট হিসাবে কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের নির্বাচনী পরিবেশ দেশের অর্থনীতির চাকাকে আরও ধীরগতি করে দিয়েছে। তারা বেসরকারি খাতকে অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখতে চায়, সরকার যেখানে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।
বিএনপি সরকার শুরু থেকে বেসরকারি খাত উন্মুক্ত করার ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে আসছে। বলা যায় বিএনপি সরকারে থাকার বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি খাত প্রস্ফুটিত হয়েছে। তাদের এই ধারা বজায় রাখার ঘোষণা তাদের ইশতেহারে জোরেশোরে আসছে। বিএনপি বেসরকারি খাতকে উৎসাহিত করে শিল্পায়নের গতি বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এ ছাড়া ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৫ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে; যা শিল্পোন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে।
বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণে বিএনপি এফডিআই ক্যাপ্টেন নিয়োগ করার কথা ইশতেহারে উল্লেখ করেছে– এটি বেশ চমকপ্রদ। দেশের সংকটাপন্ন ব্যাংকিং খাত সংস্কারে বিএনপি একটি অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠনের ঘোষণা দিয়েছে। অবসায়িত বা সংকটে পড়া ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতকারীদের অর্থ দ্রুততম সময়ে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়েছে– এটি সাধারণ আমানতকারীদের জন্য ভালো খবর।
কিন্তু যে পরিমাণ সরকারি টাকা ছাড়ের প্রয়োজন হবে তার সংস্থান কোথা থেকে হবে, তা স্পষ্ট হয়নি। এ ছাড়া ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করা, খেলাপি ঋণ সমস্যার সমাধান এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন ও তদারকি ক্ষমতা শক্তিশালী করার কথা বলা হয়েছে।
বিএনপি দেশীয় শিল্পের বিকাশে ‘এক গ্রাম এক পণ্য’ নীতি গ্রহণের মাধ্যমে হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী শিল্পগুলো পুনরুদ্ধার করতে চায়। ইশতেহারে দলটি বলেছে, ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি শিল্পে (এমএসএমই) বিশেষ প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হবে।
অন্যদিকে জামায়াত জোট ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা এবং মাথাপিছু আয় ১০ হাজার ডলারে নেওয়ার লক্ষ্য ঘোষণা করেছে। একইসঙ্গে বিশ্বের ৩৫তম অর্থনীতি থেকে ২০তম অর্থনীতিতে উত্তরণের কথাও বলা হয়েছে।
এটি কতখানি বাস্তবসম্মত তা আলোচনার দাবি রাখে। আগেই আলোচনা করেছি, আগামী দশক ধরে ১০ শতাংশের বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি দরকার ২০৩৪ সালে ১ ট্রিলিয়ন হতে হলে এবং ২০৪০ সালে ২ ট্রিলিয়ন করতে হলে গড়ে ১৫ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি দরকার। এটি কতখানি বাস্তবসম্মত। যাইহোক বড় আশা থাকা ভালো। বড় করে আশা করলে তার অর্ধেক প্রবৃদ্ধিও যদি আমরা করতে পারি তা ভালোই হবে।
কিন্তু বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক অঙ্গীকার ভোটাররা দেখতে চায়। আগের আমলের মতো আমাদের যদি অবুঝ ভেবেই সব দল তাদের চমক দেখাতে চায় তবে তা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না।
জামায়াত ইশতেহারে ব্যাংক ও আর্থিক খাত সংস্কারের মাধ্যমে আস্থা ফেরানোর কথা বলা হয়েছ।একইসঙ্গে ইসলামী ধারার ব্যাংক ও বিমা খাতের বিকাশে সহায়তার অঙ্গীকার করা হয়েছে। কেউ এক কোটি আর কেউ সাত কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা ইশতেহারে উল্লেখ করেছে।
এগুলো বাস্তবের সঙ্গে মেলে না। কর্মপরিকল্পনা যদি শুধু কল্পনা হয় তবে তা আলাদা বিষয়। ভোটাররা চায় বাস্তবায়নযোগ্য ইশতেহার। অতীতেও আমরা অনেক ইশতেহার দেখেছি। ইশতেহার শুধু একটা কমিটমেন্টের খসড়া হয়েই থেকেছে। নির্বাচনের পর কোনো দল ইশতেহার খুলে দেখেছে কিনা সন্দেহ আছে।
ইশতেহার স্বল্পমেয়াদি আর দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নিয়ে হওয়া উচিত। যাইহোক নির্বাচন আর মাত্র এক দিন পর। ইশতেহারে যাই থাকুক এবারের নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে যাবে এটা আশা করা যায়। নির্বাচন হলে দেশে একটা স্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হবে ।
যেই ক্ষমতায় আসুন না কেন মিলেমিশে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকারে যেন ঘাটতি না থাকে। দীর্ঘ ১৬ বছরের বঞ্চনা হয়তো কিছুটা হলেও ঘুচবে– সেই আশায় রইলো গোটা জাতি। শুভ হোক আগামীর দিনগুলো।
আনোয়ার ফারুক তালুকদার: অর্থনীতি বিশ্লেষক
সূত্র: সমকাল