শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

আরব রাষ্ট্রগুলো কেন ইরানে হামলার বিরোধী

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
মোহাম্মদ এলমাসরি

মাত্র কয়েক বছর আগেও বিশেষ করে উপসাগরীয় অঞ্চলে বহু আরব রাষ্ট্র ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনে মার্কিন হামলাকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিল। দশকের পর দশক তারা ইরানকে গভীর সন্দেহের চোখে দেখেছে এবং দেশটিকে এ অঞ্চলের জন্য প্রধান হুমকি ভেবেছে। কিন্তু এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঠিক একই ধরনের আক্রমণের কথা যখন ভেবেছেন তখন আরব নেতাদের মনোভাব ভিন্ন। তেহরানের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বিরোধিতাকারী উপসাগরীয় শাসকদের অনেকে এখন ইরানে আক্রমণ না করার জন্য মার্কিন প্রশাসনের কাছে তদবির করছেন।

২৭ মাস ধরে আরব নেতারা ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্প বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সমগ্র অঞ্চলে চলা ইসরায়েলি তাণ্ডব কেবল দেখেই যাচ্ছেন। এ তাণ্ডব ইরাকের ফোরাত নদী থেকে মিসরের নীল নদ পর্যন্ত বিস্তৃত; আর তা এ অঞ্চলের জন্য একটি সম্প্রসারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি। এই লক্ষ্যে ইসরায়েল আরব ভূমিতে তার অবৈধ দখল উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত করেছে। ইসরায়েল কেবল গাজাতেই গণহত্যা চালায়নি কিংবা শুধু এ অঞ্চল দখলের পরিকল্পনার ইঙ্গিতই দেয়নি, বরং তারা পশ্চিম তীর, সিরিয়া ও লেবাননেও নিয়ন্ত্রণ আরও জোরালো করেছে।

নেতানিয়াহু কয়েক মাস ধরে প্রকাশ্যে তাঁর দখলদারি উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঘোষণা করছেন। তবে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে মার্কিন মিত্র কাতারের ওপর ইসরায়েলের অভূতপূর্ব আক্রমণই ছিল আরব নেতাদের জন্য সম্ভবত সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয়। জুন মাসে এ উত্তেজনা বৃদ্ধির মাত্র কয়েক মাস আগে ইরানে বোমা হামলা চালানোর জন্য ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করিয়েছিল। এই হামলার লক্ষ্য ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস এবং ইসরায়েলকে এ অঞ্চলের একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হিসেবে নিশ্চিত করা।

মোদ্দা কথা, এর আগে ইসরায়েলের নিরঙ্কুশ আঞ্চলিক আধিপত্যের লক্ষ্য কখনও এতটা স্পষ্ট ছিল না। ইরানের ওপর মার্কিন হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইসরায়েলি আগ্রাসনকে বিস্তৃত করার পাশাপাশি তার আঞ্চলিক শক্তি আরও বাড়ানো। এ প্রেক্ষাপটই ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন-ইসরায়েল আক্রমণের বিরুদ্ধে আরব রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানে কাঠামোগত পরিবর্তনের মূল কারণ।

ইসরায়েলি সম্প্রসারণবাদ
যদিও ইসরায়েল ইরানের ওপর সম্ভাব্য মার্কিন হামলা থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টা করেছে; প্রাপ্ত প্রমাণ বলছে, তারা ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে সক্রিয় ইন্ধন দিচ্ছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন হস্তক্ষেপ ত্বরান্বিত করতে সাহায্য করেছে। এই মাসের শুরুতে সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং বর্তমান ইসরায়েলি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আমিচাই এলিয়াহু উভয়েই পরামর্শ দিয়েছিলেন, ইসরায়েলি এজেন্টরা সম্মুখসারিতে থেকে আন্দোলনে মদদ দিচ্ছে।

ইতোমধ্যে ইসরায়েলি চ্যানেল ১৪ ইঙ্গিত দিয়েছে, ইসরায়েল বিক্ষোভকারীদের বিরোধী পক্ষকে অস্ত্র সরবরাহ করছে, যারা কয়েক ডজন ইরানি নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করেছে। ইসরায়েল ইরানে শাসক দল পরিবর্তনের অভিযানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে রাজি করানোর জন্য কয়েক দশক ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, সেই সঙ্গে গুপ্তভাবে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক শাসন পরিবর্তন এবং এ অঞ্চলে বিশৃঙ্খলা অভিযানের ইতিহাসও তাদের বিবেচনায় রয়েছে। এগুলো মাথায় রেখে আরব নেতারা এসব প্রতিবেদন প্রায় নিশ্চিতভাবে পড়ে থাকবেন।

তবে ইরান ও মার্কিন-ইসরায়েল অক্ষের মধ্যে সংঘাত বা ইরানি শাসনের সম্ভাব্য পতনকে বোঝার জন্য আরব রাষ্ট্রগুলো তাদের চিন্তায় আঞ্চলিক আধিপত্যের ক্ষেত্রে কেবল ইসরায়েলের প্রচেষ্টাই একমাত্র বিষয় হিসেবে মনে করে না। এ ব্যাপারে সাম্প্রতিককালের আঞ্চলিক পরিবর্তনগুলোও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

২০২৩ সাল থেকে ইরান মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞার ফলে অর্থনীতি ভেঙে পড়েছে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সরাসরি আক্রমণে দেশটির সামরিক সক্ষমতা ও পারমাণবিক কর্মসূচি উভয়ই ঝুঁকির মুখে। ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্কেও ক্ষয় ধরেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সিরিয়ার বাশার আল আসাদের পতন ঘটে এবং লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি বোমা বর্ষণের মুখে প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

আরব সরকারগুলো ভাবছে, ইরানের এ পতন আরও আক্রমণকে অপ্রয়োজনীয় করে তুলেছে এবং এতে সম্ভবত হিতে বিপরীত হবে। প্রকৃতপক্ষে দুর্বল ইরানকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হবে এবং সম্ভবত এটাই এখন সবার কামনা। তবে ইরানি রাষ্ট্র সম্পূর্ণরূপে ভেঙে পড়লে লাভ যত হবে, ক্ষতি হবে তার চেয়ে অনেক বেশি।

একটি পরিবর্তনশীল হুমকির মানচিত্র
আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং আরও অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষায় উপসাগরীয় দেশগুলোর স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। তারা বিশেষ করে ইরানের ওপর আক্রমণ এবং ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা আক্রমণ তেল-গ্যাসের দামের ওপর কী প্রভাব ফেলতে পারে তা নিয়ে উদ্বিগ্ন। ইরানের পাল্টা জবাব সম্ভবত হরমুজ প্রণালিকে হুমকির মুখে ফেলবে, যা প্রাকৃতিক তেল-গ্যাস উভয় পরিবহনের জন্য অপরিহার্য। মিসরের আশঙ্কা, ইরানে শাসনব্যবস্থার পতনের ফলে তার অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর, সুয়েজ খালে আরও অস্থিতিশীলতা দেখা দিতে পারে।


এটাও উল্লেখ্য, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আরব রাষ্ট্রগুলো কূটনৈতিকভাবে ইরানের আগের চেয়ে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। তার একটি কারণ ইসরায়েলি আগ্রাসন ও দখলদারিত্ব। ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করে এবং ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কাতারের ওপর ইসরায়েলের আক্রমণের পর দুই দেশের সম্পর্ক আরও জোরালো হয়। মিসরের সঙ্গে ইরানের সম্পর্কও অতীতের চেয়ে আরও বেশি শক্তিশালী।

তা ছাড়া সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, বিশেষ করে ইসরায়েলের অনিয়ন্ত্রিত আগ্রাসন এবং আঞ্চলিক সম্প্রসারণের কারণে আরব রাষ্ট্রগুলো আঞ্চলিক হুমকি যাচাইয়ের হিসেবে কাঠামোগত পরিবর্তন আনতে বাধ্য হয়েছে। এক সময় সৌদি আরব ইরানকে, কাতার সৌদি আরবকে তার প্রধান হুমকি হিসেবে দেখত। মিসর কাতারকে দেখত আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার প্রধান উৎস হিসেবে। সে পরিস্থিতি এখন আর নেই।

সংযুক্ত আরব আমিরাতকে বাদ দিলে অন্যান্য আরব রাষ্ট্র ইসরায়েলকে এখন এ অঞ্চলের সবচেয়ে অস্থিতিশীল শক্তি হিসেবে দেখছে, যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।

ইসরায়েলি দখলদারিত্ব এবং স্বীকৃত আন্তর্জাতিক রীতিনীতির তোয়াক্কা না করে সীমান্ত পেরিয়ে তাদের আক্রমণ করার ইচ্ছা এবং আঞ্চলিক আধিপত্যের জন্য তাদের খোলামেলা চেষ্টা আরব নেতাদের ঝুঁকি মূল্যায়নের পদ্ধতিকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। আরব নেতারা এখন আশঙ্কা করছেন, তারা ইতোমধ্যে ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রকল্পের পথের মধ্যে আছেন অথবা তারা হতে পারেন ইসরায়েলের পরবর্তী নিশানা।

বুধবার উত্তেজনা কমিয়ে আনতে ট্রাম্পের বক্তব্যে হয়তো কিছু বিষয় স্পষ্ট হয়েছে, যা কয়েকজন বিশ্লেষকের কাছে মার্কিন পরিকল্পনা ধরা পড়েছে। যেমন ইরানের অর্থনীতিতে চাপ প্রয়োগ করা, স্থলে বিক্ষোভকারীদের বিরোধী পক্ষকে সমর্থন দেওয়া এবং সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়াই শাসনব্যবস্থার পতন ঘটানো।

যদি উত্তেজনা ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে, তাহলে অন্তত যতক্ষণ না ইসরায়েলিরা এ অঞ্চলকে দুর্বল, অস্থিতিশীল ও ভেঙে ফেলার জন্য পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া পর্যন্ত আরব নেতারা খুশি থাকবেন। পরিহাসের বিষয়, ইসরায়েলি যুদ্ধবাজ মানসিকতা এবং তাদের নির্দেশে মার্কিনি একই মনোভাব একটি বিভক্ত অঞ্চলকে ঐক্যবদ্ধ করার সম্ভাবনা তৈরি করে। আর এই ঐক্য যদি সাধারণ স্বার্থের ভিত্তিতেও না হয়, অন্তত সাধারণ হুমকির ভিত্তিতে হতে পারে।

মোহাম্মদ এলমাসরি: দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের মিডিয়া স্টাডিজের অধ্যাপক; মিডল ইস্ট আই থেকে
ভাষান্তর ইফতেখারুল ইসলাম

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত