
বহুল প্রতীক্ষিত জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসছে। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো যার যার সামর্থ্য নিয়ে প্রচারণায় ঝাঁপিয়ে পড়েছে। এর মধ্যে গণঅভ্যুত্থানজাত অন্তর্বর্তী সরকারের কয়েকটি সিদ্ধান্ত ও আচরণ স্তম্ভিত হবার মতো। এগুলোর কোনোটিই নির্বাচন সংক্রান্ত নয়, তবে জাতীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সরকারের বাস্তবতাবিবর্জিত উচ্চাভিলাষ নানা প্রশ্নের অবতারণা করে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আর্থিক অনিয়ম, লুটপাট ও গোষ্ঠীবাজি সম্পর্কে কমবেশি সকলেই জানি। অন্তর্বর্তী সরকার এ নিয়ে শ্বেতপত্রও প্রকাশ করেছে। প্রাথমিক প্রত্যাশা ছিল, সরকারি ব্যয়ে লাগাম টেনে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনবে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কাগুজে উদ্যোগের বাইরে গিয়ে পরিচালন খাতে একের পর এক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। নিকট অতীতে প্রথমবারের মতো গত অর্থবছরে সরকারের পরিচালন ব্যয় মোট রাজস্ব ব্যয়ের চেয়েও বেশি হয়ে যায়’ (সমকাল, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬)।
এর মধ্যেই সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন বেতন কাঠামোর সুপারিশ করেছে পে কমিশন। এতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। প্রায় একই হারে পেনশন, চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ভাতাও বাড়বে। এই প্রস্তাব বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।
এদিকে আগামী সরকারের মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাট প্রকল্পের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের আওতায় বেইলি রোডে দুটি ভবনে ১৮টি করে ৩৬টি ফ্ল্যাট নির্মাণ করা হবে। প্রতিটির আকার হবে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট। মিন্টো রোডে নির্মীয়মাণ ভবনে ৩৬টি ফ্ল্যাটের প্রতিটির আকার হবে সাড়ে আট হাজার বর্গফুট। যদিও বর্তমানে মন্ত্রী পাড়া মিন্টো রোডে মন্ত্রীদের জন্য ১৫টি বাংলো বাড়ি, বেইলি রোডে ৩০টি ফ্ল্যাটসহ ধানমন্ডি ও গুলশানে মন্ত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত ফ্ল্যাট রয়েছে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুট।
সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাটকে আর আগামী মন্ত্রিসভার সদস্যদের জন্য যথেষ্ট মনে করছে না বর্তমান সরকার। এ কারণে তারা প্রায় দ্বিগুণ আয়তনের ফ্ল্যাটের বন্দোবস্ত করছে! প্রকাশিত সংবাদে জানা যাচ্ছে, ‘চব্বিশের ৫ আগস্টের পর অনেক বাংলো ও ফ্ল্যাট খালি ছিল। সেখানে সাংবিধানিক সংস্থার পদধারী কেউ কেউ থাকছেন। মন্ত্রীদের নতুন ভবনে বাসা দেওয়া গেলে এখনকার বড় বড় ফ্ল্যাটে উঠতে পারবেন আমলারা’ (প্রথম আলো, ২৫ জানুয়ারি ২০২৬)।
২. মন্ত্রী, আমলা থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ফ্ল্যাট-বাড়ি-গাড়িসহ সুবিধাদির ফর্দ বড় না করে বরং বিনীত প্রশ্ন করতে হয়, দেশের কয় শতাংশ মানুষ মন্ত্রী-আমলা কিংবা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী? দেশের অন্তত চার কোটি নিম্ন আয়ের মানুষ যখন দুমুঠো ভাতের সঙ্গে শুকনো লবণের বন্দোবস্ত করতে দিশেহারা তখন সরকার কোন বিবেচনায় মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট তৈরির উদ্যোগ নিচ্ছে?
যে জনসাধারণের ভোটে সরকার নির্বাচিত হয়, সেই ভোটারদের ন্যূনতম বাসস্থান সম্পর্কে গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো উদ্যোগের কথা জানা যায় না। যদিও অরাজনৈতিক সরকার হিসেবে তাদেরই এমন উদ্যোগের সুযোগ ছিল বেশি। কেবল বাসস্থান নয়; বাজার ব্যবস্থাপনা থেকে মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্তের জীবনযাপনকে সহজ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় করবার প্রকল্প হাতে নিতে পারত সরকার। এর বদলে আমরা দেখেছি একের পর এক উচ্চাভিলাষী প্রকল্প। অন্তত তিন দফায় সরকারি যানবাহন কেনার মূল্যসীমা বৃদ্ধি।
এর আগে মন্ত্রীদের জন্য ৬০টি গাড়ি কেনার প্রস্তাব আপত্তির মুখে বাতিল হলেও নির্বাচনী কর্মকর্তাদের জন্য ২২০টি গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত বহাল। আওয়ামী লীগ আমলে অবসরপ্রাপ্ত ৭৬৪ জন কর্মকর্তাকে গত বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত ‘ভূতাপেক্ষ পদোন্নতি’ দেওয়া হয়। তাদের জন্য সরকারকে বিপুল আর্থিক বরাদ্দ দিতে হয়। বঞ্চিতদের দিকে সরকার নিশ্চয়ই দৃষ্টি দেবে, তবে সেটা সমাজের সব স্তর ও পেশা থেকে হতে হবে।
৩. নির্বাচনের ঠিক আগে অন্তর্বর্তীর আচরণ যেন রাজনৈতিক সরকারের মতো হয়ে যাচ্ছে। আমলা-মন্ত্রীদের বেতন ও বিলাসে উচ্চাভিলাষী প্রকল্পগুলোর বোঝা কিন্তু আগামী রাজনৈতিক সরকারকেই বহন করতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন যদি একশ থেকে একশ চল্লিশ ভাগ বেড়ে যায়; বেসরকারি খাতের পেশাজীবীর সঙ্গে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্য নষ্ট হবে। সরকারি কর্মচারীদের খুশি করবার মধ্য দিয়ে সরকারের অর্জন যতটা, তার চেয়ে বেশি বিসর্জন হবে অধিকাংশ মানুষকে অসন্তুষ্ট রাখবার মধ্য দিয়ে।
বিপুল আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে বর্তমান সরকার অভূতপূর্ব জনসমর্থন ও আকাঙ্ক্ষা সঙ্গে নিয়ে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সূত্র ধরে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের প্রত্যাশায় জাতি ছিল উন্মুখ। প্রান্তিক মানুষ থেকে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি কিংবা নারী সমাজের উৎসাহী কর্মতৎপর কিশোরী বা তরুণীর জীবনপথের প্রতিবন্ধকতা কাটাতে সুবৃহৎ কোনো প্রকল্প দেখা যায়নি। বরং অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকারসহ বিভিন্ন অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেকে।
সরকারের নির্বিকারত্বে উৎসাহিত ও অনেক সময় উস্কায়িত মব সন্ত্রাস সমাজকে অন্ধকারে টেনে নিয়ে যাচ্ছে।
সর্বশেষ যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে বাগেরহাট সদর উপজেলা ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দাম যেভাবে তাঁর নিহত স্ত্রী ও পুত্রের মৃতদেহ দেখতে বাধ্য হলেন; তা যে কোনো বিবেকী মানুষকে ব্যথিত করে। আইনের ব্যাখ্যা থাকতেই পারে; তারপরও কারাগারে আটক একজন মানুষ তাঁর নিহত স্ত্রী ও পুত্রকে দেখবার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাবেন না? এ কথাও বলা হচ্ছে, আওয়ামী লীগ আমলে কারাগারে আটকদের সঙ্গে এর চেয়েও নির্মম আচরণ সরকারি কর্তৃপক্ষ করেছে।
এক সরকার নির্মম আচরণ করেছে বলে পরবর্তী সরকারের পক্ষে নির্মম ও অমানবিক হওয়া বিবেচনাসম্মত নয়। বরং ভুলের পুনরাবৃত্তি না হওয়ার জন্যই মানুষ সরকারের পরিবর্তন চায়। সেই পরিবর্তন ভোটের মাধ্যমে হতে পারেনি বলেই গণঅভ্যুত্থান অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। তারপর সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে মানুষের আগ্রহের পথে সরকারের কোনো ইতিবাচক বারতা আমরা দেখি না। দিল্লিতে ভারতীয় সরকারের আনুকূল্যে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রসঙ্গে সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ‘এরপর নির্বাচন নিয়ে যে কোনো বিশৃঙ্খলা বা সংঘর্ষের দায়িত্ব আওয়ামী লীগকে নিতে হবে।’
না, মাননীয় উপদেষ্টা। উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে দেওয়ার দিন শেষ। আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ দেশ থেকে পালিয়ে অন্য দেশে আশ্রিত– এ যেমন সত্য; এও সত্য যে, এ দেশে তাদের বিপুল কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। আইনের শাসন সঠিকভাবে প্রয়োগের মাধ্যমে আগামী দিনে এ প্রসঙ্গে একটি যৌক্তিক অবস্থানে জাতি পৌঁছুবে। এর আগে সরকারকে সকল পক্ষকে নিজের অনুকূলে নিয়ে নির্বাচন নির্বিঘ্ন, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নের যাবতীয় উদ্যোগ নিতে হবে।
সরকার গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে যতখানি উৎসাহী; ঠিক ততখানি নির্লিপ্ত নির্বাচনে ধর্মের অপব্যবহার প্রসঙ্গে। দেশের প্রগতিশীল, সাংস্কৃতিক অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখবার দায়িত্বও সরকারের। এই সত্য যেমন সরকার বিস্মৃত হবে না; একই সঙ্গে ভুলে গেলে চলবে না– এ দেশের সব মানুষের সমান অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার পবিত্র দায়িত্বভার তাদেরই ওপর।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল; সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com
সূত্র: সমকাল