শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

গঙ্গা ব্যারাজের ভূগোল ও ভূ-রাজনীতি

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৫, ২০২৬
শেখ রোক

প্রায় এক দশক ধরে ‘হিমাগারে বন্দি’ গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পটি আবার সামনে এসেছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আজ রোববার জাতীয় অর্থনৈতিক পর্ষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি উপস্থাপিত হচ্ছে। আগামী মার্চ মাসেই শুরু হতে যাওয়া প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হচ্ছে ৫০ হাজার ৪৪৪ কোটি টাকা (সমকাল, ২৪ জানুয়ারি ২০২৫)।

গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পটি এমন সময় আবার সামনে এলো, যখন গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাচ্ছে এবং নিকট ভবিষ্যতে নবায়ন হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্য। বিস্তারিত পড়ুন ‘গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বছর’ (শেখ রোকন, সমকাল, ১ জানুয়ারি ২০২৬)।

এই প্রেক্ষাপটে নতুনভাবে মূল্যায়িত গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের নথিপত্রে যদিও গঙ্গা চুক্তি নবায়নের অনিশ্চয়তা নিয়ে কথা নেই; ইঙ্গিত স্পষ্ট। যেমন, গত বছর ১৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভায় যেসব সিদ্ধান্ত হয়, এর প্রথম অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছে, “প্রকল্পের উদ্দেশ্য হতে ‘ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ১৯৯৬ সালের পদ্মা পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী পদ্মা নদীর পানির সর্বোত্তম ব্যবহার এবং সঠিক ব্যবস্থাপনা’ অংশটি পুনর্গঠিত ডিপিপি (বিস্তারিত প্রকল্প প্রস্তাব) বাদ দিতে হবে।”

মূল্যায়ন কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, প্রকল্পটির প্রথম পর্যায়ে ব্যারাজের মূল অবকাঠামো নির্মাণসহ হিসনা-মাথাভাঙা নদী সিস্টেম ও গড়াই-মধুমতী নদী সিস্টেম পুনর্খনন হবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে চন্দনা-বারাশিয়া, ইছামতী ও বড়াল নদী সিস্টেমে পুনর্খনন, বাঁধ ও রেগুলেটর নির্মাণ, তীর সংরক্ষণের কাজ হবে। প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে ২০৩৩ সালের জুন মাসে সম্পন্ন হবে।

প্রশ্ন হচ্ছে, গঙ্গা বা পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের বিপুল অর্থ আসবে কোথা থেকে? সংশ্লিষ্টরা সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুই পর্যায়ে সম্পন্ন হতে যাওয়া প্রকল্পটির প্রথম ধাপে ব্যয় ৩৪ হাজার কোটি টাকার জোগান দেওয়া হবে সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে। পরবর্তী সময়ে চীনসহ বিদেশি উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার সুযোগ থাকলে বিবেচনা করা হতে পারে (দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬)।

বস্তুত, সাবেক গঙ্গা ও বর্তমান পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পে অর্থায়নে চীন অনেক বছর ধরেই আগ্রহ প্রকাশ করে আসছে। তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রসঙ্গে ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত ‘পাওয়ার চায়না’ কোম্পানির ওয়েবসাইটে বলা আছে, তারা গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নেও আগ্রহী।

প্রসঙ্গত, গঙ্গার বাংলাদেশ অংশে ব্যারাজ দিয়ে অববাহিকার পানি সংরক্ষণ করে কৃষিসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবহারে ১৯৬২-৬৩ সালেই প্রথম জরিপ হয়েছিল। ফারাক্কা প্রকল্পও তখন শুরু হয়েছিল; ১৯৬১ সালে। পরবর্তী কয়েক দশক ঝুলে থাকার পর ২০০৫ সালে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু এবং ২০১০ সালে ব্যারাজ নির্মাণস্থল হিসেবে রাজবাড়ীর পাংশা চিহ্নিত হয়। ওই বছর অক্টোবরে তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন জানিয়েছিলেন, বহুমুখী গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ১২ হাজার কোটি টাকা।

মূল ব্যারাজের কাজে তিন বছর; পুরো প্রকল্প বাস্তবায়নে ১০ বছর লাগবে। ব্যারাজ নির্মিত হলে বর্ষা মৌসুমের পানি সংরক্ষণ করে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৯ জেলায় সেচ এবং ১৬০ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে।

গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প সমীক্ষার কাজ ২০১৩ সালে শেষ হলেও মূলত ভারতের আপত্তিতে তা পিছিয়ে যেতে থাকে। ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০১৫ সালের শুরুতে বাংলাদেশ সরকারের কাছে একটি চিঠিতে ভারত আশঙ্কা প্রকাশ করে, গঙ্গা ব্যারাজ নির্মিত হলে সীমান্তবর্তী ভারতীয় অঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে। ওই বছর এপ্রিলে সমীক্ষা প্রতিবেদন ও বৈজ্ঞানিক নকশা ভারতকে পাঠিয়ে বলা হয়, ব্যারাজটি নির্মিত হলে ভারতীয় ভূখণ্ডে পানির উচ্চতা বাড়বে না।

বাংলাদেশের চিন্তা ছিল, ২০১৬ সালে ব্যারাজের কাজ শুরু করে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ থাকতেই শেষ করা। তাহলে নবায়নের ব্যাপারে বাড়তি চাপ নিতে হবে না। ২০১৫ সালের ২৭ জুন তৎকালীন পানিসম্পদমন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ জাতীয় সংসদে বলেন, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের লবণাক্ততা রোধে ‘ভারতের সহযোগিতায়’ গঙ্গা ব্যারাজ বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছে। আঞ্চলিক সহযোগিতা ছাড়া পানি সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। ভারত, নেপাল, চীনের সহযোগিতা প্রয়োজন। কিন্তু ভারত বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখে।

তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালের এপ্রিলে ভারত সফর থেকে ফিরে সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমাদের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় গঙ্গা ব্যারাজ নামে যে ব্যারাজের সমীক্ষা ও ডিজাইন তৈরি করেছে সেটি সম্পূর্ণ ভুল। এটি আমি নাকচ করে দিয়েছি। কারণ এটি আমাদের জন্য আরও আত্মঘাতী হবে, ওই তিস্তা ব্যারাজের মতো আত্মঘাতী হবে’ (বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর, ১১ এপ্রিল ২০১৭)।

ওই বছর এপ্রিলেই চীনের পানিসম্পদমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আনিসুল ইসলাম মাহমুদের সঙ্গে বৈঠক করে গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পের অর্থায়নে আগ্রহ দেখায়। একই সময় খবর বের হয়, জাপানও গঙ্গা ব্যারাজে বিনিয়োগে আগ্রহী। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী নজরুল ইসলাম বাংলানিউজকে বলেন, ভারতকে বাদ দিয়ে নয়; যৌথ বিনিয়োগকারী, সুবিধাভোগী ও প্রকল্প অংশীদার করেই প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়েছে। সর্বশেষ, ২০২১ সালের মার্চ মাসে তৎকালীন পানিসম্পদ সচিব কবির বিন আনোয়ার ভারত থেকে ফিরে সাংবাদিকদের জানান, ‘ভারতের কেন্দ্রীয় পানিসম্পদ সচিবের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। আমরা কেবল ব্যারাজই নয়, একটি মাল্টিফাংশনাল প্রজেক্ট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি’ (নিউজ বাংলা ডট কম)।

দেখা যাচ্ছে, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্প নিয়ে ভৌগোলিক সম্ভাব্যতা বা আর্থসামাজিক সুফল নিয়ে কোনো পক্ষেরই প্রশ্ন নেই। কার্যত চীন-ভারতও এ বিষয়ে একমত। প্রশ্নটি মূলত ভূ-রাজনৈতিক– কারা অর্থায়ন করবে। সেদিক থেকে নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত মন্দ নয়, যদি অব্যাহত রাখা যায়। আর প্রশ্ন থাকবে এই ব্যারাজের প্রতিবেশগত বিরূপ প্রভাব ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

আমার ছোট মুখে বড় পরামর্শ হলো, গঙ্গা ব্যারাজ প্রকল্পটি বহুপক্ষীয় হওয়া ভালো। চীন, ভারত, জাপান তো নানা সময়ে আগ্রহ দেখিয়েছেই; কারিগরি সক্ষমতা বিবেচনায় নেদারল্যান্ডসকেও আমন্ত্রণ জানানো যেতে পারে।

অধ্যাপক আইনুন নিশাতও বলেছেন, ভারতের সঙ্গে পানি বণ্টনের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখে বাংলাদেশে ব্যারাজ নির্মাণ কাজে দেবে না (সমকাল, ২৪ জানুয়ারি ২০২৬)। বিশ্বব্যাংক ও এডিবির মতো অর্থকরী প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্ত হলে প্রতিবেশগত বিরূপ প্রভাব মোকাবিলার প্রশ্নটিও সহজ হয়ে যাবে প্রতিষ্ঠানগুলোর নীতিমালার কারণেই।

আরেকটি ‘ভূ-রাজনৈতিক’ বিষয়। পুনর্মূল্যায়িত নথিপত্রে কেবল ‘গঙ্গা’ ব্যারাজ প্রকল্পকে ‘পদ্মা’ ব্যারাজ প্রকল্প নামেই আখ্যায়িত করা হয়নি; ১৯৯৬ সালে স্বাক্ষরিত ‘গঙ্গা’ পানি বণ্টন চুক্তির শিরোনামেও ‘পদ্মা’ শব্দটি পুনস্থাপন করা হয়েছে। বাস্তবে যদিও একপাড়ে রাজবাড়ীর পাংশা ও অপর পাড়ে পাবনার সুজানগরের যে অংশটিতে ব্যারাজটি নির্মাণের কথা চলছে, সেটা গঙ্গা নদীরই অংশ।

ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশের পরও কমবেশি ১৬০ কিলোমিটার প্রবাহিত হওয়ার পর গোয়ালন্দের কাছে ব্রহ্মপুত্র বা যমুনার সঙ্গে মিলিত হওয়ার আগ পর্যন্ত নদীটি ভৌগোলিকভাবে গঙ্গাই। বস্তুত, গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের মিলিত প্রবাহের নাম ‘পদ্মা’।

কারণ, রাজনৈতিক সীমারেখা দিয়ে কখনও নদীর নাম পরিবর্তিত হয় না। একই নদী ভিন্ন ভিন্ন নামে পরিচিত হওয়ার ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, আরেকটি নদীর সঙ্গে মিলিত হতে হয়। যেমন সুরমা ও কুশিয়ারা মিলিত হয়ে মেঘনা নাম ধারণ করেছে। যেমন তিস্তা ও ব্রহ্মপুত্র মিলিত হয়ে যমুনা নাম ধারণ করেছে। যেমন গড়াই ও চন্দনা মিলিত হয়ে মধুমতী নাম ধারণ করেছে।

এখন প্রস্তাবিত ব্যারাজ বিষয়ে পুনর্মূল্যায়িত প্রকল্পে ‘গঙ্গা’ নদীর নাম জোর করে ‘পদ্মা’ রেখে কী লাভ হবে জানি না। কিন্তু ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে নাম পরিবর্তনের মাধ্যমে উজানের বিস্তীর্ণ অঞ্চলে প্রবাহিত নদীতে বাংলাদেশের যে অববাহিকাভিত্তিক অধিকার, সেটাকে যেচে খর্ব করা হচ্ছে। যে কারণে ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে কলকাতার পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীটিকে ভারতের পক্ষে যদিও ‘গঙ্গা’ বলা হয়, আমরা সেটাকে আসল নাম ‘ভাগীরথী’ হিসেবেই ডাকি।

কারণ ফারাক্কা পয়েন্ট থেকে বাংলাদেশের দিকে প্রবাহিত ধারাটিই আসল গঙ্গা। এটার নাম ‘গঙ্গা’ বলেই উজানে পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তরপ্রদেশ হয়ে উত্তরাখণ্ডের যে দেবপ্রয়াগে অলকানন্দা ও ভাগীরথী মিলে আনুষ্ঠানিকভাবে গঙ্গা নাম ধারণ করেছে, সে পর্যন্ত অভিন্ন নদীতে ভাটির দেশের অভিন্ন অধিকার আমরা দাবি করতে পারি।

শেখ রোকন: লেখক ও নদী-গবেষক
skrokon@gmail.com

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত