শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

গণতন্ত্রের নতুন অভিযাত্রা টেকসই করতে হলে

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬
সাইফুর রহমান তপন

অবশেষে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি হয়ে গেল। বেশ শান্তিপূর্ণভাবেই হলো। গত ১৮ মাসে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যে মারাত্মক অবনতি হয়েছিল, অন্তত তার প্রভাব ভোটকেন্দ্রগুলোতে দেখা যায়নি। তা ছাড়া ভোটের আগের দিন এবং রাতে সামাজিক মাধ্যমের পাশাপাশি মূলধারার সংবাদমাধ্যমের খবরেও যে ধরনের ভোট কেনার অভিযোগ ছড়িয়ে পড়েছিল, তাও সচেতন ভোটারদের মনে গভীর শঙ্কা জাগিয়েছিল। কিন্তু অন্তত ভোটের ফলে যে প্রবণতা দেখা যায় তাতে স্পষ্ট– যে দলের বিরুদ্ধে ওই ভোট কেনার অভিযোগ বেশি ছিল তাদের উদ্দেশ্য সফল হয়নি।

ঢাকা-৬ এর জুবিলি স্কুল কেন্দ্র ও নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের একটি কেন্দ্রে রাতেই সিল মারার চেষ্টার দৃশ্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। ঢাকার মিরপুরসহ আরও কয়েক স্থানে প্রিসাইডিং ও সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার সহযোগিতায় কোনো কোনো দলের কর্মীর বেআইনিভাবে ভোটকেন্দ্রে প্রবেশের অভিযোগ উঠেছিল। একই সঙ্গে গত রাতে মাদারীপুর, নওগাঁ ও বরগুনার একটি কেন্দ্রে ভোটের রেজাল্ট শিট বা ফলপত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর এজেন্টদের আগাম স্বাক্ষর নেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।

এসব দেখে বিশেষ করে ২০১৮ সালের জালিয়াতিপূর্ণ নির্বাচনের শঙ্কা অনেকের মধ্যে জেগে ওঠে। শেষমেশ এসব অনিয়ম বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় ভোটের মাঠে ব্যাপক পরিসরে প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। বলা যায়, বড় ধরনের কোনো অনিয়ম ছাড়াই নির্বাচনটি শেষ হয়েছে, যদিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নানা অনিয়ম প্রকাশ পাচ্ছে। বিশেষত জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কুমিল্লা-৮, শরীয়তপুর-২, পটুয়াখালী-১সহ অনেক আসনে ভোট স্থগিত করার দাবি উঠেছে।

ভোটারদের অংশগ্রহণে স্বতঃস্ফূর্ততা দেখা গেলেও উপস্থিতি অন্তত সর্বশেষ গ্রহণযোগ্য ২০০৮ সালের নির্বাচনের তুলনায় অনেক কম। ২০০৮ সালে ভোটের হার ছিল ৮৭.১৩ শতাংশ। এবার ইসি বা নির্বাচন কমিশনের হিসাবে তা ৬০-এর কাছাকাছি হতে পারে। যদিও ইসি এটা নিশ্চিত করেনি, এর জন্য আরও দু-একদিন লাগতে পারে, এ হার নিয়েও কোনো কোনো মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছে।

২০০১, ১৯৯৬ সালের নির্বাচনেও ভোটের হার ছিল অনেক বেশি– ৭৫ শতাংশের কিছু কম-বেশি। এ ক্ষেত্রে বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি একটা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। বিভিন্ন টেলিভিশন ও ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন প্রতিবেদনে ভোটারদের অনুভূতি শুনে এটা স্পষ্ট, বিগত তিনটি জাতীয় নির্বাচনে ভোট দিতে না পারায় তাদের মধ্যে যে ক্ষোভ জমেছিল এবার তা মিটেছে। সে হিসেবে ভোটার উপস্থিতি ২০০৮ না হোক অন্তত ২০০১ সালের কাছাকাছি হওয়ার কথা ছিল।

বিশেষ করে সংবাদমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে এটা বারবারই বলা হয়েছে, এবার চার কোটির বেশি ‘তরুণ
ভোটার’ ব্যাপক মাত্রায় ভোটকেন্দ্রে যাবে। সেটা সম্ভবত ঘটেনি।

যা হোক, নির্বাচনটি মোটামুটি অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, এটাই সবচেয়ে বড় কথা। একই সঙ্গে তা বড় স্বস্তিরও বিষয়।

যদিও চূড়ান্ত ফল পেতে শুক্রবার দুপুর হয়ে যেতে পারে, ইতোমধ্যে বিশেষত বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ঘোষিত ফলে এটা স্পষ্ট, বিএনপি বেশ ভালো ব্যবধানে জয় পেতে চলেছে। ইতোপূর্বে মূলত প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিবের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত উক্তির কারণে ভোটের ফল সময়মতো পাওয়া নিয়ে জনপরিসরে একটা উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল।

গত ২১ জানুয়ারি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি বলেছিলেন, এবার ভোট গণনায় ‘কিছুটা দেরি’ হতে পারে; যদিও এমন কথা বলার এখতিয়ার শুধুই ইসির। সম্প্রতি অবশ্য, ইসির একাধিক সদস্য এ আশঙ্কা উড়িয়ে দিয়ে বলেছেন, আগের নিয়মেই ভোট গণনা হবে। এতে বিশেষত প্রার্থীরা তাদের এজেন্টের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কেন্দ্রে ভোট গণনা শেষ হলেই ফল জেনে যাচ্ছেন। তাদের কাছ থেকে তা সংগ্রহ করে সংবাদমাধ্যমও ভোটের ফল জানিয়ে দিতে পারছে।

এবার সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে ‘জুলাই সনদ’ নিয়ে গণভোটও হয়েছে। জুলাই সনদের বিষয়বস্তু মূলত রাষ্ট্র সংস্কার-সংক্রান্ত যেসব বিষয়ে সরকারের উদ্যোগে বিএনপি-জামায়াতসহ ৩০টি দলের ঐকমত্য হয়েছে সেগুলো। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে– গণভোটের মধ্য দিয়ে জুলাই সনদ জনগণের অনুমোদন পেলে রাষ্ট্রব্যবস্থায় কোনো স্বৈরতন্ত্র থাকবে না।

জনগণ তাদের দীর্ঘ আকাঙ্ক্ষার টেকসই গণতন্ত্র পাবে। কিন্তু দেশের এ মুহূর্তে প্রধান দল বিএনপি এ ক্ষেত্রে ‘না’ ভোটের জন্য সবাইকে বলেছে; এটা যেমন তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াত-এনসিপি অভিযোগ করেছে, তেমনি বিএনপির মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের কথায়ও ফুটে উঠেছে। সম্ভবত এ কারণেই প্রায় সর্বত্র গণভোট নিয়ে ভোটারদের বড় অংশের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কোনো আগ্রহ দেখা যায়নি। এর ফল কী হতে পারে, সেটাও সহজে অনুমানযোগ্য।

তবে এটা সত্য, বাংলাদেশে টেকসই গণতন্ত্র এখনও সোনার হরিণ। এমনকি গণতন্ত্রের প্রাথমিক শর্ত যে অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, তার জন্যও কোনো টেকসই ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায়নি। স্বাধীনতার পর থেকে আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতায় যারাই এসেছে তারাই ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করার চেষ্টা করেছে। অনির্বাচিত বা অবৈধ সামরিক শাসকের কথা এখানে বলা বাহুল্য, আমি নির্বাচিত সরকারগুলোর কথা বলছি। সুষ্ঠু ভোটের দাবিতে এখানে বারবার গণঅভ্যুত্থান হয়েছে।

এমনকি যে আওয়ামী লীগ ১৯৭০ সালের ভোটে বিপুল বিজয় পেয়েও তৎকালীন পাকিস্তানি সরকারের ঔপনিবেশিক নীতির শিকার হয়ে জনগণকে মুক্তিযুদ্ধের দিকে ধাবিত করল, সেই দলই জনগণের ম্যান্ডেটের বাইরে গিয়ে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করেছে। এ কারণে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ধাক্কায় দলটি এক প্রকার মাঠের বাইরেই চলে যেতে বাধ্য হলো। ১৯৯৬ সালে তৎকালীন সব বিরোধী দলের সম্মিলিত দাবি মেনে সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্তির ঘটনাটিও তৎকালীন বিএনপি সরকারের যে কোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার চেষ্টার কারণেই ঘটেছিল।

আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাকে বিতর্কিত করার প্রথম পদক্ষেপ– সংসদে বিচারপতিদের বয়স বাড়ানোর উদ্দেশ্যও ছিল যেনতেন নির্বাচন করে ক্ষমতায় থেকে যাওয়া। অতএব, একটা টেকসই নির্বাচন ব্যবস্থা গড়ে তোলা যেমন সময়ের দাবি তেমনি এর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থাও জরুরি।

কিন্তু এই কাঙ্ক্ষিত নির্বাচন ব্যবস্থাটি কোনো অরাজনৈতিক সরকার করে দেবে, এমন চিন্তাও কার্যকর নয়। গণভোটের ফল সেটাই বলছে। অনস্বীকার্য, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে ওপরে বর্ণিত তিক্ত অভিজ্ঞতা পেয়েই নাগরিকদের একটা অংশের উৎসাহে রাষ্ট্র সংস্কারের অরাজনৈতিক উদ্যোগটি গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু মাথাব্যথার জন্য তো মাথা কেটে ফেলা কোনো সমাধান নয়। রাজনৈতিক অসুখ রাজনৈতিক প্রক্রিয়াতেই সারাতে হয়। না হলে সে অসুখ বারবার ফিরে আসে।

দেশের বাইরে বিশেষত গণতন্ত্রন্ত্রের সূতিকাগার বলে পরিচিত ইউরোপ-আমেরিকায় যেমন এর ভূরি ভূরি নজির আছে, তেমনি দেশের ভেতরেও তা কম নেই। এখানে দুর্নীতি দমন কমিশনসহ অনেক কথিত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান গত তিন দশকে উন্নয়ন সহযোগী বলে পরিচিত বিদেশি রাষ্ট্র ও সংস্থার চাপে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর একটাও আজ পর্যন্ত কার্যকর নয়।

আমি মনে করি, যে দল বা জোটের হাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রাষ্ট্রটা তুলে দিতে দ্বিধা করে না, সে দল বা জোটেরই ওপর কাঙ্ক্ষিত রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ও ন্যস্ত করতে হবে। সে হিসেবে এবারের সংসদ নির্বাচনে জয়ী দলের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজিত পক্ষও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তার জন্যও বিজয়ী পক্ষের ইতিবাচক মনোভাবই প্রভাবক হিসেবে কাজ করবে।

শেষ কথা হলো, এবারের নির্বাচনে বিএনপি জিতে গেলেও যে দলটির সঙ্গে তাকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হয়েছে, সেই জামায়াতে ইসলামী দীর্ঘদিন তারই নির্বাচন ও আন্দোলনের মিত্র ছিল। মূলত একই ভোট ব্যাংকনির্ভর হওয়ায় অন্তত নির্বাচনের প্রচারকালে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তা ছাড়া এবার জামায়াতে ইসলামী যে পরিমাণ আসন ও ভোট পেয়েছে, অতীতে কখনোই এর ধারেকাছে তার সাফল্য ছিল না।

সংসদে বিরোধী দল হিসেবে দলটি যদি বিএনপিকে আরও ক্লেম দেয় তাহলে বিস্ময়ের কিছু থাকবে না। সর্বোপরি, উপযুক্ত কৌশল নিয়ে দলটি যে আগামীতে বিএনপির ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলবে না– সে নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবে না। সে ক্ষেত্রে শুধু বিএনপিই বিপদে পড়বে না; গোটা দেশই নতুন সংকটে পড়তে পারে। মনে রাখতে হবে, চরম রক্ষণশীল জামায়াত শুধু নারী, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু এবং বিভিন্ন প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থবিরোধী শক্তি হিসেবেই পরিচিত হয়নি; আন্তর্জাতিক মহলের অন্যতম উদ্বেগ উগ্রবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবেও চিহ্নিত।

এ প্রেক্ষাপটে বর্তমান রাজনৈতি বিন্যাস নিয়েই বিএনপিকে নতুন করে ভাবতে হবে। এবারের নির্বাচনে নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ থাকায় বিএনপি হয়তো কিছুটা লাভবান হয়েছে। কিন্তু এটা সাময়িক। আওয়ামী লীগ আজ হোক কাল হোক ঘুরে দাঁড়াবার চেষ্টা করবেই। তদুপরি আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি বরং জামায়াতকেই বেশি সুবিধা দিয়েছে। বিএনপি সঠিক পদক্ষেপ না নিলে জামায়াতের এ সুবিধা আরও বাড়বে, যার ইঙ্গিত ওপরে দেওয়া হয়েছে।

গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের আকাঙ্ক্ষা জনপরসিরে তীব্র হয়ে উঠেছে, তাকে সম্মান দিতে হলেও বিএনপিকে সমাজে বিরাজমান সকল মতকে সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে।

তবে গণতন্ত্রের এ নতুন অভিযাত্রা টেকসই করতে হলে নাগরিকদের সচেতন সক্রিয়তাও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকার করা যাবে না। নতুন সরকার গঠিত হওয়ার পর থেকেই তাদের এ সক্রিয়তা শুরু করতে হবে। ইউরোপ ও আমেরিকার অভিজ্ঞতাও বলে, শক্তিশালী নাগরিক আন্দোলনই রাজনীতিকে সঠিক পথে রাখে।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত