শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

ঘৃণার চাষ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৮, ২০২৬
সাজ্জাদ সিদ্দিকী

‘সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকা কঠিন’– এ ধরনের হতাশাজনক বাক্য আজকাল বেশি উচ্চারিত হচ্ছে। অনেকের মতে, এর মূলে রয়েছে দীর্ঘ সময় ধরে চলমান ‘ঘৃণার চাষ’। ঘৃণা হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে আসে না। ঘৃণার পেছনে কার্যকারণ সম্পর্কের যৌক্তিকতা অনস্বীকার্য। তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে যখন অনিয়ন্ত্রিত ঘৃণার চাষ চলে, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামোও ভেঙে পড়তে দেখা যায়। ইতিহাসে এর অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে।

সম্প্রতি প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার পত্রিকার সঙ্গে ছায়ানট ও উদীচী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগের ঘটনা এ ঘৃণা প্রকল্পের অংশ। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অবস্থাও এতে ধরা পড়ে।

ওই ন্যক্কারজনক ঘটনা যখন ঘটছিল তখন নিউ এজ পত্রিকার সম্পাদক নূরুল কবীর ডেইলি স্টার কার্যালয়ের সামনে উপস্থিত হয়েছিলেন সহিংসতা রোধ এবং সংঘাতের শান্তিপূর্ণ নিরসনের লক্ষ্যে। কিন্তু উন্মত্ত আক্রমণকারীদের একটি অংশ নূরুল কবীরের ওপর হামলা চালায়। এই ঘটনা শুধু একজন ব্যক্তির ওপর আক্রমণ নয়। এটি যুক্তি ও নৈতিকতা-সমৃদ্ধ একজন দেশপ্রেমিক মধ্যস্থতাকারীর ওপর আক্রমণ।

তাত্ত্বিক দিক বিবেচনায় এই ঘৃণানির্ভর আক্রমণকে ‘কাঠামোগত সহিংসতা’র (স্ট্রাকচারাল ভায়োলেন্স) আলোকে মূল্যায়ন করার সুযোগ আছে। ঘৃণাকে যখন সামাজিকভাবে স্বাভাবিক করে তোলা হয়, তখন সেটিই কাঠামোগত সহিংসতায় রূপ নেয়, যা শারীরিক আক্রমণ, এমনকি কবর থেকে লাশ উত্তোলন করে পোড়ানোর মতো জঘন্য অপরাধের তথাকথিত ‘ন্যায়ের ভিত্তি’ তৈরি করে!

দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের লক্ষ্যে ভিন্নমতের মানুষকে ঘৃণা ও লাঞ্ছনার শিকার কিংবা সুপরিকল্পিতভাবে চরিত্র হনন করা আমাদের সমাজে একটি নিয়মিত চর্চায় পরিণত হয়েছে। এই সংস্কৃতি বিচারহীনতা আর অসহিষ্ণুতার এক ভয়াবহ নজির হিসেবে আমাদের নৈতিক ভিত্তিকেই ধসিয়ে দিচ্ছে।

শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়নের প্রতিষ্ঠাতা নরওয়েজিয়ান চিন্তাবিদ ইউহান গালতুং দেখিয়েছেন, ক্ষেত্রবিশেষে এই কাঠামোগত সহিংসতা সরাসরি সশস্ত্র সহিংসতার চেয়েও বেশি বিপজ্জনক। এ ধরনের সহিংসতা দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতের সৃষ্টি করে, যা সংঘর্ষ-পরবর্তী শান্তি বিনির্মাণের পথে বড় বাধার সৃষ্টি করে।

আজকাল ঘৃণা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ‘বস্তুতে’ পরিণত হয়েছে। এই ঘৃণা উৎপাদন, লালন এবং সুযোগ বুঝে ব্যবহার করা হচ্ছে। যার বেশির ভাগের পেছনে আছে গোষ্ঠীভিত্তিক প্রতিশোধপরায়ণতা এবং ব্যক্তিগত জিঘাংসা। এসবই নির্ধারিত হয় বিশেষ গোষ্ঠীর সাময়িক রাজনৈতিক সুবিধা অর্জনের তথাকথিত ‘ন্যায়ের ফ্রেম’-এ ফেলে। এই ঘৃণার পরিবেশেই আক্রান্ত হয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

আক্রান্ত হয়েছেন সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবীর। গণতন্ত্র, মুক্তিযুদ্ধ, মানবাধিকার ও পারস্পরিক সম্মানের পক্ষে কলম ধরার কারণে এ দেশে সংবাদমাধ্যম ও সম্পাদক আগেও কায়েমি স্বার্থের রোষানলে পড়েছেন; এমনকি রাষ্ট্রীয় শক্তি ব্যবহার করে গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধও চলেছে। কিন্তু এবার যা ঘটল তা আগে কখনও দেখা যায়নি। সরকারের নাকের ডগায় পরিকল্পিত ঘৃণা ছড়িয়ে, মব সৃষ্টি করে সংবাদমাধ্যমকে থামিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা হলো। সরকার নিছক বিবৃতি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলল।

আমরা যদি এই ঘৃণার উৎস ও কাঠামোগত কারণ চিহ্নিত করতে ব্যর্থ হই, তবে তা হবে রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা। এই ভয়ংকর প্রবণতা ক্রমে কতটা গভীর ও ব্যাপক হয়েছে, তা স্পষ্ট বাউলদের ওপর হামলা, মাজারে আক্রমণ, শিক্ষকের ওপর শিক্ষার্থীর মব ভায়োলেন্স কিংবা কবর থেকে লাশ উঠিয়ে পোড়ানোর ঘটনায়। ঘৃণা ও সহিংসতানির্ভর এই প্রবণতা দেশ গঠনের পথে এক বিপজ্জনক সামাজিক ব্যাধি। কারও আদর্শ বা চিন্তা অনেকের সঙ্গে না-ই মিলতে পারে। কিন্তু কোনো যুক্তিতেই তা অপমান বা হত্যার ন্যায্যতা তৈরি করে না।

সমাজের একটি অংশ যখন প্রকাশ্যে হত্যার পর হত্যাকারীকে বাহবা দেয়, তখন তা নিছক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি নয়; বরং গভীর নৈতিক সংকটেরই ইঙ্গিত দেয়। এই প্রবণতা একই সঙ্গে গভীর রাজনৈতিক সংকটেরও ইঙ্গিত। এভাবেই সহিংসতা সামাজিকভাবে ‘স্বাভাবিক’ হয়ে ওঠে।

ওসমান হাদির মৃত্যু সংবাদ প্রকাশের পরপরই দেশব্যাপী যে সহিংস প্রতিক্রিয়া ছড়িয়ে পড়ে, তাতে প্রকৃত অপরাধী বা হত্যার পেছনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খোঁজার চেয়েও অন্য উদ্দেশ্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এতে হত্যাকারী এবং কাঠামোগত ব্যর্থতা দায়মুক্তি পায়। আগুন ও ভাঙচুরে ব্যস্ত হয়ে এক সহিংসতার বিপরীতে আরেক সহিংসতা তৈরির চেষ্টা হচ্ছিল। এতে সব অপরাধ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যায়, কিন্তু কোনোটিরই পূর্ণাঙ্গ বিচার হয় না।

এই পরিস্থিতিতে সমাজে এক ধরনের নেতিবাচক সহনশীলতা (রেজিলিয়েন্স) তৈরি হচ্ছে; মানুষ অবচেতন মনেই সহিংসতার সঙ্গে ‘খাপ খাইয়ে’ নিতে শিখছে। এটি দীর্ঘ মেয়াদে রাষ্ট্রের জন্য ভয়াবহ। এই বাস্তবতায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো তরুণদের আচরণ ও মানসিকতা। ইতিহাস বলে, বিভিন্ন সময়ে কিছু ‘পর্দার আড়ালের নেকড়ে’ তরুণদের ক্ষোভ ও হতাশাকে পুঁজি করে সহিংস রাজনীতি উস্কে দেয়। এই মুহূর্ত তরুণদের সঙ্গে সংলাপ ও রিকনসিলিয়েশনের উপযুক্ত সময়।

তাদের শেখাতে হবে কীভাবে ‘অহিংস সক্রিয়তাবাদ’ (নন-ভায়োলেন্ট অ্যাক্টিভিজম)-এর মাধ্যমে দাবি উত্থাপন করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর নির্বাচিত ছাত্র সংসদ এ ক্ষেত্রে কার্যকর হতে পারত, যা বাস্তবে অনুপস্থিত। তারা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ক্ষেত্রবিশেষে এর উল্টো চিত্রই পরিলক্ষিত হচ্ছে।

দিন শেষে প্রশ্নটা খুব মৌলিক। আমরা কি মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা অর্থাৎ একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের দিকে এগোচ্ছি, নাকি ঘৃণা ও সহিংসতার একই বৃত্তে ঘুরপাক খাচ্ছি? যদি আমরা এক অপরাধ দিয়ে আরেক অপরাধের ন্যায্যতা দেওয়ার এই প্রবণতা থেকে বের হতে না পারি, তবে সেই মুক্তির স্পিরিট শুধু স্মৃতিতেই রয়ে যাবে; বাস্তবে নয়।

ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
sazzadhsiddiqui@du.ac.bd

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত