
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুক্রবার এক জমায়েতের মধ্য দিয়ে নতুন ‘রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম’ নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশন ‘এনপিএ’ আত্মপ্রকাশ করেছে। উদ্যোক্তারা যদিও বলছেন, এটা রাজনৈতিক ‘দল’ নয়; রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা কম নয়।
এ দেশে ‘মঞ্চ’ থেকে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরের উদাহরণও কম নেই। যেমন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে গঠিত ‘জাতীয় নাগরিক কমিটি’ ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ‘জাতীয় নাগরিক পার্টি’ হয়েছিল।
২০১২ সালে গঠিত ‘রাষ্ট্রচিন্তা’ ২০২১ সালে এসে ‘রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন’ নামে রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত হয়েছিল।
আরও আগে, ২০১২ সালে গঠিত রাজনৈতিক দল ‘নাগরিক ঐক্য’ প্রথমে সংগঠিত হয়েছিল সেই সময়ের প্রথম সারির টকশো বক্তাদের অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে। আজকের গণফোরামও শুরুতে ছিল অরাজনৈতিক সংগঠন ‘গণতান্ত্রিক ফোরাম’।
নবগঠিত রাজনৈতিক মঞ্চ এনপিএ রাজনৈতিক দলে রূপান্তর হবে কিনা– ভবিষ্যতের প্রশ্ন। এখন যখন জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্মুখ সারির তরুণদের একটি অংশ চান্দাবাজি, ধান্দাবাজি, মববাজি, ঢপবাজিকে বেছে নিয়েছে; একটি অংশ যখন নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের নামে পুরোনো বন্দোবস্তে আত্মসমর্পণ করেছে, তখন আরেকটি অংশ ‘জুলাই-পরবর্তী সময়ে কল্যাণ রাষ্ট্র হয়ে ওঠার পথে বাংলাদেশের প্রধান কাঠামোগত সমস্যাগুলোকে চিহ্নিত করে সমাধানমূলক রাজনৈতিক ভাষ্য ও কর্মসূচি নির্মাণ’ করতে চাইলে তাদের স্বাগত জানানোই কর্তব্য।
মনে আছে, অন্তত দুই দশক আগে লেখক ও তাত্ত্বিক বদরুদ্দীন উমর এক নিবন্ধে আক্ষেপ করেছিলেন, নদী বা পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি কেবল পরিবেশবাদীদের নয়, রাজনৈতিক বর্গেরও কর্মসূচি হওয়া উচিত। তিনি লিখেছিলেন, ‘যে বিষয়টি বিশেষভাবে উপলব্ধি করা দরকার তা হলো, জনগণের ভেতর থেকে তাদের নিজস্ব প্রতিনিধিদের নেতৃত্বেই এই নদী বাঁচাও আন্দোলন হওয়া দরকার’ (বদরুদ্দীন উমর, পরিবেশ বিপর্যয়ের পথে বাঙলাদেশ, শ্রাবণ, ২০১০)।
এনপিএ গঠনের দিন শহীদ মিনারে উপস্থিত কবি ও তাত্ত্বিক ফরহাদ মজহারও প্রায় দেড় যুগ আগে এক নিবন্ধে লিখেছিলেন, ‘সাধারণভাবে উপমহাদেশে পরিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্যের পক্ষে একটা সচেতনতা আছে। সেই সচেতনতাকে যদি কোনো রাজনৈতিক অভিমুখ আমরা দিতে চাই তাহলে আমাদের ভূমিকা পেছনের কাতারে থাকলে চলবে না।… টিপাইমুখ প্রকল্পের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে যে ঐক্যের চিহ্ন আমরা দেখছি তার বিকাশের মধ্য দিয়েই উপমহাদেশে প্রাণ ও পরিবেশের রাজনীতির নতুন অভিমুখ তৈরি হবে’ (ফরহাদ মজহার, প্রাণ ও প্রকৃতি, আগামী প্রকাশনী, ২০১১)।

এটা ঠিক, স্বাধীনতার আগে-পরে গঠিত রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্র, ঘোষণাপত্র, ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নটি কার্যত অনুপস্থিত। কিন্তু একুশ শতকে এসে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো যেমন তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ সুরক্ষার অঙ্গীকার যুক্ত করেছে, তেমনই নবগঠিত রাজনৈতিক দলগুলোও ঘোষণাপত্রে পরিবেশ বিষয়ে সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করতে থাকে।
এ প্রসঙ্গে বিশেষভাবে বলতে হবে গণসংহতি আন্দোলনের কথা। সেই ২০০২ সালে যাত্রাকালে দলটির ‘গণতান্ত্রিক রূপান্তরের রূপরেখা’ শীর্ষক ঘোষণায় বলেছিল– ‘ধ্বংসের হাত থেকে প্রকৃতিকে রক্ষা করাই হবে আমাদের প্রথম কর্তব্য’।
২০২১ সালে গঠিত বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের ঘোষণাপত্রেও ‘মৌলিক অধিকার’ শিরোনামে বলা হয়েছিল– ‘দেশের প্রাণ প্রকৃতিকে দেশের উত্তরসূরীদের জন্য হেফাজতে রাখাকে রাষ্ট্রের পবিত্র দায়িত্ব হিসাবে গণ্য করা হবে।’
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি গতবছর ফেব্রুয়ারিতে আত্মপ্রকাশকালে ২৪ দফা ইশতেহারে বলেছে- ‘আমরা একটি জলবায়ু-সহনশীল, দূষণমুক্ত ও পরিকল্পিত বাংলাদেশ গড়ব যেখানে নদী, বায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবুজ-প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।’
সর্বশেষ এনপিএ তাদের পঞ্চম মূলনীতিতে বলছে– ‘আমরা প্রাণ, প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে চাই। প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে আমরা একটি নিরাপদ, স্বাস্থ্যকর ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই।’ দেশের নতুনতর রাজনৈতিক দল বা মঞ্চগুলোর প্রাণ-প্রকৃতি সুরক্ষায় অঙ্গীকার নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। বিশেষত এনপিএ যেভাবে পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্নটি মূলনীতিতে নিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, আর দশটি অরাজনৈতিক পরিবেশবাদী আন্দোলন বা সংগঠনের সঙ্গে রাজনৈতিক দল বা মঞ্চগুলোর ঘোষণার
পার্থক্য কী?
আমি যতদূর বুঝি, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সংগঠনের মূল পার্থক্য হচ্ছে অর্থনৈতিক ও উৎপাদন ব্যবস্থার রূপান্তরের প্রশ্ন। ইউরোপে, বিশেষত জার্মানি ও যুক্তরাজ্যে যে নানা নামে ‘গ্রিন পার্টি’ গড়ে উঠেছে এবং নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় ও কেন্দ্রীয় সরকারের অংশ হতে পেরেছে, তারা শুরু করেছিল অর্থনৈতিক অধিকার ও সমতা এবং উৎপাদন পদ্ধতির প্রশ্ন সামনে এনে।
সেখানে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোরও পরিবেশ সুরক্ষায় অঙ্গীকার কম নেই। কিন্তু গ্রিন পার্টিগুলো দেখেছে ও দেখিয়েছে, পরিবেশ সুরক্ষায় শুধু অর্থনৈতিক সুশাসনই যথেষ্ট নয়; বরং এমন অর্থনৈতিক কাঠামো ও কর্মসূচি প্রয়োজন, যেখানে অর্থনৈতিক তৎপরতার মধ্য দিয়ে প্রাণ-প্রকৃতির জন্য ঝুঁকি তৈরি হবে না। উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে পরিবেশ দূষণের ঝুঁকি অবধারিত হয়ে উঠবে না।
স্থানাভাবে উদ্ধৃত করছি না; কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, জাতীয় নাগরিক পার্টি, এনপিএ, এমনকি গণসংহতি আন্দোলনের ঘোষণাপত্রের অর্থনৈতিক অঙ্গীকার দেখলে স্পষ্ট হয়, বিদ্যমান ব্যবস্থাতেই শুধু সুশাসন নিশ্চিত করতে চাওয়া হচ্ছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান রাসায়নিক কৃষি ব্যবস্থা রেখে বিনিয়োগ ও ঋণ ব্যবস্থায় যত সুশাসনই আনা হোক, এর মধ্য দিয়ে কি নদী ও খাল-বিলের সুপেয় পানি ও মৎস্যসম্পদ রক্ষা করা যাবে? যেমন কারখানাগুলোতে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিত করলেই কি নদীদূষণ বন্ধ হবে?
নতুন উদ্যোগটি যখন ‘প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ সুরক্ষা’ পাঁচ মূলনীতির মধ্যে স্থান দিয়েছে, তখন সামান্য নদীকর্মী হিসেবে ব্যক্তিগত আগ্রহের সঙ্গে গোষ্ঠীগত অনুসন্ধিৎসাও তৈরি হয় বটে। কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও উৎপাদন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা না গেলে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি অটোরিকশা সবুজ রঙে রাঙিয়ে ‘গ্রিন ট্রান্সপোর্ট’ চালুর মতোই অসার।
প্রসঙ্গত, যতবারই কোনো রাজনৈতিক দল তাদের পরিবেশ বিষয়ক সভা-সমাবেশ বা কর্মসূচিতে আমাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে, অবধারিতভাবেই পরামর্শ দিয়েছি, নদী ও প্রতিবেশই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে জরুরি রাজনৈতিক এজেন্ডা। দেশজুড়ে পরিবেশের এতটা বিপর্যয় ঘটছে এবং তাতে স্থানীয় ও জাতীয়ভাবে মানুষের জীবন ও জীবিকা এতটা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যে কোনো রাজনৈতিক দল শুধু পরিবেশ ইস্যুতে জাতীয় সংসদের প্রতিটি আসনে বিপুল জনসমর্থন পেতে পারে।
আমার ক্ষুদ্র পর্যবেক্ষণ, বাংলাদেশের রাজনৈতিক জমিন এখন গ্রিন পার্টি ধরনের রাজনৈতিক দল ও মঞ্চের জন্য প্রস্তুত। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে পরিবেশ, প্রাকৃতিক সম্পদ, জীববৈচিত্র্য, জলাভূমি, বন এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও উন্নয়নে ১৮/ক অনুচ্ছেদ যুক্ত করেছিল। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী তো গত কয়েক দশক ধরেই নির্বাচনী ইশতেহারে পরিবেশ রক্ষার অঙ্গীকার করছে। উপরন্তু বিএনপি সম্প্রতি ‘নদী-খাল-বিল ও পরিবেশ রক্ষায়’ পরিকল্পনাও প্রকাশ করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনসহ নতুনতর রাজনৈতিক দল ও প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য অযাচিত পরামর্শ হচ্ছে, প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষার প্রশ্নটি আর দশটা দফার অন্যতম হিসেবে নয়; বরং মূল অভিমুখ করে তোলা উচিত। পরিবেশ সুরক্ষার প্রশ্ন থেকেই যেখানে শাসন, উৎপাদনসহ অন্যান্য ব্যবস্থা রূপান্তরের প্রশ্নগুলো আসবে। এখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও উৎপাদন পদ্ধতি যদি একই হয়; পরিবেশ-প্রকৃতি বিপর্যয়ে বিধস্ত জনগোষ্ঠী মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোকে ছেড়ে নতুনদের সমর্থন জানাবে কেন?
আর শতাব্দীপ্রাচীন শক্তিশালী রাজনৈতিক দলের ভিড়ে প্রকৃতি রক্ষার প্রশ্নে নবীন গ্রিন পার্টিগুলোর জায়গা করে নেওয়ার ইউরোপীয় উদাহরণ তো রয়েছেই!
শেখ রোকন: লেখক ও নদী গবেষক
skrokon@gmail.com
সূত্র: সমকাল