
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে আমরা দেখেছি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকে (ইউএপি) আন্দোলনের মুখে গত রোববার দুই শিক্ষককে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের একটা অংশ দাবি করেছে, ওই দুই শিক্ষকের একজন ‘ইসলামবিদ্বেষী’, অপরজন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত।
কারণগুলো বিশ্লেষণের আগে এটা বলা দরকার যে, আপাতদৃষ্টিতে সহকারী অধ্যাপক লায়েকা বশির ও সহযোগী অধ্যাপক একেএম মহসিনকে তড়িঘড়ি করে যথার্থ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে অনুচিত চাপ ও দাবির মুখে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের ভুল সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের বহুমুখী নেতিবাচক প্রক্রিয়া পুরোপুরি বিবেচিত হয়েছে বলে মনে হয় না।
২. সংবাদমাধ্যম থেকে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিক্ষকদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। সামাজিক মাধ্যমে ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের জন্য কিছু শিক্ষার্থীর অভিযোগের কারণে একজনকে চাকরিচ্যুত করা হলো এবং এ নিয়ে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় তাঁর জ্যেষ্ঠ এক সহকর্মীকেও পদচ্যুত করা হলো। এই চরম শাস্তির ফলে অধ্যাপকদের জীবন-জীবিকা ও মর্যাদায় কী হানি ঘটতে পারে তা বিবেচিত হয়নি। নিঃসন্দেহে লঘু পাপে গুরুদণ্ড। আদৌ কোনো পাপ ঘটেছে কিনা, সে প্রশ্নও তোলা যায়।
৩. এ ঘটনায় আরও কিছু বড় ও প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন সামনে এলো আবার। শিক্ষাঙ্গন ও সমাজে বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা কী? মুক্তচিন্তা, স্বাধীন জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, ভিন্নমত সহিষ্ণুতা–এসবের পক্ষে কি বিশ্ববিদ্যালয় থাকবে? নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে সুবিবেচনা ও ভারসাম্য রক্ষার প্রয়োজন আছে। বিশেষ গোষ্ঠী বা চক্রের বিভিন্ন দাবি, চাপ ও আন্দোলন নানা বিষয়ে থাকবেই। এসব সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কিন্তু আত্মসমর্পণের সহজ পথ বেছে নেওয়া যায় না। তাতে নতুন সমস্যার সৃষ্টি হয়। তার চেয়ে বড় কথা, সমাজে বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্ব ও ভূমিকাকে ক্ষুণ্ন করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বহু বিদ্যালয় ও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষকদের হেনস্তা, শারীরিক আক্রমণ–এমনকি পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনা দেখা গেছে। স্বৈরাচারের পক্ষে বা সহযোগী এই অভিযোগের নামে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। ব্যক্তিগত বিরোধ বা স্বার্থের সংঘাতের জের ধরে এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে। অল্পসংখ্যক স্বার্থান্বেষী লোক দল তৈরি করে বিনা বাধায় এ কাজ করতে পেরেছে। কোনো রাজনৈতিক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিষয়ে অজনপ্রিয় মতপ্রকাশ অপরাধ নয়।
কেউ যদি কোনো উগ্র বা চরম মত ধারণ করে বা তার প্রকাশ ঘটায়, যার ফলে সমাজে বিশৃঙ্খলা বা অন্যের অধিকার খর্ব হতে পারে, তাহলে আইনে তা অপরাধ বলে বিবেচিত হতে পারে। তবে তার বিচার হবে আইনি প্রক্রিয়ায়, নিশ্চয় কোনো ‘মব’ বা মস্তানদের শক্তির মহড়া করে নয়। পরিতাপের বিষয়, গণঅভ্যুত্থানের ফলে কর্তৃত্ববাদী শাসন ও গোষ্ঠীতন্ত্রের পতনের পরও শক্তির মহড়া দেখিয়ে স্বার্থ উদ্ধারের ধারা চলছে।
৪. ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত’ বা ‘স্বাধীনতার চেতনার বিরোধিতা’ বা ‘জাতির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়া’ ইত্যাদি বিমূর্ত ও অস্পষ্ট ধারণার ভিত্তিতে কর্তৃত্ববাদী শাসকদের তৈরি করা আইনে বিনা জামিনে গ্রেপ্তার ও শাস্তির বিধান এখনও আছে। এসব আইনের প্রয়োগও চলছে।
রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় বিষয়ে মত ও বিশ্বাসের ভিন্নতা বা পরস্পরবিরোধী অবস্থান আমাদের সমাজে বড় আকারে আছে। এই বাস্তবতা অস্বীকার করা মূঢ়তা। তেমনি এক মত বা বিশ্বাসকে যে কোনো উপায়ে অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টাও নির্বুদ্ধিতা। প্রয়োজন ভিন্নতাকে গ্রহণ করা, বুঝতে চেষ্টা করা। প্রয়োজন সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে যথাসম্ভব মতৈক্য, সমঝোতা ও আপসের সংস্কৃতি তৈরি করা।
ভিন্নতার প্রতি সম্মান এবং সহিষ্ণুতার চর্চা সমাজ ও রাজনীতিতে প্রয়োজন, কিন্তু তা নানাভাবে বাধাগ্রস্ত। এই প্রচেষ্টায় শিক্ষাব্যবস্থা এবং উচ্চতম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা বিবেচনা করতে হবে। ভিন্নমত ও বিশ্বাসের বিচার-বিশ্লেষণ, পারস্পরিক সম্মান ও সহিষ্ণুতার মূল্যবোধ ও আচরণের লালন হতে হবে বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শিক্ষকরা এ ক্ষেত্রে দায়িত্বসম্পন্ন ও সংবেদনশীল কীভাবে হতে পারেন এবং এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের করণীয় নির্ধারণ করতে হবে। এশিয়া প্যাসিফিকের ঘটনায় শিক্ষকরা শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের বৃহত্তর স্বার্থে কী ভূমিকা পালন করতে পারতেন বা এখনও পারেন, তা সংগত প্রশ্ন।
৫. বর্তমান রাজনৈতিক আবহে যে কাউকে নেতিবাচক ট্যাগ লাগিয়ে সামাজিক মাধ্যমকে ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার বিপজ্জনক খেলা চলছে। শিক্ষাঙ্গনেও এর বিস্তার ঘটেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকদের এ সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। এসব প্রতিহত করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। শিক্ষার্থীদেরও এ সম্পর্কে পরামর্শ ও আলোচনায় যুক্ত করতে হবে।
৬. বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য শিক্ষকদের জ্ঞানচর্চা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতাসহ পেশাগত দায়িত্ব ও নিরাপত্তা বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সহযোগিতায় বিধিমালা তৈরি করা যেতে পারে। সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিজস্ব আচরণবিধি বা কোড অব কনডাক্ট থাকতে পারে। সব অংশীজনের সঙ্গে যথেষ্ট আলাপ-সংলাপের মাধ্যমে এ ধরনের আচরণবিধি তৈরি করতে হবে। তাহলে এর যথার্থ প্রয়োগ সম্ভব হবে
অস্বীকার করা যাবে না যে, দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পেশাগত দিক থেকে নানামুখী সংকট মোকাবিলা করছেন। চাকরির যথাযথ বিধিমালা না থাকায় কর্তৃপক্ষ যখন তখন সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দিতে পারেন। এর আগে অন্য আরও বহু ঘটনায়ও তার প্রমাণ আমরা দেখেছি, যে কারণে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অনেকে চাকরির অনিশ্চয়তায়ও ভোগেন।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিযোগিতামূলক বেতন না দেওয়া কিংবা সীমিত পদোন্নতির সুযোগ ইত্যাদি সমস্যার কথা নাইবা বললাম। অথচ অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে যে বড় ভূমিকা পালন করছে, সেখানে শিক্ষকদের অবদান অগ্রগণ্য। অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ই বিশ্বের র্যাঙ্কিংয়ে আছে।
৭. এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের এখন উচিত হবে একটি নিরপেক্ষ কমিটির মাধ্যমে পর্যালোচনা করে অবিলম্বে বর্তমান অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায় খোঁজা।
মনজুর আহমদ: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
বিষয় :