শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ও আসন্ন নির্বাচন

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৩, ২০২৬
মাহবুব আজীজ

আওয়ামী লীগের কর্তৃত্ববাদী ও স্বৈরাচারী শাসনের অন্যতম প্রতীক নারায়ণগঞ্জের কিশোর ত্বকী হত্যা ও এর বিচারহীনতা। ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বাসা থেকে বের হবার দুদিন পর ৮ মার্চ শীতলক্ষ্যা নদীর কুমুদিনী খাল থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের ভাতিজা আজমেরী ওসমানের সহযোগী সুলতান শওকত ভ্রমর, ইউসুফ হোসেনসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব-১১। ভ্রমর ও ইউসুফ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। ত্বকী হত্যা মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। তবে ১৫৪ মাসেও মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়নি।

নারায়ণগঞ্জকে যারা চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের কেন্দ্র বানিয়েছিল, সেই আওয়ামী নামধারী সন্ত্রাসীরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত; আর তাদেরই হাতে নিহত হয় ত্বকী; এখনও ত্বকী হত্যার বিচারে অগ্রগতি না হওয়ার কারণ কী? একইভাবে বহুল আলোচিত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল পেছানো হয়েছে ১২৩ বার।

শুক্রবার ত্বকীর ৩০তম জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে ত্বকী হত্যার বিচারহীনতা প্রসঙ্গে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, ‘পুলিশ কি পারে না তদন্ত করে প্রতিবেদন জমা দিতে? তারা তো পারে। কিন্তু তারা করছে না। কারণ, তাদের করতে দেওয়া হচ্ছে না। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কারণে ত্বকী হত্যার বিচার হচ্ছে না। ত্বকী হত্যা কেবল একটা ঘটনা নয়, এটি এমন অসংখ্য ঘটনার প্রতীক’ (সমকাল, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬)।

দখল, লুণ্ঠন, যথেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিরোধ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের সূত্র ধরে রাজপথে সব শ্রেণি-পেশা-মতের মানুষের যূথবদ্ধ অংশগ্রহণে স্বৈরাচারী সরকারের পতন হয়। এর মধ্য দিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্ত বদলের আকাঙ্ক্ষা সামনে আসে। তবে ১৭ মাস শেষে ত্বকী হত্যাসহ বহু হত্যাকাণ্ডের বিচারহীনতা ও পুরোনো সরকারের গড্ডালিকা প্রবাহ নীতি অনুসরণ ‘সকলই গরল ভেল’ উক্তিকে স্মরণ করিয়ে দেয়।

অন্তর্বর্তী সরকার অরাজনৈতিক সরকার, তার পক্ষেই সম্ভব ছিল নৈর্ব্যক্তিকভাবে এসব হত্যাকাণ্ডের বিচারের ব্যবস্থা করা। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যা ও জুলাই হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার দায়ে অভিযুক্ত ওসমান পরিবারের সদস্যদের বিচারের আওতায় নিয়ে আসবার প্রতিবন্ধকতা কী–তা সন্ধান করতে গেলে পুরোনো রাজনৈতিক বন্দোবস্তের সম্প্রসারণের দেখা মেলে। নইলে মামলার অভিযোগপত্র অন্তর্বর্তী সরকারের ১৭ মাসেও দেওয়া হলো না কেন? কারা বাধা হয়ে দাঁড়াল?

০২.
এই ঢাকঢাক গুড়গুড় সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দেখা যাচ্ছে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়বার প্রতিশ্রুতি বারবার দিলেও অন্তর্বর্তী সরকার নানা ক্ষেত্রে ভয়ের পরিবেশ দূর করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। মবসন্ত্রাস সমাজে বিরাট বিষফোড়া হয়ে দেখা দিয়েছে। এর মূলোৎপাটনের বদলে সরকারের একটি পক্ষ মবসন্ত্রাসকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ বলে রীতিমতো আশকারা দেবার চেষ্টা করেছে। যত্রতত্র আইন নিজের হাতে তুলে নেবার ঘটনা ঘটছে, সমাজে বিকটভাবে উগ্রবাদের আস্ফালন ঘটছে।

নারীর প্রতি সহিংসতা বেড়েই চলেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের পুরো বছরের তুলনায় ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসেই নারী ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগে ১৮ শতাংশ বেশি মামলা হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের পারিবারিক সহিংসতার ৫৬০টি ঘটনা ও ৭৪৯টি ধর্ষণের খবর সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ভুক্তভোগীদের অর্ধেকের বয়স ১৮ বছরের নিচে। মবসন্ত্রাস ও নীতি পুলিশিং নারীর নিরাপত্তাহীনতাবোধ বাড়িয়েছে।

আওয়ামী লীগ সরকার ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে বিরোধী রাজনীতি ও মত দমনে নানা কৌশল ব্যবহার করেছে। সম্প্রতি গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বিষয়টি আরও স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে। গুম কমিশনের সুপারিশ, প্রত্যাশা করা যায়, সরকার বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নেবে। তবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার নির্ভয়ে চলাফেরা ও মতপ্রকাশের অবাধ অধিকার নিশ্চিত করবার জন্য সরকারের আরও দ্রুত ও জনবান্ধব নীতি প্রণয়ন জরুরি। আজকের এই জনগুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ আগামী দিনের রাজনৈতিক সরকারের সামনে মতপ্রকাশের অধিকার নিশ্চিত করবার বিষয়ে উদাহরণ হয়ে থাকবে।

০৩.
আওয়ামী লীগ আমলের সর্বশেষ তিন নির্বাচনের রাজনৈতিক বন্দোবস্ত ছিল একপেশে; ছলে-বলে প্রতারণায় নিজেদের মতো করে নির্বাচন সেরে ফেলা। কার্যত বিরোধী দলশূন্য সংসদ ছিল–‘সব শিয়ালের এক রা’। এবার কার্যক্রম স্থগিত আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা রাজনৈতিক বৃত্ত নির্বাচনে অনুপস্থিত; এই অবস্থায় নির্বাচন কতখানি অন্তর্ভুক্তিমূলক হতে পারে, তা নিয়ে বিতর্ক আছে; যদিও আওয়ামী ভোটারদের নিজ দলে টানবার জন্য বিএনপি, জামায়াতসহ প্রতিটি দলই প্রকাশ্যে-অপ্রকাশ্যে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ও যাবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘গ্রামীণ পর্যায়ে সামাজিক মিটমাট (রিকনসিলিয়েশন) হয়ে গেছে। শহরে হয়তো ততটা হয়নি। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে দল-মত নির্বিশেষে সবাই এখন ভোটের দিকে যাচ্ছে।’ (প্রথম আলো, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬)

নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোর নানা উদ্যোগ-আয়োজনের মধ্যে দলীয় আদর্শ ও কর্মসূচি নিয়ে সরাসরি ও জোরালো কথাবার্তা শুধু বিএনপির পক্ষ থেকেই শোনা যাচ্ছে। দলটি ৩১ দফা আগেই দিয়েছে, ঐকমত্য কমিশনে মতামত দিয়ে জুলাই সনদে স্বাক্ষরও করেছে। জুলাই সনদে জামায়াত স্বাক্ষর করলেও এনসিপি করেনি। জামায়াতসহ দক্ষিণপন্থি ১২ দলের জোট নির্বাচনে জয়লাভ করলে তাদের কর্মসূচি কী হবে, তা স্পষ্টভাবে এখনও জানায়নি। বিশেষত ইসলামী শাসনতন্ত্র ও শরিয়া আইন সম্পর্কে তাদের অবস্থান দ্রুতই পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্রয়োজন তাদের পররাষ্ট্রনীতিসহ গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক বিষয়ে কর্মসূচি জানানো। জামায়াত একজনও নারী প্রার্থীর মনোনয়ন দেয়নি।

দেশের ৫১ ভাগ নারী গত কয়েক দশকে রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রায়, বিশেষত শিক্ষা, অর্থনীতি ও সামাজিক উন্নয়নে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানেও নারীরা ছিল সম্মুখভাগে। জামায়াতসহ ইসলামপন্থি দলগুলো প্রকাশ্য জনসভায় নারী সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনের তুমুল বিরোধিতা করেছে। নারীনীতি সম্পর্কে নির্বাচনের আগেই দক্ষিণপন্থি এ জোট অবস্থান স্পষ্ট করবে, নিশ্চয়ই ভোটাররা তা প্রত্যাশা করেন।

রাজনৈতিক দলগুলোকে ক্ষমতা প্রশ্নেও নিজ অবস্থান জাতির সামনে স্পষ্ট করতে হবে। সরকারি দল ও বিরোধী দল দুটোই সংসদ ও দেশের জন্য সমানভাবে প্রয়োজন। এখানে পাতানো খেলা বা ‘আমরা ও আমাদের মামারা’ জাতীয় সংস্কৃতি চালুর কোনো অবকাশ নাই। যে পুরোনো বন্দোবস্ত জাতীয় পার্টির সঙ্গে আওয়ামী লীগ সম্পন্ন করে সংসদকে হাস্যকর ও অর্থশূন্য এককেন্দ্রিক করেছে; গণঅভ্যুত্থানজয়ী জাতি তার পুনর্মঞ্চায়ন অবশ্যই দেখতে চায় না।

নির্বাচনোত্তর জাতীয় সংসদ হতে হবে বুদ্ধিদীপ্ত, যুক্তি-মুখরিত। তর্কে-বিতর্কে উজ্জীবিত প্রাণবন্ত সংসদে ক্ষমতার চোখে চোখ রেখে যে কোনো যুক্তিসংগত অভিযোগ উত্থাপন করতে পারবে বিরোধী দল। রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে বিরোধী দল ও মতামত তার প্রাপ্য সম্মান ও মর্যাদা পাবে। সংসদের এই পরমতসহিষ্ণুতা ছড়িয়ে পড়বে সমাজের তৃণমূল পর্যন্ত। পুরোনো বন্দোবস্তের জোরজবরদস্তি, পেশিবাদ, স্বজনপ্রীতি ও গোষ্ঠীপ্রীতির গোলকধাঁধা থেকে বেরিয়ে আসবার দিকনির্দেশনা ও প্রস্তাবনা আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো জরুরি ভিত্তিতে জাতির সামনে পেশ করবে, নির্বাচনের ক্ষণগণনার পাশাপাশি আমরা তা দেখবার অপেক্ষায়।

মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক, সমকাল ও সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত