
এবারই প্রথম প্রবাসীরা পোস্টাল ব্যালটে ভোট দেবেন। প্রবাস থেকে ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন ভোটার নাম নিবন্ধন করেছেন। দেশের ভেতরে নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকার কারণে নিজ কেন্দ্রে উপস্থিত থেকে ভোট দিতে না পারায় পোস্টাল ভোট দেওয়ার জন্য নিবন্ধন করেছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪০ জন। চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকার পর প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ করা হচ্ছে আজ। এর পর আসন অনুযায়ী ব্যালট পেপার ছাপানো শুরু হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের তারিখ ১২ ফেব্রুয়ারি। অর্থাৎ ব্যালট ছাপানো থেকে ভোট গ্রহণ পর্যন্ত মোট ২১ দিন। এই সময়ের মধ্যে প্রবাসী ভোটারের কাছে আসনভিত্তিক ব্যালট পাঠিয়ে ভোট নিয়ে সেই ব্যালট ফেরত আনা সম্ভব নয়। সে জন্যই ইসি সকল প্রতীক-সংবলিত সাধারণ ব্যালট পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঘোষিত প্রতীক ১১৯টি; কার্যক্রম স্থগিত আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক বাদ দিলে সক্রিয় প্রতীক ১১৮টি। এর মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য বরাদ্দ ৬০টি; বাকিগুলো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য। যদি কোনো আসনে একজন প্রার্থী হন তবে তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে ‘না’
প্রতীকের বিপরীতে। তাই পোস্টাল ব্যালটে ১১৯ নম্বর প্রতীক ‘না’।
সংকটের উদ্ভব ব্যালট পেপারের দুই পাতার একদম ওপরের ডান কোনায় যথাক্রমে দাঁড়িপাল্লা ও হাতপাখা প্রতীকের অবস্থান নিয়ে। কোনো কোনো পক্ষ বলছে, এটি ইচ্ছাকৃত; বিশেষ দল বা জোটকে সুবিধা দিতে। নির্বাচন কমিশন বলছে, এটি কাকতালীয়। গেজেটে যেভাবে প্রতীকের নাম লিপিবদ্ধ আছে, সেভাবেই ব্যালট পেপার তৈরি হয়েছে।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত প্রতীক ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন আকারে প্রকাশিত হয়। দৃশ্যত বাংলা বর্ণমালার ধারাক্রম অনুসরণ করা হলেও সঠিকভাবে অনুসৃত হয়নি। যেমন, এক নম্বর ক্রমিকে দেওয়া আছে ‘আপেল’, দুই নম্বর ক্রমিকে ‘আনারস’। বাংলা একাডেমি অভিধানমতে প্রথমে আনারস তারপর আপেল।
কমিশন ৯ নম্বর ক্রমিকে ‘কাঁচি’ প্রতীক দিয়ে ১৪ নম্বরে দিয়েছে ‘কাঁঠাল’। ‘কবুতর’, ‘কলম’, ‘কলস’ ও ‘কলার ছড়ি’ কোন যুক্তিতে কাঁচির নিচে আর কাঁঠালের ওপরে স্থান পেল– বোধগম্য নয়। অভিধানমতে ‘কলম’-এর আগেই ‘কম্পিউটার’ ঠাঁই পাওয়া উচিত বললেও মানছে কে? কমিশনের তালিকায় কম্পিউটার ১৯ নম্বরে আর কলম ১১ নম্বরে।
সেই কবে পড়েছিলাম স্বরবর্ণ; কিন্তু ইসি এ-কার যুক্ত ‘কেটলি’কে ১৭ নম্বরে রেখে ১৮-২১ দিল ‘কুমির’, ‘কম্পিউটার’, ‘কুড়াল’ ও ‘কুলা’। ‘টেবিল ল্যাম্প’ (৪৫) কী করে ‘টেবিল ঘড়ি’র (৪৬) ওপরে যায়? ‘বাঘ’ (৭৬) যত লম্ফঝম্পই করুক, তার অবস্থান হওয়া উচিত ছিল ‘বটগাছ’ (৭৭) ও ‘বাইসাইকেল’-এর (৭৮) নিচে।
বোধহয় একই কায়দায় ‘রেল ইঞ্জিন’ (৯৮) ‘রিকশা’র (৯৯) আগে জুড়ে গেছে। আবার ‘লিচু’র স্থান ‘লাঙ্গল’-এর আগে ১০০তে হয় কেমনে? ‘সিঁড়ি’ (১০৬), ‘সিংহ’ (১০৭) ও ‘সূর্যমুখী’ (১০৮) কোন যুক্তিতে ‘সোনালি আঁশ’ (১০৩), ‘সেলাই মেশিন’ (১০৪) ও ‘সোফা’র (১০৫) আড়ালে গেল, তার নিশ্চয় ভালো ব্যাখ্যা আছে। ‘সেলাই মেশিন’ কেন দুই ‘সো’র চিপায় আটকে গেল?
বাংলা অভিধান অনুযায়ী ‘হাঁস’-এর স্থান ওপরে হলেও নেমে এসেছে ‘হাত’ (১১০), ‘হাতঘড়ি’ (১১১) ও ‘হাতপাখা’র (১১২) নিচে। ‘হাঁস’ যথাস্থানে গেলেই পোস্টাল ব্যালট যে লজিকে তৈরি হয়েছে তাতে একটু গড়বড় হয়ে যেত। কেউ কি যুক্তি খুঁজে পাবেন ‘মোটর’-
সংবলিত আর কোনো প্রতীক না থাকলেও ‘মোটর গাড়ি (কার)’ ৮৬ নম্বর ক্রমিকে থাকলে ‘মোটরসাইকেল’ ৯৪তে কেন?
এসব প্রশ্ন আগে না উঠলেও এখন প্রাসঙ্গিক হয়ে গেছে পোস্টাল ব্যালটের কারণে। ৬৫ নম্বর ক্রমিকের নৌকা স্থগিত হওয়ায় ৬৬ থেকে ১১৯ ক্রমিকের প্রতীকগুলোর ক্রমোন্নতি ঘটে ৬৫ থেকে ১১৮ ক্রমিকধারী হয়ে গেছে।
এই ক্রম পদোন্নতিতে পোস্টাল ব্যালটে অবস্থান অন্য রকম হয়েছে। পোস্টাল ব্যালট এক পাতায় না করে দুই পাতায় করা হয়েছে। এক পাতায় করলে অনেক বড় হতো তাই দুই পাতায় করা– এ ছাড়া অন্য কোনো যুক্তি নেই। আমি অবশ্য জানি না দুটি আলাদা পাতায়, নাকি একই কাগজের দুই পিঠে!
একই কাগজের দুই পিঠে হলে ওজন কমে। তাতে ডাক মাশুল কম লাগবে। ১৫ লাখ ব্যালটের ডাক মাশুল নেহায়েত কম না।
আমরা ছোটবেলা থেকে বর্ণমালা লিখি বাম থেকে ডানে আর শতকিয়া ওপর থেকে নিচে। পোস্টাল ব্যালটে বর্ণমালার ধারা অনুসরণ না করে শতকিয়ার ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। শতকিয়ার ধারা অনুসরণ না করে বর্ণমালার ধারা অনুসরণ করে বাম থেকে ডানে গেলে পরিস্থিতি অন্য হতো। কলাম ও সারির সংখ্যা একটু এদিক ওদিক হলেও প্রতীকগুলোর অবস্থান বদলে যেত।
প্রতীকের সর্বশেষ গেজেটে উভয় পাতায় ৫টি করে কলাম রয়েছে। প্রথম পাতার প্রথম কলাম ৯ ক্রমিকে শেষ হলে ১০ চলে গেছে দ্বিতীয় পাতায় এবং প্রথম পাতার ২য় কলাম ২৫ দিয়ে শুরু হয়েছে। অনুরূপ প্রথম পাতার ২য়, ৩য় ও ৪র্থ কলাম যথাক্রমে ৩৩, ৫৭ ও ৮১তে শেষ হলেও পরবর্তী কলাম শুরু হয়েছে ৪৯, ৭৩ ও ৯৭ দিয়ে। পোস্টাল ব্যালট পেপারে সে রীতি অনুসরণ করলে বলা যেত প্রকাশিত গেজেটের ধারাই অনুসৃত হয়েছে। কিন্তু তা হয়নি। মোট প্রতীক ১১৯টি হলেও পোস্টাল ব্যালটের প্রথম পাতায় ৭০টি ও ২য় পাতায় ৪৯টি প্রতীক ছাপানো হয়েছে।
যুক্তি হিসাবে বলা যেতেই পারে যে, ভোটারের তথ্য, ইসি অফিসারের স্বাক্ষর, প্রভৃতি সন্নিবেশের জন্য নিচে জায়গা রাখতেই দুই পাতায় সারি সংখ্যা কমবেশি হয়েছে। অথচ এই তথ্যগুলো দ্বিতীয় পাতার শেষে না দিয়ে প্রথম পাতার শুরুতে সন্নিবেশ করলে ব্যালটের চেহারা অন্য রকম হতো। কলাম ও সারি কমবেশি করলেও পরিস্থিতি অন্যরকম হতো।
মোদ্দাকথা, দুটো শক্তিশালী দলের প্রতীক শীর্ষ সারির কোনায় ঠাঁই পাওয়া যদি দৈব ইচ্ছায় ঘটে থাকে তাহলে বলার কিছু নেই। অন্যথায় যা বলতে হয়, নির্বাচন কমিশন ‘রুলস অব গেম’ তৈরি না করেই খেলায় নেমে গেছে।
আসনভিত্তিক ব্যালট পেপার প্রণয়নের একটি বিধি আছে– প্রার্থীদের নামের বর্ণানুক্রমে ব্যালট তৈরি। প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোট দেওয়ার বন্দোবস্ত করা হলেও প্রবাসী পোস্টাল ব্যালট প্রণয়ন, বিতরণ, সংগ্রহ ও গণনা নিয়ে কোনো বিধিবিধান তৈরি হয়নি।
বিধিবিধান থাকলে তা প্রণয়নকালেই অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যেত এবং এ রকম প্রশ্নবোধক পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না। বিধি থাকলে তাতেই নিষ্পত্তি হতো– ব্যালট কয় পাতায় হবে; কতটি কলাম হবে; বাম থেকে ডানে, নাকি ওপর থেকে নিচে প্রতীকের বিন্যাস হবে।
বিধিতে উল্লেখ থাকতে পারত ব্যালট পেপার সাজানো হবে প্রতীকের, নাকি দলের আদ্যাক্ষর অনুযায়ী। বিধি থাকলে তা প্রণয়নের সময়ই রাজনৈতিক দলগুলোসহ নির্বাচন-সংশ্লিষ্টদের নজরে পড়ত। বর্তমান বিব্রতকর পরিস্থিতির উদ্ভব হতো না।
আ ক ম সাইফুল ইসলাম চৌধুরী: কলাম লেখক; অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত সচিব
সূত্র: সমকাল