
নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্রে আমরা প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট অনুষ্ঠিত হতে দেখি। সম্প্রতি জামায়াতের আমির সে ধরনের বিতর্কের আহ্বান জানিয়েছেন। এমন বাহাসের দৃশ্যপট কি কল্পনাতেই থেকে যাবে? আমাদের প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের কোনো নির্বাচনী বিতর্ক দেখা যাবে না? অথচ তারা ভোট চাইতে একে অপরের বিরুদ্ধে নানা আক্রমণাত্মক কথা বলছেন।
একে অপরের ক্লেদজ অতীত নিয়ে খোঁটা দিচ্ছেন সভা-সেমিনারে। এসব সনাতন রাজনীতি। প্রধান দুটি দলের নেতৃত্বে এখন যে দুজন আছেন, তারা দুজনই আধুনিকমনস্ক, যুক্তিশীল নেতা বলেই মনে হয়। এই প্রেক্ষাপটে আমরা তাদের মুখোমুখি নির্বাচনী বিতর্ক দেখতে চাই। এটি নিশ্চয় খুব বেশি প্রত্যাশা নয়। একটি নির্বাচনী বিতর্ক অনুষ্ঠিত হতে পারে কোনো গণমাধ্যমের পৌরোহিত্যে।
আমাদের দেশে এমন বিতর্কের নজির কিন্তু আছে। ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ নামে বেশ জনপ্রিয় একটি নির্বাচনী বিতর্ক ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে উপস্থাপন করেন টিভি উপস্থাপক আনিসুল হক (প্রয়াত মেয়র)। ওই সময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষস্থানীয় নেতাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠানটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায়। ওই সময় এ অনুষ্ঠানের প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করেছিলেন আব্দুন নূর তুষার। ২০১৮ সালে নির্বাচনের আগে নাগরিক টিভিতে ‘সবিনয়ে জানতে চাই’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার দায়িত্ব নিয়েছিলেন তিনি। যদিও সেই নির্বাচন ‘রাতের ভোটের তকমা’ পাওয়া।
নির্বাচন নিয়ে সরাসরি বিতর্কে প্রার্থীরা মূলত নিজেদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি তথা ইশতেহারই তুলে ধরেন। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো তাদের প্রার্থীর সিদ্ধান্ত, নীতি ও অঙ্গীকার তুলে ধরেন। পাশাপাশি বিপক্ষ দল বা বিরোধী প্রার্থীদের নীতির সমালোচনা করে থাকেন।
বিভিন্ন দেশে দেখা যায়, ক্ষমতাসীন প্রার্থী দলের অবস্থান তুলে ধরার পাশাপাশি দায়িত্ব পেলে নিজে নতুন করে কী করবেন, ভোটারদের সামনে সেসব বিষয় তুলে ধরেন। মূলত এ বিতর্কের মাধ্যমে বিশাল সংখ্যক ভোটার ও নাগরিকের সামনে নিজের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনা তুলে ধরার সুযোগ পান প্রার্থীরা।
এ ধরনের মুখোমুখি বিতর্কের মাধ্যমেই মূলত নেতার যোগ্যতা, বিচক্ষণতা ও জ্ঞানের পরিধি ভোটারদের কাছে পরিষ্কার হয়। রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন করতে নির্বাচনপূর্ব এমন বিতর্কের কমন রেফারেন্স আমেরিকা। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে এমন বিতর্ক নির্বাচনের অনিবার্য অনুষঙ্গ।
তিন দফা বিতর্ক প্রার্থীদের যোগ্যতা নির্ধারক হয়ে ওঠে কখনও কখনও। যে কারণে ১৯৯২ সালের নির্বাচনের আগে সিনিয়র বুশ শেষ বিতর্কে অবতীর্ণ হওয়ার আগে কার্যত হোয়াইট হাউস থেকে ছুটি নিয়ে বিতর্ক শাস্ত্রবিষয়ক বইপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে প্রস্তুতি নেন।
অনেক ক্ষেত্রে সুইং ভোটাররা এসব বিতর্কের ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে পক্ষ বেছে নেন এবং সে অনুযায়ী ভোট দেন। দক্ষ তার্কিক তাঁর মতাদর্শ বা চেতনা দিয়ে জনগণকে উদ্বুদ্ধ ও অনুপ্রাণিত করার যুদ্ধে প্রতিপক্ষকে বিতর্ক মঞ্চ থেকেই আক্রমণ করা শুরু করেন। ধারালো যুক্তি আর শানিত কৌশলে পরাজিত করতে চান প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক প্রার্থীকে।
নির্বাচনপূর্ব প্রেসিডেন্সিয়াল ডিবেট যুক্তরাষ্ট্রে প্রথম প্রচলিত হয়। ঐতিহাসিকদের মতে, ১৮৫৮ সালে সিনেটর নির্বাচনে স্টিফেন ডগলাসের সঙ্গে প্রথম প্রকাশ্যে বিতর্কে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন আব্রাহাম লিঙ্কন। এর অনেক পরে এ ধরনের বিতর্কে অংশগ্রহণ অস্বীকার করে ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ১৯৪০ সালে ওয়েনডেল উইলকির বিরুদ্ধে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। আধুনিক যুগের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ইতিহাসে বিতর্কের প্রবেশ ঘটে ১৯৬০ সালে।
রিপাবলিকান প্রার্থী রিচার্ড নিক্সনের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী জন এফ কেনেডি শিকাগোর স্টুডিওতে। এর পর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সঙ্গে স্টুডিও বিতর্ক বিষয়টি একটি অত্যাবশ্যক নির্বাচনী আচারে পরিণত হয় এবং এটি এখন বিশ্বজুড়ে লাইভ টেলিকাস্ট হয়।
অনেক সময় এ বিতর্কের জয়-পরাজয় নির্বাচনের ফলাফলকেও প্রভাবিত করে। এ ধরনের বিতর্ক এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রথম দফা বিতর্কে ভালো করতে না পেরে নির্বাচনী লড়াই থেকেই সরে দাঁড়ান। পরে তো রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিপরীতে বাইডেনের পরিবর্তে কমলা হ্যারিস বিতর্ক ও নির্বাচন কোনোটিতেই আর টিকতে পারেননি।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ‘বিতর্ক’ সমাজের একটি অপরিহার্য উপাদান। যেখানে আনুষ্ঠানিক বিতর্কের মাধ্যমে বিরোধী মতাদর্শ যুক্তি ও প্রমাণের ভিত্তিতে সামাজিক সমস্যা ও বৈচিত্র্যময় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনার পথ প্রশস্ত করে। এটি সমাজে ইতিবাচক ধারার চিন্তাশক্তি, যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং ভিন্নমতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের মানসিকতা তৈরি করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা একটি প্রগতিশীল ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনে সাহায্য করে।
বিতর্ক রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার বিপরীতে সমাধানসূত্রের উৎস বলে বিবেচিত হয় কখনও কখনও।
বাংলাদেশে বর্তমানে সনাতনীসহ বিভিন্ন ধরনের বিতর্ক-সংস্কৃতি প্রচলিত, যা তরুণ প্রজন্মকে মানবিক ও যুক্তিবাদী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে; কিন্তু এসবই বিদ্যায়তনিক পরিসরে।
বিতর্ক রাজনৈতিক পরিসরে বিশেষত নির্বাচনপূর্ব আচারে পরিণত করতে দুই জোটের দুই রহমান (তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান) ট্রেন্ডসেটার হতে পারেন। আমরা রহমানদের মেঠো বাগ্যুদ্ধ নয়, বরং নীতি সমর্থিত প্রস্তাবনা আর রাজনৈতিক রূপকল্পসমৃদ্ধ ইতিবাচক বিতর্ক দেখতে চাই।
দেশমন্ত্র জপ করা রাজনৈতিক নেতৃত্বের কাছে এটি এক সাধারণ প্রত্যাশা। উভয় রহমান স্বীকার করবেন, অনেক কিছু নিয়ে বিতর্ক থাকলেও তাদের মতবিরোধ বাংলাদেশের লক্ষ্য নিয়ে নয়; শুধু সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর উপায় নিয়ে।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী,
বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট
adv.mmkzaman@gmail.com
সূত্র: সমকাল