শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

বাংলাদেশের সুহৃদ সাংবাদিক মার্ক টালি

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৭, ২০২৬

চলে গেলেন ‘ফরেন ফ্রেন্ড অব বাংলাদেশ’ বলে খ্যাত বিবিসির সাবেক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক স্যার মার্ক টালি। ৯০ বছর বয়সে ২৫ জানুয়ারি রোববার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির এক বেসরকারি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেছেন তিনি। মূলত দিল্লিভিত্তিক সাংবাদিকতা করলেও গোটা দক্ষিণ এশিয়া ছিল তাঁর কাজের অধিক্ষেত্র। আবার সাংবাদিকতার বাইরে আরও নিবিড়ভাবে তিনি যুক্ত ছিলেন বাঙালি ও বাংলাদেশের সঙ্গে।

এ সংযোগকে নাড়ির যোগ বললেও ভুল হয় না। প্রথমত, তাঁর বাবা ইংরেজ হলেও মা ছিলেন বাঙালি। দ্বিতীয়ত, তাঁর মায়ের জন্ম বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায়।

১৯৩৫ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতা শহরে জন্মগ্রহণ করেন মার্ক টালি। দার্জিলিংয়ের একটি বোর্ডিং স্কুলে পাঁচ বছর পড়াশোনা করার পর চলে যান ব্রিটেনে। যাজক হওয়ার বাসনা নিয়ে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান ইতিহাস ও ধর্ম নিয়ে পড়তে। যদিও শেষ পর্যন্ত হয়েছেন সাংবাদিক।

১৯৬৪ সালে তিনি বিবিসিতে যোগ দিয়েছিলেন একজন সাধারণ কর্মী হিসেবে। পরের বছর তিনি নয়াদিল্লিতে ফিরে আসেন এবং সাংবাদিকতা শুরু করেন। কয়েক বছরের মধ্যে বিবিসির দিল্লি ব্যুরোপ্রধানের দায়িত্ব নেন মার্ক টালি। দুই যুগেরও বেশি সময় এ পদে ছিলেন তিনি।

বিবিসি বাংলার তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ওই সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ, পাকিস্তানের সামরিক শাসন, ভারতের জরুরি অবস্থা ও শিখ বিদ্রোহ, ইন্দিরা ও রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ড, জুলফিকার আলী ভুট্টোর ফাঁসি, শ্রীলঙ্কায় তামিল টাইগারদের বিদ্রোহ, আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনসহ দক্ষিণ এশিয়ার আরও বড় বড় ঘটনার সাক্ষী ছিলেন তিনি।

এগুলো নিয়ে কখনও সরেজমিন কখনও দিল্লি বা লন্ডনে বসেই স্থানীয় সূত্র ব্যবহার করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীর কঠোর নিয়ন্ত্রণের মুখে বিবিসিতে নিয়মিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের খবরাখবর ও বিশ্লেষণ প্রকাশ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত নাম হয়ে ওঠেন মার্ক টালি। তখন বাংলাদেশের মানুষের কাছে বিবিসি মানেই ছিল মার্ক টালি। যাদের বাড়িতে তখন রেডিও ছিল, তারা সকাল-সন্ধ্যা রেডিওতে কান পেতে তাঁর কণ্ঠস্বর শুনতে অপেক্ষা করতেন।

মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর ওই অসাধারণ ভূমিকার জন্যই ২০১২ সালে মার্ক টালিকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ দেয় বাংলাদেশ সরকার। ওই বছরই শেষবারের মতো ঢাকা আসেন এ দেশের সংগ্রামী জনগণের অকৃত্রিম এ বন্ধু।

একাত্তর সালে তাঁর খবর সংগ্রহের মাধ্যমও ছিল বিচিত্র। ওই বছর এপ্রিলে মার্ক টালিকে ঢাকায় ঢুকতে দিলেও দুই সপ্তাহের বেশি অবস্থান করতে দেয়নি তৎকালীন পাকিস্তানের সামরিক সরকার। গোটা যুদ্ধকালে এ ভূখণ্ডে আর ঢুকতে পারেননি তিনি। তবে তাঁকে থামিয়েও রাখা যায়নি। যুদ্ধকালীন অধিকাংশ সময় তিনি লন্ডনেই ছিলেন। বিবিসি বাংলার ওই সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, ‘যখন শরণার্থী সংকট শুরু হলো তখন তাদের কাছ থেকে নানা ধরনের খবরাখবর পাওয়া যেত।’

নিজামউদ্দিন ছিলেন তখন বিবিসির ঢাকা সংবাদদাতা। দেশের ভেতর থেকেই খবর পাঠাতেন তিনি। তবে যুদ্ধের শেষের দিকে পাকিস্তানিরা তাঁকে হত্যা করে। এ ছাড়া লন্ডনে সহকর্মী ও পরিচিতজনদের ঢাকায় থাকা আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকেও মুক্তিযুদ্ধের সংবাদ সংগ্রহ করতেন তিনি।

বাংলাদেশে আরেকবার মার্ক টালি ঘরে ঘরে পরিচিতি পান, যখন আশির দশকে এখানে তুমুল সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন চলছিল। এখানে যারা বিবিসির প্রতিনিধি ছিলেন, এরশাদ মাঝে মাঝেই তাদের খবর সংগ্রহ ও পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা দিতেন। তখন দিল্লি থেকে মার্ক টালিই হতেন নিরপেক্ষ ও বস্তুনিষ্ঠ খবরের জন্য একমাত্র ভরসা।

আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং ওই আন্দোলনের অত্যন্ত সক্রিয় কর্মী। মূলত তখনই মার্ক টালির নাম ও কণ্ঠের সঙ্গে আমার ও আমাদের প্রজন্মের পরিচয়।

দিল্লিতেও যে তিনি বেশ স্বস্তিতে কাজ করতে পেরেছেন, তা নয়। ১৯৭৫ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর জরুরি অবস্থা জারির কথা সবার জানা। তখন মাত্র ২৪ ঘণ্টার নোটিশে তাঁকে ভারত ছাড়তে বাধ্য করা হয়। প্রায় ১৮ মাস পর তিনি পুনরায় দিল্লি ব্যুরোতে ফিরে আসেন।

১৯৯২ সালে অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙার সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েও হিন্দু কট্টরপন্থিদের রোষানলে পড়েন মার্ক টালি। তখন তাঁর কয়েক ঘণ্টার আটকাবস্থার অবসান ঘটান স্থানীয় এক হিন্দু পুরোহিত।

নব্বইয়ের দশকে বিবিসির তৎকালীন মহাপরিচালক জন বার্টের সঙ্গে বিরোধের জেরে ১৯৯৪ সালে বিবিসি ছাড়েন মার্ক টালি। তবে সাংবাদিকতা ছাড়েননি। দিল্লিতে ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও উপস্থাপক হিসেবে কাজ করেন। অর্থাৎ মার্ক টালি জীবনের প্রায় পুরোটা সময় খবর ও তার বিশ্লেষণের সঙ্গেই বসবাস করেছেন।
স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার এ অনন্য প্রতীকের প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত