শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

বিএনপির জোটসঙ্গীগণ কিংবা ক্ষমতার রাজনীতির স্বরূপ

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২২, ২০২৬
সাইফুর রহমান তপন

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরার আগে প্রায়ই নেতাকর্মীদের বোঝাতেন– এবারের নির্বাচন বিএনপির জন্য বেশ কঠিন হবে। তাঁর দেখাদেখি দলের অন্য শীর্ষ নেতারা একই কথা বলতেন। কিন্তু ভোটের বল মাঠে গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে মনে হচ্ছে, সেগুলো ছিল কথার কথা। বিশেষত বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জোটসঙ্গীদের নিয়ে যা করছেন তাতে মনে হচ্ছে, নির্বাচনে তারা একাই একশ। তা যদি না হয়, বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে বিএনপি যেসব দলকে কাছে টেনেছিল, নির্বাচনে তাদের না চেনার ভাব করছে কেন?

প্রশ্নটা মনে এলো বিএনপির দীর্ঘ দিনের মিত্র নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার না ঘরকা না ঘাটকা অবস্থা দেখে। অনেক দেনদরবারের পর বিএনপি মান্নাকে বগুড়া-২ আসনটি ছেড়েছিল। কিন্তু সে আসনেই ধানের শীষ প্রতীকে দলের স্থানীয় নেতা শাহে আলমকে মনোনয়ন দেয়, যা শেষ মুহূর্তেও প্রত্যাহার হয়নি।

সমকালের প্রতিবেদন বলছে, এ নিয়ে বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে মাহমুদুর রহমান মান্না একাধিকবার যোগাযোগ করলেও কোনো ফল ফলেনি। তাই গত সোমবার জরুরি সংবাদ সম্মেলনে ‘একলা চলো নীতি’ ঘোষণা দিয়ে জানান, তিনি ঢাকা-১৮ ও বগুড়া-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন।

শেষ পর্যন্ত রাখতে না পারলেও মান্না তাও একটা আসন পেয়েছিলেন; কিন্তু বিএনপির আরেক মিত্র জেএসডির আ স ম আবদুর রব প্রতিশ্রুতিও পাননি। তিনি লক্ষ্মীপুর-৪ আসনে বিএনপির সমর্থন চেয়েছিলেন। ২০১৮ সালেও এই আসন থেকে বিএনপি জোটের প্রার্থী ছিলেন। বগুড়া-২ আসনে মান্নাও তখন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন। বিতর্কিত সেই নির্বাচনে দুজনই হেরেছিলেন। প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আজকে সবকিছু বিএনপির অনুকূলে। এই সুদিনের ভাগ রব ও মান্না চাইতেই পারেন। কিন্তু বিএনপি স্পষ্টত সে ভাগ দিতে রাজি নয়।

দুঃখের দিনে বিএনপির সঙ্গে কষ্ট ভাগাভাগি করে শুধু রব ও মান্নাই সুখের দিনের ভাগ থেকে বঞ্চিত হননি। তাদেরই আরেক জোটসঙ্গী রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের সভাপতি হাসনাত কাইয়ুমকেও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে একাই লড়তে হচ্ছে।

জোটসঙ্গীদের মধ্যে যারা বিএনপির সমর্থন বা মনোনয়ন পেয়েছেন, তাদেরও স্বস্তি নেই। যেমন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক ঢাকা-১২ আসনে এবং গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর পটুয়াখালী-৩ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় সমর্থন পেলেও স্থানীয় বিএনপির কেউ তাদের সঙ্গে নেই।

দুই আসনেই বিএনপির সবাই দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষে কাজ করছেন। শুধু তাই নয়। মার্কার জটিলতা এড়াতে পিতার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করেও কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা বিপদে আছেন। তাঁর ধানের শীষের বিপক্ষে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান।

একই প্রতিকূলতায় পড়েছেন গণঅধিকার পরিষদের মহাসচিব পদ ত্যাগ করে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ঝিনাইদহ-৪ আসনে ধানের শীষ পাওয়া রাশেদ খান। সেখানে বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী সাইফুল ইসলাম ফিরোজ।

বিএনপি তার পুরোনো জোটসঙ্গীদের জন্য আসনই ছেড়েছে মাত্র ১৩টি। এর মধ্যে মান্নার আসনটি তো বিএনপি কার্যত কেড়েই নিল। বাকিদেরও অধিকাংশ নির্বাচনী প্রচার শুরু হওয়ার আগেই বিএনপির কারণে খাবি খাচ্ছেন। এ বিষয়ে মান্না আক্ষেপ করেছেন, বিএনপি তাঁকে ‘ইগনোর’ করেছে।

আর নুরুল হক নুর বিবিসি বাংলাকে (১০ জানুয়ারি) বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা ছিল একটা ভারসাম্যপূর্ণ সংসদের জন্য বিএনপি ৪০ থেকে ৫০টি আসন মিত্রদের ছেড়ে দিতে পারে। যেহেতু খুব অল্প সংখ্যক আসন ছেড়েছে, ফলে নেতাকর্মীদের মধ্যেও একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছে– এটা ছাইড়া লাভ কী! এটাও আমরা নিয়ে নিই।’

অন্যদিকে বিবিসি বাংলার একই প্রতিবেদনে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেছেন, সমাধানের চেষ্টা চলছে। ধরি মাছ না ছুঁই পানি মার্কা উত্তর। সত্য, বিএনপি শরিকদের আসনগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থীদের দল থেকে বহিষ্কার করেছে। কিন্তু এটাও যে গতানুগতিক পদক্ষেপ– কে না জানে! অভিজ্ঞতা বলে, এ বিদ্রোহী প্রার্থীরাই যখন জিতে যাবেন, তখন সাড়ম্বরে দল তাদের বরণ করে নেবে।

তবে বিএনপি যে বলেছে, বড় জয় পেলেও তারা জাতীয় সরকার বানাবে; তা কাদের নিয়ে হবে? তার আন্দোলনের উদারপন্থি সঙ্গীদের যে সেখানে থাকার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তা তো এখনই বলা যায়। আবার জামায়াতে ইসলামী ও তার জোটসঙ্গীরা সেখানে সুযোগ পাবে– এমনটাও বলা যায় না। বিশেষ করে মঙ্গলবার দুপুরে রাজধানীর এক আলোচনা সভায় বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নির্বাচনে লড়াই হচ্ছে উদারপন্থার সঙ্গে উগ্রপন্থার।

উগ্রপন্থি বলতে তিনি যে জামায়াত জোটকেই বুঝিয়েছেন, তা ব্যাখ্যার দরকার হয় না। তাহলে কি জাতীয় সরকারও নিছক রাজনৈতিক বাগাড়ম্বর?

আসলে বিদ্যমান ক্ষমতার রাজনীতির ধরনটা এমনই হয়। কাজের সময় কাজি, কাজ ফুরোলে পাজি। মাহমুদুর রহমান মান্না ও সাইফুল হক দুজনই ইতোপূর্বে সমকালের সঙ্গে একাধিক সাক্ষাৎকারে দাবি করেছিলেন, আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন সবকিছু একসঙ্গে হবে– বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনে মিত্র হিসেবে কাছে টেনে বিএনপি তাদের এমনই কথা দিয়েছিল।

কিন্তু জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তত এক বছর নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে বিএনপি তাদের অনুরোধে সাড়া দেয়নি। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান দেশে এসে একটা-দুটো করে আসন ছেড়েছেন বটে, তবে তাতে ক্ষমতার রাজনীতিতে তাদের ‘দুধভাত’ পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়নি।

এ প্রসঙ্গে ২০০৪ সালে গঠিত আওয়ামী লীগের কথিত আদর্শিক জোট ১৪ দলের পরিণতি স্মরণ করা অপ্রাসঙ্গিক হবে না। তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত সরকারকে হটাতে বিভিন্ন বামপন্থি দলকে বিএনপির মতোই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছিটিয়ে ১৪ দলে ভিড়িয়েছিল আওয়ামী লীগ। আন্দোলন, নির্বাচন ও সরকার গঠন সবকিছু একসঙ্গে হবে– এমন সমঝোতা তখনও হয়েছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করে।

দলটি ১৪ দলের সব শরিক দলের সংসদ সদস্যদের নৌকা নিয়ে জেতার পরও সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসতে পরামর্শ দেয়। এ নিয়ে জোট শরিকরা তখন রাজপথেও ক্ষোভ ঝেড়েছিলেন, মনে আছে নিশ্চয়ই। ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনে তো ১৪ দলের শরিকরা রীতিমতো নাস্তানাবুদ ছিল। তখন তাদের খুবই নগণ্যসংখ্যক আসন ছাড়ে আওয়ামী লীগ। আবার সে আসনগুলোরও একটা অংশ কেড়ে নেন আওয়ামী লীগের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীরা।

গণঅভ্যুত্থানের আগে আগে অবশ্য জোটকে আবারও সচলের চেষ্টা চলেছিল। ততদিনে দেরি হয়ে গিয়েছিল; জোটসঙ্গীদের নিয়েই ডুবেছে আওয়ামী লীগ।

জোটচর্চার আওয়ামী স্টাইল থেকে বিএনপি শিক্ষা নেবে কিনা জানি না; কিন্তু বাম ও উদারপন্থি দলগুলোর জাতির প্রয়োজনেই শিক্ষা নেওয়া জরুরি। নিজের কোমর শক্ত না করে বড় দলগুলোর কুহক ডাকে সাড়া দিলে শেষ পর্যন্ত তা জাতির তো কোনো কাজে আসেই না; বড় শরিকের দায়ে নিজেদেরও সখাত সলিলে ডুবতে হয়।

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত