
ফ্রা ন্সের ইউরোপ ও পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রী জঁ-নোয়েল ব্যারো সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস. জয়শঙ্করের সঙ্গে সাক্ষাৎকালে বলেন, জি-সেভেনের বর্তমান নেতা ফ্রান্স এবং ব্রিকসের বর্তমান সভাপতি ভারত কৌশলগত অংশীদার হিসেবে বহুপাক্ষিকতাকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে কাজ করতে পারে।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁও জোর দিয়ে বলেছেন, ব্রিকস এবং জি-সেভেন যেন পরস্পরবিরোধী না হয়ে ওঠে।
ফরাসি প্রেসিডেন্টের বিবৃতি তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ আন্তর্জাতিক আলোচনায় একতরফাবাদই প্রধান প্রবণতায় পরিণত হয়েছে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ভেনেজুয়েলায় শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন এবং ৬৬টি আন্তর্জাতিক চুক্তি বা সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সরে দাঁড়ানো।
ট্রান্সআটলান্টিক জোটও নজিরবিহীন চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে ক্ষুদ্র ও বহুপক্ষীয় জোটগুলোর মধ্যে আন্তঃআঞ্চলিক সংযোগ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা বিস্ময়কর নয়।
যা-ই হোক, দুই বিপরীত মেরুর জোট ব্রিকস ও কোয়াডের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে ভারত বিশ্বাস করে, ব্রিকস পশ্চিমাবিরোধী নয়, বরং অ-পশ্চিমা বিকল্প। চীন ও রাশিয়াকে পি-৫ সদস্য হিসেবে নিয়ে ব্রিকস গ্লোবাল সাউথের আন্তঃমহাদেশীয় আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধিত্ব করে।
‘বসুধৈব কুটুম্বকম’ বা বিশ্ব একটি পরিবার– বৈদেশিক নীতির অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গির কারণে ভারত পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ বিভাজনের মধ্যে বিশ্বাসযোগ্য সেতুবন্ধন হিসেবে সহজেই আত্মপ্রকাশ করতে পারে।
ব্রিকস বিশ্বের জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্ব করে। এ ছাড়া এটি বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশের অংশীদার, যা জি-সেভেনের তুলনায় ভালো অবস্থানে। চীন ও ভারত অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছে এবং ভারত সম্প্রতি জাপানকে অতিক্রম করে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতি হয়ে উঠেছে।
ব্রিকস জ্বালানির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি উৎপাদনকারী ও ভোক্তা এবং গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তিতে প্রশংসনীয়ভাবে প্রভাবশালী। এই গোষ্ঠী পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও পারস্পরিক স্বার্থে বিশ্বাস করে। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে ভিন্নতর ব্যবস্থা ও দৃষ্টিভঙ্গি থাকা সত্ত্বেও এটি উচ্চ কূটনৈতিক গুরুত্ব ও বিপুল পরিসরের সুবিধা উপভোগ করে।
২০২৬ সালে সভাপতি হিসেবে ব্রিকসের দায়িত্ব গ্রহণের পর ভারত শীর্ষ সম্মেলন ও বাণিজ্য, সংযোগ, মুদ্রা ও সন্ত্রাসবাদবিরোধী কার্যক্রম থেকে সংস্কৃতি, প্রযুক্তি ও ফিনটেক, শিক্ষা, গবেষণা ও উন্নয়ন, ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা এবং যুব ও ক্রীড়া বিনিময় পর্যন্ত বিভিন্ন খাতভিত্তিক সভার আয়োজন করতে যাচ্ছে।
ব্রিকস ও ভারতের প্রধান লক্ষ্য হলো বিশ্বব্যাপী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। বিশেষত জাতিসংঘ ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিজয়ী ও পরাজিতের মানসিকতায় আবদ্ধ স্থায়ী পাঁচ ভেটো ক্ষমতার কারণে ক্রমশ অপ্রাসঙ্গিক হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
উপরন্তু ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ সমর্থকগোষ্ঠী প্রভাবিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প মনে করছেন, আর্থিক উপকরণকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার একমুখী প্রক্রিয়া হওয়া উচিত। এটা যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষাধিকার, আর ডি-ডলারাইজেশনই হলো বড় রেডলাইন। পাঁচটি মূল ব্রিকস রাষ্ট্র– রাশিয়া, চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিশানায় এবং এদের উচ্চ ও অযৌক্তিক শুল্কের খেলায় চাপে রাখা হচ্ছে।
ব্রিকস আধিপত্য ও নির্দেশনা থেকে মুক্ত কার্যকর বিকল্প উপস্থাপনের চেষ্টা করছে; বিশেষত দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার প্রেক্ষাপটে। যদিও এর সদস্যদের মধ্যে বৃহত্তম গণতন্ত্র থেকে সর্বাত্মক কর্তৃত্ববাদী রাষ্ট্রও বিদ্যমান। কিন্তু বহুমেরুত্ব ও বিকল্পগুলোকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্য।
নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের মতো কিছু প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এটি পশ্চিমা আধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ জানায় এবং আরও উপযোগী, সহযোগিতামূলক ও ঐকমত্যভিত্তিক পরিসর প্রদান করে। একটি ‘ব্রিকস মুদ্রা’ তৈরির প্রচেষ্টা চলছে। এই প্রবণতা অনাগত সময়ে বহুমেরুত্বের জন্য একটি প্রধান গুণনীয়ক হিসেবে পরিণত হতে পারে।
একক বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর পরিবর্তে বহুমেরুত্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে উৎসাহিত করতে ব্রিকসের মূল পাঁচটি দেশের আঞ্চলিক নিরাপত্তা গতিশীলতায় ভিন্ন ভিন্ন ভূমিকা রয়েছে– রাশিয়া ইউরেশিয়ার নিরাপত্তা গতিশীলতাকে আকৃতি প্রদান করে; চীন পূর্ব এশিয়ার কৌশলগত হিসাব-নিকাশে আধিপত্য বিস্তার করে; ভারত মহাসাগর, দক্ষিণ এশিয়া এবং সাধারণভাবে বৈশ্বিক দক্ষিণে প্রভাব বিস্তার করে ভারত; ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ভূমিকা পালন করে।
এই বিকেন্দ্রীকরণ বিশ্বব্যাপী অভিন্নতা হ্রাস করে কিন্তু আঞ্চলিক ক্ষমতা প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি করে, কখনও কখনও স্থানীয় অস্থিতিশীলতাকে তীব্র করে। এর অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও রয়েছে। কারণ ব্রিকসের মতো সংস্থার মধ্যে প্রতিযোগী শক্তিগুলোর একীকরণ প্রক্রিয়াকে ধীর করে দিতে এবং আধিপত্যবাদী প্রকল্পগুলোকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।
চিত্তাকর্ষক বিষয় হলো, কিছু অনিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও ভারতকে ২০২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে কোয়াড শীর্ষ সম্মেলনের আয়োজনকারী হিসেবে নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি ভারতকে কিছু ভুল ধারণা দূর করা এবং প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত শিবিরগুলোর মধ্যে আরও ভালো বোঝাপড়া ও সহযোগিতার মাধ্যমে শূন্য অঙ্কের খেলায় সৃষ্ট ব্যবধান পূরণের অনন্য সুযোগ প্রদান করে। বিশ্বব্যাপী চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলার জন্য বিশ্বব্যাপী সংহতি প্রয়োজন।
ব্রিকস বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করছে না; বহুমেরুবিশিষ্ট সহযোগিতামূলক কাঠামোকে পুনর্গঠনের আশা করছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া কিন্তু প্রবল শক্তি, যা ততক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী হতে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো ভন্ডামিতে লিপ্ত হবে এবং তাদের গড়ে তোলা নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে ফেলবে, যেগুলো তারা নিজেরাই একতরফা ও এককেন্দ্রিক পদ্ধতির মাধ্যমে নির্মাণ করেছিল।
ভারত সংলাপ ও কূটনীতি এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের মাধ্যমে বিভেদ দূরীকরণে বিশ্বাস করে; অগত্যা তাদের প্রতিস্থাপনে নয়।
২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস সভাপতিত্ব চলাকালেও এই নীতি অব্যাহত থাকবে, যেখানে বহুমেরুত্ব এবং বহুপাক্ষিকতার জন্য কাজ করা হবে, যা গুরুতর হুমকির মুখে রয়েছে।
অনিল ত্রিগুণায়েত: সাবেক ভারতীয় রাষ্ট্রদূত
সূত্র: সমকাল