পথেঘাটে চলতে ফিরতে রিকশা-গাড়িচালক, দোকানদার, হোটেল বয় থেকে শুরু করে বন্ধু-বান্ধবও একে অপরকে যেভাবে মামা ডাকে, সে বিষয়ে বছর দশেক আগে লিখেছিলাম ‘মামা সংস্কৃতি’ (সমকাল, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬)। সেখানে অবশ্য আমি বলার চেষ্টা করেছি, হরেদরে সবাইকে মামা ডাকা দৃষ্টিকটু। সেখানে আমি বলেছি, ‘পরস্পর ডাকার ক্ষেত্রে যৌক্তিক সম্বোধন হতে পারে ভাই। এটা সমাজ-স্বীকৃত, ধর্ম-স্বীকৃত এবং যৌক্তিক সম্বোধন। ভাই বলার মধ্যে একটা যে শালীনতা, শ্রদ্ধাবোধ ও সৌহার্দ্যের ব্যাপার থাকে; মামার মধ্যে সেটা কতখানি রয়েছে?’
সম্প্রতি নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে তরুণদের সঙ্গে আলোচনায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান তাঁকে ‘স্যার’ না ডেকে ‘ভাইয়া’ ডাকার পরামর্শ দেন। স্যার যদিও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কিংবা সম্মানার্থেও বড়দের আমরা ডেকে থাকি, কিন্তু এটি ঔপনিবেশিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতা। প্রশাসনে স্যার ব্যবহার করতেই হয়।
এমনকি কয়েক বছর আগে স্যার না বলায় সাংবাদিকের ওপর চটেছিলেন প্রশাসনের এক কর্মকতা। আওয়ামী লীগের সময়ে নারী কর্মকর্তাদেরও স্যার বলার রেওয়াজ শুরু হয়। অন্তর্বর্তী সরকার গত বছরে সরকারি নারী কর্মকর্তাদের ‘স্যার’ বলে সম্বোধনের নির্দেশনা বাতিলের সিদ্ধান্ত নিলেও কোনো লিখিত আদেশ জারি হয়নি। ফলে তার প্রয়োগ এখনও রয়ে গেছে। স্যার ডাকা নিয়ে যে বিতর্ক আছে, সেদিক বিবেচনা করেই হয়তো তারেক রহমান এ সম্বোধন না করতে বলেছেন।
আঙ্কেল আর মামা কিংবা চাচা সম্পর্কের দিক থেকে একই ধরনের। কিন্তু শহুরে মামা কালচার সেখানে যে অর্থে আমরা মামার প্রচলন দেখছি বা সবাই যে অর্থে এটি ব্যবহার করছেন, তাকে ইতিবাচক বলা যায় না। অনেকে ঠাট্টার জন্যই মামা ডাকেন। সম্পর্ককে হালকা করার জন্যও ডাকেন। অনেকের ভিন্ন উদ্দেশ্যও থাকতে পারে। কিংবা হয়তো ইতিবাচক অর্থেও অবচেতন মনে অন্যকে মামা ডাকতে পারেন। কিন্তু আপত্তি সেখানেই যখন এটা ব্যাপক প্রচলন পায়। পরস্পর কথা বলার ক্ষেত্রে আঙ্কেল বা মামা সম্পর্কে যে ধরনের মুরব্বিসুলভ দূরত্ব আমরা দেখি, ভাইয়ের ক্ষেত্রে সেটা নয়। বরং ভাই বা ভাইয়া বলার ক্ষেত্রে এক ধরনের আপন মনে হয়।
বাবার বয়সীরা আঙ্কেল বটে, কিন্তু সম্পর্কের দিক থেকে কেউ দাদা-দাদি বা নানা-নানি হয় এবং বয়সের দিক থেকে যখন খুব বেশি দূরত্ব না থাকে তখন দাদা-দাদি কিংবা নানা-নানির সম্পর্ক হয়ে যায় ভাইবোনের। ভাই সম্পর্কটা সেদিক থেকেই টেকসই।
তবে যে যাকে যেভাবেই ডাকুক, তার মধ্যে সম্মান শ্রদ্ধাবোধ কিংবা স্নেহের পরশ থাকে। ব্যক্তির ডাকার ভঙ্গি যদি মার্জিত হয় তাতে খুব বেশি সমস্যা হয় না। অনেকে সামনে স্যার ডাকলেও পেছনে গিয়ে গালি দেন। অনেকে অবশ্য তেলবাজি করার জন্যও স্যার বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে ফেলেন। আবার সম্পর্কের কারণে আঙ্কেল, চাচা বা ভাই হলেও অনেক সময় ব্যক্তির আচরণের কারণে সম্পর্কে তিক্ততা তৈরি হয়। সম্পর্কে কে কী, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ব্যক্তির ব্যবহার। কেউ যদি প্রত্যাশা করেন, তাঁকে স্যার ডাকতেই হবে, সেটা সমস্যাজনক। মানুষের মধ্যে সাম্য প্রতিষ্ঠার বিপরীত আচরণ এটি। এ ক্ষেত্রে প্রকারান্তরে মালিক আর চাকরের সম্পর্কই সামনে নিয়ে আসে।
সব মিলিয়ে ভাই সম্বোধন যথাযথ। ভাইয়ার ক্ষেত্রে একই কথা। তবে নির্বাচনী প্রচারণায় প্রার্থীকে এখন আমরা যে নামেই ডাকি, তিনি হয়তো তাই মেনে নেবেন। প্রশ্ন হলো, তারা যখন এমপি-মন্ত্রী হবেন, তখন কি এভাবে ডাকা যাবে? এমপি-মন্ত্রী হওয়ার পর যদি সাধারণ মানুষ তাঁকে ভাই ডাকতে পারেন এবং তিনি যদি তা সানন্দে মেনে নেন, সেখানেই সার্থকতা।
মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com