শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

মাঠ যাক গোল্লায়, ভবন বাড়ুক উচ্চতায়!

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ৩০, ২০২৬
সামছুর রহমান আদিল

বাবা-মায়ের সঙ্গে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের আদাবর এলাকার রফিক হাউজিংয়ে থাকে আহইয়ান তানজিম নূর। ৭ বছরের আহইয়ান পড়ে এলাকার একটি বেসরকারি স্কুলে। এলাকাটি ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত। দুই লাখের বেশি বাসিন্দার এই ওয়ার্ডে নেই কোনো খেলার মাঠ। ফলে আহইয়ানের দিনের একটা বড় সময় কাটে কম্পিউটার-মোবাইল ফোনের স্ক্রিন দেখে।

শুধু উত্তর সিটির ৩০ নম্বর ওয়ার্ডই নয়; রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনার (ড্যাপ) তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৪১টি ওয়ার্ডেই কোনো খেলার মাঠ নেই। জনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে ঢাকায় খেলার মাঠের প্রয়োজন এক হাজার ৪৬৬টি। অথচ ঢাকা শহরে খেলার মাঠ আছে ২৫৬টি। এর মধ্যে ১৪১টিই প্রাতিষ্ঠানিক; যেখানে এলাকাবাসীর প্রবেশাধিকার নেই।

ঢাকা শহরকে পরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার জন্য যে ড্যাপ তৈরি করা হয়েছে, তাতে এই শহরে প্রায় কয়েকশ খেলার মাঠ ও পার্কের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু ড্যাপের গেজেট প্রকাশিত হওয়ার তিন বছরের বেশি সময় চলে গেলেও এখন পর্যন্ত একটি খেলার মাঠ ও পার্ক তৈরি করা হয়নি। অথচ আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে ঢাকার খোলা জায়গা কমিয়ে ভবনের উচ্চতা বাড়াতে একাধিকবার ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে।

খেলার মাঠ প্রতিটি এলাকার ফুসফুস হিসেবে কাজ করে। জনস্বাস্থ্য, সামাজিকীকরণ, পরিবেশ ও অর্থনৈতিক দিক থেকে খেলার মাঠ গুরুত্বপূর্ণ। মাঠ না থাকায় নাগরিকরা নির্মল বায়ু সেবন, ব্যায়াম ও হাঁটাচলার অধিকার থেকে; সর্বোপরি গাছপালা-প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সংযোগ স্থাপনের জরুরি সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। খেলার মাঠ না থাকলে শিশু-কিশোরদের অপরাধপ্রবণতা ও মাদক নেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। মাঠ না থাকলে ভূমিকম্পের সময় আশ্রয় নেওয়ার জায়গা থাকে না।

একটি আধুনিক শহরে প্রতি আধা বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য একটি খেলার মাঠ থাকার কথা বলা হয়। ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের আয়তনের হিসাবে মাঠ দরকার ৬১০টি। আয়তন বাদ দিয়ে জনসংখ্যা বিবেচনায় নিলে ঢাকায় আরও বেশিসংখ্যক খেলার মাঠ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে সাড়ে ১২ হাজার মানুষের জন্য একটি খেলার মাঠ প্রয়োজন। ঢাকার দুই সিটিতে প্রায় এক কোটি ৮৪ লাখ মানুষ বাস করে। মাঠের অভাবে একেবারে ছোট বয়স থেকেই ঢাকার শিশুদের মোবাইল ফোনে আসক্তি জন্মাচ্ছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপকের নেতৃত্বে ২০২৩ সালে পরিচালিত গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় ৮৬ শতাংশ প্রি-স্কুল শিশু স্মার্টফোনে আসক্ত। বাংলাদেশের শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় তিন ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক সুপারিশকৃত সর্বোচ্চ সময়ের প্রায় তিন গুণ।

শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য বাইরে খেলাধুলা অত্যন্ত প্রয়োজন। খেলাধুলার মাধ্যমে চিন্তা ও সৃজনশীলতার বিকাশ ঘটে এবং শারীরিকভাবে বেড়ে উঠতেও সহায়তা করে। শিশু সারাদিন বাসায় মোবাইল ফোনো মুখ গুঁজে রাখলে তার সঠিক মানসিক বিকাশ ঘটে না।

ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ‍সুস্থ বিকাশে মাঠের গুরুত্বের বিষয়টি উচ্চ আদালতেরও নজরে এসেছে। ২০২৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট ঢাকা মহানগরের বিদ্যমান সব পার্ক ও খেলার মাঠের পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি; দ্রুত এসব স্থানে বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণ বন্ধ এবং জনসাধারণের অবাধ প্রবেশাধিকারের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা বাস্তবায়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতেও বলা হয়।

তবে নির্দেশপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা এই বিষয়ে কী উদ্যোগ নিয়েছেন, জানা যায়নি। খেলার মাঠ বিষয়ে উদ্যোগ না নিলেও কর্তৃপক্ষ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে ঢাকায় ভবনের উচ্চতা বাড়ানোর উদ্যোগ দ্রুততার সঙ্গেই নিয়েছে। ঢাকা মহানগরসহ আশপাশের এলাকার সমস্যা কমিয়ে পরিকল্পিত শহর গড়তে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ড্যাপ তৈরি করে।

ব্যবসায়ীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৩ সালে এক দফা ড্যাপ সংশোধন করে সরকার। ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে ২০২৫ সালের ১৯ অক্টোবর অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা কমিটির সভায় ড্যাপের আরেক দফা সংশোধনীর নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

সংশোধিত ড্যাপে পরিবেশ সুরক্ষার বিষয়টি মুখে বলা হলেও বাস্তবে অধিকাংশ পরিবর্তন এসেছে ব্যবসায়িক স্বার্থে। এসব সংশোধনী ঢাকার ওপর আরও চাপ বাড়াবে। জনঘনত্ব ও ভবনের উচ্চতা বাড়লে রাজধানীর বাসযোগ্যতা কমবে এবং যানজট পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।

অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঢাকায় পর্যাপ্ত মাঠ না থাকা দুঃখজনক। ঢাকায় মাঠের সংখ্যা তো বাড়ছেই না, উল্টো উন্নয়নের নামে উন্মুক্ত মাঠগুলো ধ্বংস করা হচ্ছে। এই মানসিকতা থেকে বের হয়ে কীভাবে মাঠের সংখ্যা আরও বাড়ানো যায়, সে ব্যাপারে সরকারকে উদ্যোগ নিতে হবে। ঢাকার প্রতিটি ওয়ার্ডে অন্তত একটি খেলার মাঠ থাকা দরকার। মাঠ উন্নয়নের নামে বিশাল অঙ্কের অর্থ খরচ না করে স্বল্পমূল্যেও মাঠ করা যায়।

অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, খেলার মাঠ বিভিন্ন ক্লাবের নামে দখল হয়ে আছে। সেখানে পাড়া-মহল্লার শিশু-কিশোরদের খেলার সুযোগ নেই। আবার অনেক খেলার মাঠ বিভিন্ন মেলা বা অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়। মেলা কিংবা অন্যান্য অনুষ্ঠানের জন্য খেলার মাঠ বরাদ্দ দেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। খেলার মাঠ খেলা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যেই ব্যবহার করা যাবে না।

সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
jagoritoadil@gmail.com

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত