শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

‘শয়তান’ শিকারের দুটি অভিযান এবং শতাধিক ভূতুড়ে মৃত্যু

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৫, ২০২৬
সাইফুর রহমান তপন

ইংরেজি ডেভিল শব্দের বাংলা অর্থ শয়তান। সে হিসেবে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’কে বাংলায় ‘শয়তান শিকারের অভিযান’ বললে সম্ভবত ভুল হবে না। তবে শয়তান শব্দটা বাংলাদেশের ভদ্র সমাজে বোধগম্য কারণেই যথাসম্ভব কম ব্যবহৃত হয়। হয়তো সে কারণেই সরকার ইতোমধ্যে জনপরিসরে বহুল আলোচিত অভিযানটির নাম ডেভিল হান্ট রেখেছে।

অপারেশন ডেভিল হান্ট শুরু হয়েছিল গত বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। এর আগের দিন গাজীপুরে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা আ ক ম মোজাম্মেল হকের বাড়িতে হামলার শিকার হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কয়েকজন নেতা। তারই পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ওই অভিযানের ঘোষণা দেন। এক মাসের কাছাকাছি চলেছিল তা, যেখানে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সঙ্গে অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের নিয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী ১২ হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করে।

(সমকাল, ৭ জানুয়ারি) বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছিল, তাদের বেশির ভাগ ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী-সমর্থক। অবশ্য অভিযানের শুরুতেই এটি পরিষ্কার ছিল যে, ডেভিল বলতে সরকার প্রধানত আওয়ামী লীগের লোকদেরই বোঝাচ্ছেন।

প্রশ্ন হতে পারে, প্রায় এক বছর আগের একটা অভিযানের আলাপ এখন কেন? যৌক্তিক প্রশ্ন। এর উত্তরও সরল। ডেভিল হান্টের লক্ষ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করা। সেটি যে হয়নি তা পুলিশের পরিসংখ্যানই বলছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক সব মিলিয়ে গত বছর সারাদেশে তিন হাজার ৭৮৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় ৩৫৩টি বেশি।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের প্রতিবেদন বলছে, গত বছর মব সন্ত্রাসে নিহতের সংখ্যা ছিল ১৯৮। নতুন বছরের প্রথম ছয় দিনে আলোচিত আটটি খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত বছর বিভিন্ন এলাকায় নানা নামের সন্ত্রাসী বাহিনীরও দৌরাত্ম্য বেড়েছে। রাজশাহী-কুষ্টিয়া অঞ্চলের ডাকাত দল ‘কাকন বাহিনী’, খুলনার ‘হুমা বাহিনী’ ও ‘মুন্না বাহিনী’র তাণ্ডবের কথা সমকালে একাধিকবার খবর হয়েছে।

শুধু লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থতা নয়, এ ব্যর্থতার কারণ না খুঁজেই গত ১৩ ডিসেম্বর সরকার ডেভিল হান্ট অপারেশন ফেজ-২ শুরু করেছে। তাই এ আলোচনা। ইতোমধ্যে এ অভিযানের এক মাস পেরিয়ে গেছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী ৬ জানুয়ারি পর্যন্ত এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে চায়না রাইফেল ১১৩টি, এসএমজি ৩১টি, এলএমজি তিনটি ও চায়না পিস্তল ২০৬টি।

এ ছাড়া বিভিন্ন বোরের গুলির হদিস নেই দুই লাখ ৪৩ হাজার ৮৪৬টি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানা ও পুলিশ ফাঁড়ি থেকে লুণ্ঠিত এসব অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারে কয়েক দফায় পুরস্কার ঘোষণা করেছে সরকার। তারপরও এ বিশাল সংখ্যক অস্ত্র ও গুলি পুনরুদ্ধার সম্ভব হয়নি। অভ্যুত্থানকালে জেল পালানো অন্তত ৭০০ অপরাধীকেও পুলিশ ধরতে পারেনি। সেই সঙ্গে আছে বহু শীর্ষ সন্ত্রাসীসহ দাগি আসামির জামিন। স্বাভাবিকভাবেই জনপরিসরে নিরাপত্তার শঙ্কা যে কোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে।

গত ১৬ মাসে পুলিশ সম্ভবত কেবল একটা ক্ষেত্রেই সাফল্য অর্জন করেছে–আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গ্রেপ্তার করা। এ সময়ে শ্রমিক, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবীর আন্দোলন দমনেও পুলিশ বেশ ‘সাফল্য’ দেখিয়েছে। বস্তুত, এগুলো আলাদা করে বলার দরকার হয় না। কারণ এসব ক্ষেত্রে পুলিশের কাজ সহজ করেছে কথায় কথায় অন্তর্বর্তী সরকার ও তার সমর্থকদের ওই পেশাজীবীদের গায়ে আওয়ামী দোসর বলে দাগিয়ে দেওয়া।

সবারই জানা আছে, এক সময় এ দেশে নন্দঘোষ ছিল বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর সদস্যরা, এখন এ অবস্থানে রাখা হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী-সমর্থকদের। তাদের ওপর দায় চাপিয়ে অনেক অপরাধীই এখন পার পেয়ে যায়। পুলিশও উদোর পিন্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপিয়ে অপরাধ দমনে নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে পারছে। এহেন তকমাবাজির শিকার বহু নিরীহ পেশাজীবীও।

অবশ্য ডেভিল ধরার কাজও যে পুলিশ বাধাহীনভাবে করতে পারছে তা নয়। এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ থানায় ওসিকে জেলার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়ক মাহদী হাসানের ধমকানোর ঘটনাটি বললে হয়তো বিষয়টি খোলাসা হতে পারে। সম্প্রতি সেখানকার পুলিশ চলমান ডেভিল হান্ট অভিযানের অংশ হিসেবে ছাত্রলীগের এক নেতাকে আটক করে। তাকে মুক্ত করতে ২ জানুয়ারি ওই থানায় সদলবলে যান মাহদী।

তিনি ওই ছাত্রলীগ নেতার গ্রেপ্তারের কারণ জানতে চাইলে থানার ওসি বলেন, তিনি ‘ডেভিল’ তাই গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এতে মাহদী আরও খেপে যান এবং কেন ওই ছাত্রলীগ নেতাকে ছেড়ে না দিয়ে আদালতে হাজির করতে চেয়েছেন, এমন ব্যাখ্যা দাবি করেন ওসির কাছে।

পরবর্তী সময়ে এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে পুলিশের মাহদীকে গ্রেপ্তার এবং ঢাকা ও হবিগঞ্জে আন্দোলনের মুখে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে জামিনের ঘটনা সবার জানা। এখানে মজার বিষয় হলো, মামলা থাক বা না থাক, আওয়ামী লীগ বা ছাত্রলীগের কাউকে দেখামাত্র ডেভিল হিসেবে গ্রেপ্তারের নির্দেশ সরকার দিলেও, পুলিশ কিন্তু সবক্ষেত্রে তা তামিল করতে পারছে না। সরকারের ওপরও আরেক সরকার আছে। তারা কাউকে ডেভিল না বললে সে ছাত্রলীগ বা আওয়ামী লীগ হলেও গ্রেপ্তার হবে না।

যা হোক, গত এক মাসে ডেভিল হান্ট অভিযানে সারাদেশে ১৮ হাজার ৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী। (প্রথম আলো, ১৩ জানুয়ারি, ২০২৬)। এবারও বেশির ভাগ আওয়ামী রাজনীতির সমর্থক, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কিন্তু পুলিশের নিয়মিত গ্রেপ্তার কার্যক্রমের পাশাপাশি এ দুই বিশেষ অভিযানে ব্যাপক ধরপাকড়ের ফলে ইতোমধ্যে কারাগারগুলোতে বন্দি উপচে পড়ছে। গত ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত বণিক বার্তার এক প্রতিবেদন বলছে, দেশের কারাগারগুলোয় ৪৬ হাজার বন্দির ধারণক্ষমতা রয়েছে। এসব কারাগারে বন্দি ছিল প্রায় ৮০ হাজার।

অন্যদিকে, যদিও বিচার বিভাগ স্বাধীন বলে দাবি করা হচ্ছে, ইতোমধ্যে জামিন নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে বেশ কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদির নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর জামিন নিয়ে তাঁর অনুসারীরা কঠোর বিরোধিতা করছেন। ধারণা করা যায়, কারাগারে বন্দির সংখ্যা ইতোমধ্যে আরও অনেক বেড়েছে।

এর মধ্যে আবার কারা হেফাজতে একপ্রকার মৃত্যুর মিছিলও শুরু হয়েছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালে কারা হেফাজতে মারা গেছেন ১০৭ জন এবং ২০২৪ সালে এই সংখ্যা ছিল ৬৫। মঙ্গলবারও নারায়ণগঞ্জে কারাবন্দি এক আওয়ামী লীগ নেতা মারা গেছেন। গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনায় কারা কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতো হৃদরোগ বা বার্ধক্যজনিত অসুখকে দায়ী করছে, অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর অভিযোগ চিকিৎসায় অবহেলা, এমনকি শারীরিক-মানসিক নানা নির্যাতন এসবের জন্য দায়ী।

আরও দুর্ভাগ্যজনক হলো, মানবাধিকার সমুন্নত রেখে গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের অঙ্গীকারবদ্ধ সরকার এসব অভিযোগের একটিতেও স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য কোনো তদন্ত করেনি। ফলে মৃত্যুগুলো একপ্রকার ভূতুড়েই রয়ে গেছে।

বিস্ময়কর হলো, বিগত আমলের ছায়া থেকে বের হতে ইচ্ছুক ডান-বাম রাজনৈতিক দলগুলোও এ নিয়ে কিছু বলছে না। যে সুশীল সমাজ তখন এ নিয়ে সোচ্চার থাকত তারা বা তাদেরই বন্ধুরা এখন ক্ষমতায়। সম্ভবত সে কারণে তারাও তেমন কিছু বলছে না। আমরা কি তবে বিশেষত মানবাধিকার প্রশ্নে যে তিমিরে ছিলাম সে তিমিরেই থাকব?

সাইফুর রহমান তপন: সহকারী সম্পাদক, সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত