শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

শিশুর এমন ‘শিক্ষা’ শুধু শারমিন একাডেমিতে?

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৮, ২০২৬
মাহফুজুর রহমান মানিক

সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া রাজধানীর শারমিন একাডেমিতে শিশু নির্যাতনের ভিডিও দেশে শিশুবান্ধব পরিস্থিতি কতটা আছে– সে সম্পর্কে প্রশ্ন তুলে ধরেছে। শারীরিকভাবে শাস্তি দিয়ে শিশুদের পড়ানোর বিষয়ে ইতোপূর্বে আমি লিখেছি, ‘শিশুর শারীরিক শাস্তির দেশীয় ট্র্যাজেডি’ (সমকাল, ৩০ এপ্রিল ২০২৩)। এটি উপমহাদেশীয় সংস্কৃতিও বটে। ২০১৭ সালে ভারতে এক মায়ের তাঁর সন্তানকে পড়ানোর সময় শাসানি আর আঘাত করার ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পরও সে ঘটনা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বস্তুত আমাদের শিশুর নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা সর্বত্রই। বাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মস্থল এমনকি রাস্তাঘাটেও যেন কোমলমতি শিশুদের রেহাই নেই।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুর শারীরিক শাস্তির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ২০১১ সালে শিক্ষা মন্ত্রণালয় একটি পরিপত্র জারি করে। আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারের এ উদ্যোগ, শিশু নির্যাতনবিরোধী আইন এবং অংশীজনের সচেতনতা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন কমাতে অনেকখানি সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। কিন্তু শিশুর শারীরিক শাস্তি যে বন্ধ হয়নি– শারমিন একাডেমির অঘটনই এর প্রমাণ।

ভিডিওতে দেখা গেছে, একজন পুরুষ ও নারী মিলে শিশুটিকে মারধর করছে। পরে জানা যায়, নির্যাতনকারীরা রাজধানীর নয়াপল্টনে অবস্থিত স্কুলটির প্রধান শিক্ষক ও স্কুলের ব্যবস্থাপক। শিশুটির দোষ কী? প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপককে গ্রেপ্তার করার পর ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তোলা হলে তিনি বলেছেন, ‘ও আরেক শিক্ষার্থীকে থুতু মেরেছিল’।

থুতু মারার অপরাধে কেন এভাবে শিশুটিকে নির্যাতন করা? এমনকি তাকে বলে দেওয়া হয়েছে, বাসায় বললে মুখ সেলাই করে দেওয়া হবে! শিশুদের নিয়ে পরিচালিত কোনো প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বের মানসিকতা যদি এমন হয়, তবে অন্যদের অবস্থা সহজেই অনুমেয়। অনেক সচেতন শিক্ষক নিশ্চয়ই আছেন।

কিন্তু এমন শিক্ষকও আছেন, যারা শিশু শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাসহ শৃঙ্খলার জন্য নানাভাবে শাস্তি দেন। অথচ আইনে শারীরিক ও মানসিক উভয় ধরনের শাস্তিকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিশুদের কান ধরে উঠবস করানো কিংবা তাদের রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করাও অপরাধ।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন বন্ধ না হওয়ার কারণ অস্পষ্ট নয়। অনেক অভিভাবক এখনও মনে করেন, শিশুদের শেখা নিশ্চিত করতে শারীরিক শাস্তির প্রয়োজন আছে। কেউ কেউ একসময় একে অপরিহার্যই মনে করতেন। সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সে কারণেই শিশুদের শারীরিক শাস্তির প্রবণতা কমছে না। শ্রেণিকক্ষে আগে বেত নিয়ে যাওয়ার যে প্রচলন ছিল, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উঠে গেছে। তবে সরাসরি বেত বা শাস্তি দেওয়ার উপকরণ না নিলেও বিভিন্নভাবে শাস্তি দেন শিক্ষকরা।

মাদ্রাসাগুলোতে শিক্ষার্থীদের শারীরিক শাস্তি কতটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে– সে প্রশ্ন থাকলেও কিছু মাদ্রাসা এ উদাহরণ তৈরি করেছে– এমন শাস্তি না দিয়েও পড়াশোনা সম্ভব। অবশ্য ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রাইভেট টিউশন কিংবা কোচিংয়েও শিক্ষার্থীদের মারার প্রবণতা রয়ে গেছে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা এসএসসি পর্যায়ে উঠে গেলে তাদের ‘বড়’ বলে মারা হয় না। অথচ ছোটদেরই যে এ ধরনের শাস্তি দেওয়া বেশি ক্ষতিকর– সে হুঁশ আমাদের নেই।

পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে আমরা দেখি, প্রায় বছরেই শিক্ষার্থীরা গণিত, ইংরেজি– এই দুই বিষয়ে বেশি খারাপ করে। বাস্তবে অনেক প্রতিষ্ঠানেই এই দুই বিষয়ের শিক্ষকের রুদ্রমূর্তি বেশি দেখা যায়। পড়া না পারলে তাদের হাত থেকে নিস্তার পাওয়া কঠিন হয়। কিন্তু আমরা কি চিন্তা করছি, আমাদের শিক্ষার ধরনের কারণেই শিক্ষার্থীরা এ বিষয়গুলো সহজে বুঝতে পারছে না এবং দিনশেষে তারা পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়?

গণিত, ইংরেজি কিংবা অন্য যেসব বিষয় ‘কঠিন’ মনে করা হয়, সেগুলো সহজে শিশুদের শেখানোর অনেক মাধ্যম রয়েছে। শিশুবান্ধব উপায়ে সেগুলো মজা করে যে শেখানো যায়, তার উদাহরণও কম নেই। সেভাবে শেখালে সব শিক্ষার্থী সহজে বুঝতেও পারে। সেভাবে পড়ানোর জন্য শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। পাশাপাশি শিশু উপযোগী শ্রেণির অবকাঠামো নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।

বিদেশে, এমনকি দেশেও অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত শ্রেণি কার্যক্রমে অংশ নিতে নিজ থেকেই আগ্রহী থাকে। কারণ, সেখানে পড়াশোনার শিশুবান্ধব পরিবেশ আছে। তার বিপরীতে অনেক প্রতিষ্ঠানেই শিশুরা যেতে অনীহা বোধ করে, অনেককে অভিভাবকদের ধরে নিয়ে যেতে হয়। কারণ, আমরা সেখানে একটা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছি। যদিও প্রতিষ্ঠানে বিজ্ঞাপনে নানা চটকদার কথাবার্তা লেখা থাকে; বাস্তবে অনেক কিছুরই অস্তিত্ব পাওয়া যায় না।

এর জন্য শিক্ষা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে তদারক করা দরকার তা দেখা যায় না। শিশুদের শারীরিক শাস্তিও প্রশাসনের নিয়মিত মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।

শারমিন একাডেমিতে শিশু নির্যাতনের ভিডিও দেখে সামাজিক মাধ্যমে যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে, তা ইতিবাচক। তার মানে শিশুদের শারীরিক শাস্তির বিরুদ্ধে এক ধরনের জনমত তৈরি হয়েছে। অভিভাবক ও শিক্ষকের মানসিকতা পরিবর্তনেও এ ঘটনা ভূমিকা রাখতে পারে। শাস্তি দিয়ে তাৎক্ষণিক কাজ উদ্ধার হলেও দীর্ঘ মেয়াদে এটা শিশুর ক্ষতিই ডেকে আনে। হাসিখুশি থাকা কোমলমতি শিশুদের শাস্তি ও নির্যাতনে তার জীবনে এমন ‘ট্রমা’ নেমে আসতে পারে, যার কারণে শিশুটি আর স্বাভাবিক নাও হতে পারে। এভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করব?

‘এন্ড করপোরাল পানিশমেন্ট’ সংগঠনের তথ্য বলছে, ৬৯টি দেশ আইন করে সব ক্ষেত্রে শিশুদের শাস্তি নিষিদ্ধ করেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ নেই। তবে শিশু নির্যাতন বন্ধে দেশের যেসব আইন ও উদ্যোগ আছে তা যথেষ্ট এবং সেগুলোর প্রয়োগ অপরিহার্য। একই সঙ্গে শিশুকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিরও পরিবর্তন জরুরি। সবাই সচেতন ও সতর্ক হলেই এর প্রতিরোধ সম্ভব। শিক্ষাক্ষেত্রে আপাদমস্তক সংস্কারও এ ক্ষেত্রে জরুরি। নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাসাবাড়ি ও বাইরের পরিবেশ শিশুবান্ধব করতে হবে।

মাহফুজুর রহমান মানিক: জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক, সমকাল
mahfuz.manik@gmail.com

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত