
নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হতে যাচ্ছে দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার পর এ প্রক্রিয়া রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে ফিরিয়ে আনার পথ সুগম করবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো একটি সংসদীয় গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদীয় কার্যক্রম শুরু হওয়া কেবল প্রশাসনিক ঘটনা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় বৈধতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক দায়বদ্ধতার পুনর্গঠনের প্রতীক।
এ প্রেক্ষাপটে সাম্প্রতিক সময়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী প্রফেসর আলী রিয়াজের দেওয়া একটি বক্তব্য নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি মত দিয়েছেন যে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুবার শপথ নেওয়া প্রয়োজন। প্রথমত সংসদ সদস্য হিসেবে, দ্বিতীয়ত সংবিধান সংশোধন পরিষদের সদস্য হিসেবে। তিনি অতীতেও অনুরূপ মত প্রকাশ করেছেন। তবে বর্তমান সাংবিধানিক বাস্তবতায় এ প্রস্তাবের আইনগত ভিত্তি এবং সাংবিধানিক যৌক্তিকতা গভীরভাবে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
প্রথমত, সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণের বিষয়টি সরাসরি সংবিধান নির্ধারিত। একজন সংসদ সদস্য শপথ গ্রহণের পরই পূর্ণ সাংবিধানিক বৈধতা অর্জন করেন। অর্থাৎ তিনি আইন প্রণয়ন, সংবিধান সংশোধন, বাজেট অনুমোদন, নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করা– এসব মৌলিক সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা লাভ করেন। এখানে আলাদা করে সংবিধান সংশোধন পরিষদ নামে কোনো সাংবিধানিক কাঠামো বিদ্যমান না থাকলে, সেই পরিষদের জন্য পৃথক শপথের প্রয়োজনীয়তা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান বাস্তবতায় সংবিধান পুনর্লিখনের কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু হয়নি এবং সংবিধান বাতিলও করা হয়নি। সংবিধান বাতিল বা নতুন সংবিধান প্রণয়নের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিকভাবে আলাদা সাংবিধানিক পরিষদ বা সংবিধান সভা গঠনের নজির রয়েছে। কিন্তু বিদ্যমান সংবিধান বহাল রেখে শুধু সংশোধনের জন্য সংসদের বাইরে পৃথক কাঠামো তৈরি করা সাংবিধানিক রীতি ও চর্চার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
তৃতীয়ত, সংবিধান সংশোধনের সাংবিধানিক কর্তৃত্ব সংসদের মধ্যেই নিহিত। জাতীয় সংসদ আইন প্রণয়ন এবং সংবিধান সংশোধনের একমাত্র বৈধ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংসদের ভেতরে স্থায়ী কমিটি, বিশেষ কমিটি বা সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠন করা সম্ভব এবং সাংবিধানিকভাবে সেটিই গ্রহণযোগ্য পথ। সংসদের বাইরে বা সংসদের সমান্তরালে কোনো কাঠামো তৈরি করা হলে তা সাংবিধানিক দ্বৈততা তৈরি করতে পারে।
চতুর্থত, রাষ্ট্রীয় শপথ কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা ও নৈতিক অঙ্গীকারের প্রতীক। একই সাংবিধানিক দায়িত্বের জন্য একাধিক শপথ নেওয়ার নজির তৈরি হলে ভবিষ্যতে এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপব্যবহারের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষত যদি ভবিষ্যতে কোনো সরকার বা রাজনৈতিক শক্তি নতুন কোনো সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করার যুক্তি হিসেবে এই নজির ব্যবহার করে, তাহলে তা সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
পঞ্চমত, সাংবিধানিক আইনের একটি মৌলিক নীতি হলো, সংবিধানের পরিবর্তন সংবিধানের ভেতর থেকেই হতে হবে। যদি সংসদের বাইরে কোনো সাংবিধানিক কর্তৃত্ব সৃষ্টি করা হয়, তাহলে তা ‘ডুয়েল লেজিটিমেসি’ বা দ্বৈত বৈধতার সংকট তৈরি করতে পারে। এতে রাষ্ট্র পরিচালনায় চূড়ান্ত সাংবিধানিক কর্তৃত্ব কোথায় থাকবে– এ প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
ষষ্ঠত, আন্তর্জাতিক সাংবিধানিক অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নিলে দেখা যায়, অধিকাংশ সংসদীয় গণতন্ত্রে সংবিধান সংশোধনের দায়িত্ব সংসদ নিজেই পালন করে। আলাদা সাংবিধানিক পরিষদ সাধারণত তখনই গঠিত হয় যখন রাষ্ট্র নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে যাচ্ছে অথবা পূর্ববর্তী সংবিধান বাতিল হয়েছে। বিদ্যমান সংবিধান বহাল রেখে সমান্তরাল সাংবিধানিক কাঠামো তৈরি করার উদাহরণ খুবই সীমিত ।
সপ্তমত, সাংবিধানিক সংস্কৃতি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক চর্চার ফল। একবার যদি রাজনৈতিক সমঝোতা বা সাময়িক প্রয়োজনের ভিত্তিতে সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে নতুন প্রথা তৈরি করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সেটি একটি নেতিবাচক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে সংবিধান ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সমঝোতার নথিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যা একটি সাংবিধানিক রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
অষ্টমত, বাস্তব রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। যদি রাজনৈতিক শক্তিগুলো সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে গিয়ে নতুন কর্তৃত্ব তৈরি করতে শুরু করে, তাহলে তা রাষ্ট্রের আইনি স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করতে পারে। সাংবিধানিক শাসন ব্যবস্থার মূল শক্তি হলো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং পূর্বনির্ধারিত নিয়ম অনুসরণ করা।
সব শেষে বলা যায়, সংসদ সদস্যদের দ্বিতীয়বার শপথ গ্রহণের ধারণা রাজনৈতিক বা একাডেমিক আলোচনায় স্থান পেতে পারে, কিন্তু সাংবিধানিক বাস্তবতায় এর প্রয়োজনীয়তা অত্যন্ত সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয়। বরং বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়া পরিচালনা করা রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অধিকতর নিরাপদ পথ।
সাংবিধানিক রাষ্ট্রে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো বৈধতা এবং সেই বৈধতা রক্ষাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী
সূত্র: সমকাল