
ঢাকা সিটি করপোরেশন দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ার পর প্রথম মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৫ সালের এপ্রিলে। এই নির্বাচনের দিন সংবাদ সংগ্রহের দায়িত্ব ছিল মিরপুরের কয়েকটি ওয়ার্ডে। সেদিন ঢাকা উত্তর সিটির ১২ নম্বর ওয়ার্ডের মিরপুর শাহ আলী মহিলা কলেজ কেন্দ্রে এক অভাবনীয় ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়।
ওই কেন্দ্রের বাইরে ৩৫-৪০ জনের একটা দল জড়ো হয়। তখন কেন্দ্রের ভেতরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অবস্থান করছিলেন। শাহ আলী থানার এক উপপরিদর্শক কেন্দ্র দখল করতে আসা লোকজনকে বলেন, ‘এখনও লাইন ক্লিয়ার না’। কিছুক্ষণ পর পুলিশ সদস্যরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়ে বের হয়ে গেলে ‘লাইন ক্লিয়ার হইছে’ আওয়াজ দিয়ে ওই ব্যক্তিরা কেন্দ্রে ঢুকে যান। প্রায় ২৫ মিনিট অবস্থান করে তারা ব্যালটে সিল মারতে থাকেন।
পরের দিন প্রথম আলো পত্রিকায় এই ঘটনাটি ‘পুলিশের সিগন্যাল লাইন ক্লিয়ার’ শিরোনামের প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয়। জীবনের প্রথম কোনো নির্বাচনের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়েই এমন ঘটনা দেখতে হয়। এরপর টানা এক দশকে দুটি জাতীয় নির্বাচন, একাধিক উপনির্বাচন, ঢাকা ও ঢাকার বাইরে বেশ কয়েকটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের পরিস্থিতি দেখার সুযোগ মেলে। সত্যি বলতে এই অভিজ্ঞতা সুখকর ছিল না।
কেন্দ্রে যেতে ভোটারদের প্রবল অনাগ্রহ, ভোটকক্ষে ‘ডাকাত’-এর উপস্থিতি, দিনভর বহিরাগতদের অবস্থান, জালভোটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও দায়িত্ব পালনে বাধা, ভোটারকে লাঞ্ছিত করা, ভোটকেন্দ্রে হট্টগোল, ব্যাপক কারচুপি, ভোট বাতিল, এজেন্টকে টেনেহিঁচড়ে বের করে দেওয়া এবং প্রার্থীর ওপরে হামলার মতো নানা ঘটনার সম্মুখীন হতে হয়। এই সময়ে ভোটের পরিবেশ ছিল ‘নিয়ন্ত্রিত’। ভোটকক্ষ, কেন্দ্রের ভেতরে এবং কেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের নিয়ন্ত্রণ থাকত একতরফা।
বৃহস্পতিবারের নির্বাচন কীভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু করা যায়, এসব আলোচনা এখন চলছে। একাধিক অংশগ্রহণকারী দল নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থার অভাবের কথা বলছে। এই নির্বাচন কমিশনের দুর্বলতাও বেশ স্পষ্ট হয়েছে। তপশিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন নির্বাচন কমিশনের অধীনে থাকলেও তারা সেভাবে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বিভিন্ন প্রার্থী নানা অভিযোগ করলেও কমিশন বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারেনি। ফলে এবারের নির্বাচনের দিনকে ঘিরে শঙ্কা কাটেনি।
গত কয়েক বছরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, ভোটের দিন কেন্দ্র নিয়ন্ত্রণে রাখতে একাধিক স্তরের তদারকি ব্যবস্থা গড়ে তোলা হতো। কেন্দ্রের বাইরে ক্ষমতাসীন দলের লোকজন কেন্দ্রের গেট পর্যন্ত জটলা তৈরি করতেন। কিছু কেন্দ্রের ভেতর সরকারি দলের কর্মীরা অবস্থান নিতেন। বুথ বা ভোটকক্ষের চিত্র থাকত আরও খারাপ। সব কেন্দ্রেই নির্ধারিত পোলিং এজেন্ট বাদেও ব্যাজধারী আরও তিন-চারজন করে অবস্থান করতেন। তাদের এক বা দুজন সার্বক্ষণিক কাপড় ঘেরা গোপন কক্ষের আশপাশে তৎপর থেকে নির্দিষ্ট প্রতীকে ভোট নিশ্চিত করতেন।
গোপনকক্ষে অবস্থানকারী এই ব্যক্তিরা পরিচিতি পান ভোটকক্ষের ‘ডাকাত’ হিসেবে। এই শব্দটি বেশি আলোচনায় আসে ২০২২ সালের ১২ অক্টোবর গাইবান্ধা-৫ (সাঘাটা-ফুলছড়ি) আসনের উপনির্বাচনের কারণে। ভোট শুরুর পর নানা অনিয়মের অভিযোগে ওই উপনির্বাচনের ভোট বন্ধ ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন। তৎকালীন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী হাবিবুল আউয়াল সেদিন সাংবাদিকদের বলেন, ‘গোপন কক্ষে অনুপ্রবেশকারীরাই ভোটকেন্দ্রের ডাকাত। এরাই দুর্বৃত্ত।’
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও ভোট ডাকাতদের নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। ইতোমধ্যে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান এবারের নির্বাচনে কেউ ভোট ডাকাতি করতে এলে তাদের রুখে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। গত ২৩ জানুয়ারি পঞ্চগড়ে জামায়াতের নির্বাচনী জনসভায় তিনি এই আহ্বান জানান।
২০১৪ সালের ‘বিনা ভোট’, ২০১৮ সালের ‘রাতের ভোট’ আর ২০২৪ সালের ‘ডামি ভোট’-এর জাতীয় নির্বাচনের কারণে ভোটারদের মধ্যে তীব্র অনাগ্রহ তৈরি হয়। বিশেষ করে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন ভোটাররা। ২০১৯ সালের মার্চে জয়পুরহাট উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের একটি কেন্দ্রে নির্বাচনী দায়িত্বে ছিলেন মোট ৩৬ জন। সারাদিন ওই কেন্দ্রে ভোট পড়ে মাত্র ৬৭টি।
যদিও এবারের জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ভোটারদের মধ্যে আগ্রহ রয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ১২ ফেব্রুয়ারির ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৫ শতাংশের বেশি ভোট পড়বে বলে তিনি মনে করছেন। শেষ পর্যন্ত ভোটারদের কেন্দ্রে উপস্থিত হওয়ার ক্ষেত্রে নির্বাচনের দিনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, ভোটকেন্দ্রের পরিবেশ বড় ভূমিকা রাখবে। তাই ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হলে নিরাপত্তা ও পরিবেশ নিয়ে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে হবে; যা এখনও পুরোপুরি হয়নি বলে আলোচনা রয়েছে।
এবারের নির্বাচনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা কেমন হবে– সেটাও দেখার বিষয়। অতীতে অনেক ক্ষেত্রেই ভোটের দিন পুলিশ ছিল নীরব দর্শকের ভূমিকায়। কোথাও কোথাও ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থীর কর্মীদের সহযোগিতা করেছে। আবার কোথাও জাল ভোটের সহযোগীও ছিল পুলিশ।
জুলাই গণঅভ্যুথানের পর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। এবার দেশের ৪২ হাজার ৭৬১ ভোটকেন্দ্রের প্রায় ৪১ শতাংশ ঝুঁকিপূর্ণ। এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে না পারলে পুলিশের ইমেজ আরও সংকটে পড়বে বলেই জনমনে ধারণা।
ভোটকক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বী সব প্রার্থীর এজেন্ট থাকলে কারচুপি করা কঠিন হয়। অতীতের নির্বাচনগুলোতে দেখা গেছে, বেশির ভাগ কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দল ছাড়া অন্য প্রার্থীর এজেন্ট থাকত না। কোথাও কোথাও এজেন্টকে বের করে দেওয়া হতো। কিছু ক্ষেত্রে ভুয়া ব্যক্তিদের অন্য প্রার্থীর এজেন্ট সাজিয়ে রাখার মতো ঘটনাও ছিল।
এবার জাতীয় নির্বাচনে নির্বাচন কমিশন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের ভোটকক্ষে সব প্রার্থীর এজেন্ট উপস্থিতি নিশ্চিতে জোর দেওয়া জরুরি। এজেন্টরা যেন কোনো ধরনের হুমকি-ধমকি, হামলার শিকার না হন সেটিও নিশ্চিত করতে হবে সংশ্লিষ্টদের।
সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের দিকে তাকালে দেখা যায়, ‘নিয়ন্ত্রিত ভোটের নতুন রূপ’, ‘সকালে লম্বা সারি, দুপুরে গণসিল’, ‘জাল ভোটের সহযোগী পুলিশ’, ‘সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও বাধার শিকার’, ‘ভোটারদের অনাগ্রহ ছিল প্রবল’, ‘ভোটকক্ষে ডাকাতের উপস্থিতি’ ‘দুপুরের আগেই ভোট শেষ’, ‘হট্টগোল, ব্যাপক কারচুপি, অবশেষে ভোট বাতিল’, ‘প্রার্থীর ওপর হামলা’– এ ধরনের শিরোনামের প্রাধান্য বেশি।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের দেড় বছর পেরোলেও জনমনে নিরাপত্তা নিয়ে আশঙ্কা কাটেনি। এ সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনের দিন পরিস্থিতি কেমন থাকবে তা নিয়ে রাজনৈতিক দল, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। বিশেষ করে ভোটকক্ষ, কেন্দ্রের ভেতর এবং কেন্দ্রের আশপাশের এলাকার পরিবেশ কেমন থাকবে তা নিয়ে অনেকেই উদ্বিগ্ন।
ভোটাররা যেন নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব ইসির। এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদেরও ভূমিকা রয়েছে। ভোটের দিনের পরিবেশ নিয়ে আশ্বস্ত হলেই কেবল ভোটাররা ভোট উৎসবে অংশ নিতে উৎসাহী হবেন।
সামছুর রহমান আদিল: সাংবাদিক ও যোগাযোগবিদ
jagoritoadil@gmail.com
সূত্র: সমকাল