প্রথম দিনের সেই অদ্ভুত কাঁপুনি। আজও মনে আছে। সেদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকেই প্রশ্ন করেছিলাম—
আমি কি পারব? আমি কি সত্যিই শিক্ষক হতে পেরেছি?
শ্রেণিকক্ষে ঢোকার আগে বুকের ভেতর হালকা কাঁপুনি ছিল। কয়েক সারি বেঞ্চ, কিছু তরুণ মুখ—কেউ আগ্রহী, কেউ উদাস, কেউ বা কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে। সেই চোখগুলোর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ বুঝলাম—আজ থেকে আমি শুধু নিজের জন্য নই। আমার বলা প্রতিটি কথা, আমার নীরবতাও, কারও জীবনে ছাপ ফেলতে পারে।
সেদিন থেকেই শিক্ষকতা আমার কাছে চাকরি নয়—দায় হয়ে উঠল। তিন দশকের শিক্ষকতা জীবনে শ্রেণিকক্ষই ছিল আমার সবচেয়ে আপন জায়গা। সেখানে আমি শুধু পড়াইনি—আমি শুনেছি, দেখেছি, বুঝতে চেয়েছি। মনে পড়ে—একদিন এক শিক্ষার্থী ক্লাস শেষে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। জিজ্ঞেস করতেই বলল,“স্যার, আজকের আলোচনাটা আমার জীবনের সঙ্গে মিলে গেছে।” সেই একটি বাক্য আমার অনেক ক্লান্তি দূর করে দিয়েছিল। শিক্ষকতার সবচেয়ে বড় পুরস্কার বোধহয় এটাই—কখন যে আপনার কথা কারও জীবনের ভেতর ঢুকে যায়, আপনি নিজেও জানেন না। সব শিক্ষার্থী এক রকম নয়—আমি সেটা শিখেছি ধীরে।
শুরুতে আমি ভাবতাম—ভালো শিক্ষার্থী মানেই ভালো ফল। সময় আমাকে ভুল ভাঙিয়েছে। আমি দেখেছি, অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী জীবনে হেরে গেছে, আবার অনেক সাধারণ শিক্ষার্থী অসাধারণ মানুষ হয়ে উঠেছে।
একজন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় বারবার ফেল করত। অন্যরা তাকে অবহেলা করত। আমি চেষ্টা করেছিলাম তাকে শুধু মানুষ হিসেবে দেখতে। বছর দশেক পরে সে এসে বলেছিল—
“স্যার, আপনি যদি সেদিন বিশ্বাস না করতেন, আমি আজ এখানে থাকতাম না।” সেদিন বুঝেছি—বিশ্বাস একজন শিক্ষকের সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
পাঠ্যসূচির বাইরে যে কথাগুলো সবচেয়ে জরুরি তা প্রতিনিয়ত শিক্ষার্থীদের বলেছি। আমি কখনো শুধু সিলেবাস শেষ করার শিক্ষক হতে চাইনি। ক্লাসে অনেক সময় জীবনের কথা এসেছে—ন্যায়, অন্যায়, রাজনীতি, সমাজ, নৈতিকতার কথা এসেছে। কারণ আমি বিশ্বাস করি—শিক্ষার্থীরা কেবল ডিগ্রি নিতে আসে না, তারা জীবনের দিকনির্দেশনা খোঁজে। কেউ যদি আমার ক্লাস থেকে শিখে থাকে কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কীভাবে অন্যের মতকে সম্মান করতে হয়—তাতেই আমার সার্থকতা।
সময় বদলেছে, আমিও বদলেছি। এই তিন দশকে আমি নিজেকে আসলে বদলাতে শিখেছি। একসময় ছাত্ররা নোট লিখত, আজ তারা স্ক্রিনে দেখে। একসময় প্রশ্ন করতে ভয় পেত, আজ তারা যুক্তি দেয়।
আমি চেষ্টা করেছি সময়কে অস্বীকার না করতে। কারণ আমি জানি—যে শিক্ষক নতুন প্রজন্মকে বোঝেন না, তিনি ধীরে ধীরে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েন। গবেষণা আমার কাছে কখনো বাহবা পাওয়ার বিষয় ছিল না। এটি ছিল নিজের সীমাবদ্ধতার সঙ্গে লড়াই। অনেক রাত কেটেছে বইয়ের পাশে বসে, অনেক প্রশ্নের উত্তর মেলেনি। গবেষণা আমাকে বিনয়ী করেছে। কারণ যত জানি, ততই বুঝি—আমরা আসলে কত অল্প জানি।
প্রশাসনিক দায়িত্ব আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়। শিক্ষকতার পাশাপাশি প্রশাসনিক দায়িত্বে এসে বুঝেছি—সব সিদ্ধান্ত কাউকে না কাউকে কষ্ট দেয়। এখানে আবেগ নয়, ন্যায্যতা জরুরি।
আমি চেষ্টা করেছি ক্ষমতার চেয়ে দায়িত্বকে বড় করে দেখতে। কখনো সফল হয়েছি, কখনো ব্যর্থ। কিন্তু কখনো ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করিনি—এই বিশ্বাসটাই আমাকে শান্তি দেয়। আমার ব্যর্থতার গল্পও আছে। আমি নিখুঁত নই। এমন শিক্ষার্থী আছে, যাদের সময় দিতে পারিনি। এমন সিদ্ধান্ত আছে, যেগুলো আজ মনে হলে ভাবি—আরও ভালো করা যেত।
কিন্তু এই ব্যর্থতাগুলোই আমাকে মানুষ করেছে। শিক্ষকতা আমাকে শিখিয়েছে—ভুল স্বীকার করাও এক ধরনের শিক্ষা।
সহকর্মীরা আমার নীরব সহযাত্রী। এই দীর্ঘ পথে সহকর্মীরা ছিলেন আমার পাশে। কখনো মতভেদ হয়েছে, তর্ক হয়েছে, কিন্তু ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা। অনেক সহকর্মী আজ অবসরপ্রাপ্ত, কেউ কেউ আর নেই। তাঁদের সঙ্গে কাটানো সময় আজ স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে—কিছু হাসি, কিছু দীর্ঘ আলোচনা, কিছু নীরবতা।
শিক্ষকতা আমাকে কী দিয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে আমি বলব—শিক্ষকতা আমাকে ধৈর্য দিয়েছে, সহানুভূতি দিয়েছে, নিজের সীমা চিনতে শিখিয়েছে। আমি শিখেছি—সব প্রশ্নের উত্তর নেই, কিন্তু সব প্রশ্নই মূল্যবান।
আজ যখন তিন দশক পেছনে তাকাই, দেখি—সময় খুব দ্রুত চলে গেছে। কিন্তু ভালোবাসা রয়ে গেছে। শিক্ষার্থীদের মুখ, শ্রেণিকক্ষের শব্দ, সেই প্রথম দিনের কাঁপুনি—সবই রয়ে গেছে ভেতরে। মাঝে মাঝে মনে হয় যদি আবার শুরু করতে পারতাম, আমি আবার শিক্ষকই হতাম। একই ভুল করতাম, একইভাবে শিখতাম, একইভাবে ভালোবাসতাম। কারণ শিক্ষকতা আমাকে যা দিয়েছে—তা সব পদ, সব পরিচয়ের চেয়েও বড়। শিক্ষকতা আমার জীবন। আর এই তিন দশক—আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য অধ্যায়।
প্রফেসর ড. মোহাঃ হাছানাত আলী
উপাচার্য
নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়।