শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
মোশতাক আহমেদ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এখন প্রায় দোরগোড়ায়। ইতোমধ্যে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন দল ও জোট তাদের প্রচারণার কাজ শুরু করে দিয়েছে। কেউবা মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে, কেউবা জাতীয় কোনো নেতার কবর জিয়ারতের মাধ্যমে, কেউবা শহীদ মিনারে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে।

তবে অতীতে যেমন নির্বাচনের আগে শহরের ছোট গলি থেকে গ্রামগঞ্জের চায়ের দোকান গমগম করত ভোটের আলোচনায়, তেমন আবহ এখনও দৃশ্যমান হয়নি কোথাও। নানাবিধ সংশয়ের আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষের নির্বাচন ভাবনা। বিশেষ করে গত মাসে রাজধানী ঢাকায় আততায়ীর গুলিতে একজন সম্ভাব্য প্রার্থীর মৃত্যু ঘিরে জনমনে দেখা দিয়েছে নির্বাচনকালে নিরাপত্তার উদ্বেগ। ঠিক এমনই এক সময়ে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার একটি বক্তব্য সে উদ্বেগের আগুনে যেন ঘি ঢেলে দিয়েছে।

১৮ জানুয়ারি রাজশাহীর সারদায় বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমির প্যারেড গ্রাউন্ডে শিক্ষানবিশ সহকারী পুলিশ সুপারদের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পুলিশের লুট হওয়া অস্ত্র ব্যবহার হবে না– এটি আমি নিশ্চিত করছি।’ কিন্তু এই ‘নিশ্চিত করা’র বিষয়টিই জন্ম দিয়েছে নানা আলোচনার।

সব সময়ই নির্বাচন এলে নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে উদ্বেগ কাজ করে; হোক তা জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচন। কিন্তু এবারের প্রেক্ষিত একটু ভিন্ন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তদানীন্তন আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন থানা, ফাঁড়ি ও পুলিশের অন্যান্য স্থাপনায় হামলা, ভাঙচুর, লুট, অগ্নিসংযোগ করা হয়। পুলিশের এসব স্থাপনা থেকে পাঁচ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ছাড়াও ছয় লাখ ৫১ হাজার ৮৩২টি গোলাবারুদ লুট হয়।

এ ছাড়া গণভবন এলাকা থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) ৩২টি অস্ত্র খোয়া যায়। পরে বিভিন্ন অভিযানে অধিকাংশ অস্ত্র উদ্ধার হলেও এখনও এক হাজার ৩৩৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দুই লাখ ৫৭ হাজার ১৮৯টি গুলি উদ্ধার হয়নি। অনেকেই ধারণা করছেন, এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, যা নির্বাচনে ব্যবহার হতে পারে।

লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে সরকারের পক্ষ থেকে এ পর্যন্ত তিনবার পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এখন অবধি তেমন সাড়া পাওয়া যায়নি। গত ১০ আগস্ট লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। এক বিজ্ঞপ্তিতে পুলিশ সদরদপ্তর থেকে জানানো হয়, প্রকৃত সন্ধানদাতাকে পিস্তল ও শটগানের জন্য ৫০ হাজার, চায়না রাইফেলের জন্য এক লাখ, এসএমজির জন্য দেড় লাখ, এলএমজির জন্য পাঁচ লাখ ও প্রতি রাউন্ড গুলির জন্য ৫০০ টাকা পুরস্কার দেবে সরকার।

কিন্তু হিসাবমতে পুরস্কার ঘোষণার পর পাঁচ মাসে মাত্র ৪০টি অস্ত্র উদ্ধার সম্ভব হয়েছে। মনে রাখতে হবে, আন্ডারওয়ার্ল্ডে বরাবরই অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের ছড়াছড়ি ছিল, এখনও আছে।

সার্বিক বিবেচনায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আশ্বাসে বিশ্বাস করা কঠিনই বটে। ইতোমধ্যে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কিছু রোমহর্ষক খুনের ঘটনা ঘটেছে। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর মতিঝিলে শরিফ ওসমান হাদিকে গুলি করা হয়। যার ফলে কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনার ঠিক ১০ দিনের মাথায় গত ২২ ডিসেম্বর খুলনার সোনাডাঙায় একটি বাড়িতে দলীয় অন্তর্কোন্দলে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) খুলনা বিভাগীয় প্রধান ও জাতীয় শ্রমিক শক্তির কেন্দ্রীয় সংগঠক মোতালেব শিকদার গুলিবিদ্ধ হন।

এর পাশাপাশি যশোর, চট্টগ্রাম, খুলনা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, বগুড়া, পাবনাসহ ২০ জেলায় গত ১৪ মাসে প্রতিপক্ষের অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের গুলিতে পাঁচ শতাধিক খুনের ঘটনা ঘটেছে।

এমনি এক অবস্থায় স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনের সময় ব্যবহার করা হবে না বলে নিশ্চিত করেছেন– কতটুকু বাস্তবসম্মত তা বিবেচনার দাবি রাখে। এ কথা তো অস্বীকার করার উপায় নেই, অস্ত্রগুলো যারা লুট করেছে তারা কোনো সৎ উদ্দেশ্যে করেনি। আর অবৈধ অস্ত্র যারা ব্যবহার করে, তারা তা কাউকে জানিয়ে করে না। এখানেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার বক্তব্য প্রশ্নবিদ্ধ।

লুটকারীরা যে নির্বাচনের সময় এসব ব্যবহার করবে না, এ কথা তিনি জানলেন কেমন করে? যদি জেনেই থাকেন, তাহলে কি ধরে নেওয়া যাবে, অস্ত্র লুটকারীদের অবস্থান তার জানা আছে? যদি তাই থেকে থাকে, তাহলে তাদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না কেন?

অতীতে আমাদের দেশে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে যারাই ছিলেন, তাদের অনেককেই সংকটকালে হাস্যকর অতিশয়োক্তি করতে দেখা গেছে। এখনও মানুষ ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে’, কিংবা ‘উই আর লুকিং ফর শত্রুজ’ এই শব্দবন্ধগুলো মনে রেখেছে। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার আলোচ্য বক্তব্যও কি তেমন কিছু?

এদিকে তিনি নিজেও তাঁর পূর্ব অবস্থান থেকে সরে এসে দুই দিনের মাথায় পুলিশের লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। ২০ জানুয়ারি মন্ত্রণালয়ে আইনশৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় তিনি এই মর্মে নির্দেশনা প্রদান করেন– ‘নির্বাচন সামনে রেখে পুলিশসহ সব আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হারানো অস্ত্রসহ যে কোনো অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কার্যক্রম ত্বরান্বিত করতে হবে।’

যদি তাই হয়, তাহলে মাত্র দুদিন আগে ‘নির্বাচনের সময় লুট করা অস্ত্র ব্যবহার করা হবে না’– এ কথা বলার কী প্রয়োজন ছিল?

স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা যা-ই বলুন না কেন, নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে; অভিজ্ঞতা বলে, ততই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী এবং তাদের মধ্যে উত্তেজনার পারদ চড়তে থাকবে। এবার বিএনপির প্রার্থীদের সামনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ নেই বলে দলটির অনেক স্বতন্ত্র প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্দেশনা উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে গেছেন।

অনেক আসনেই নিশ্চিত জয়ের এমন মওকা কে হারাতে চায়! আইনশৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর অবস্থাও তেমন সুবিধার নয়। ফলে পেশিশক্তির ব্যবহার বাড়তে পারে– এমন শঙ্কা যেমন উড়িয়ে দেওয়া যায় না; নিরাপত্তা নিয়ে আত্মতৃপ্তিরও কোনো অবকাশ নেই।

মোশতাক আহমেদ: অবসরপ্রাপ্ত জাতিসংঘ কর্মকর্তা ও কলাম লেখক

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত