
জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, আয় বৃদ্ধি, দারিদ্র্যের বিস্তৃতি, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, খাদ্যের বাণিজ্যিকীকরণে দেশে হাঁস-মুরগির ডিম ও মাংসের চাহিদা দ্রুতগতিতে বাড়ছে। চাহিদার সিংহভাগই জোগান দিচ্ছে বাণিজ্যিক খামারগুলো। এটা আরও বাড়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। কারণ পাখি জাতীয় খাদ্য ব্যবহারে বাংলাদেশ এখনও দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে নিচে।
২০২৪ সাল নাগাদ দেশে বছরে ২৩৩ কোটি ৭০ লাখ ডিম, ১৪ লাখ ৬০ হাজার টন মাংস উৎপাদিত হয়েছে। হাঁস-মুরগি প্রজননকারী সমিতির মতে, ওই বছর দৈনিক পাঁচ কোটি ডিম আর ২৫ লাখ মুরগি উৎপাদিত হয়েছে।
এ সময়ে হাঁস-মুরগির বাণিজ্যিক খামার বেড়েছে বার্ষিক ১৫ শতাংশ হারে। বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট পালিত হাঁস-মুরগির সংখ্যা ছিল ৪৬ কোটি ৪৬ লাখ। এর মধ্যে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা মুরগি ছাড়া অন্যান্য প্রাণীর অংশ খুব কম।
দেশে বাণিজ্যিক মুরগির চাষ বৃদ্ধি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজাত হিসেবে উৎপাদিত হচ্ছে বিপুল বিষ্ঠা ও আবর্জনা। খামারে মুরগির বিষ্ঠা সাধারণত পানি দিয়ে পরিষ্কার করা হয়, যা পার্শ্ববর্তী কোনো গর্তে জমা হয়। করপোরেট খামার এগুলো মাছের খাদ্য হিসেবে বিক্রি করে। মুষ্টিমেয় খামার জৈব সার উৎপাদনে এসব ব্যবহার করে। অন্যদিকে মাঝারি ও প্রান্তিক খামারিরাও এগুলো মৎস্য খাদ্য হিসেবে বিক্রির পাশাপাশি নিজেরাও মাছ চাষে ব্যবহার করে।
কেউ কেউ পুকুরের ওপরে বা পাশে খামার তৈরি করে বিষ্ঠা সরাসরি সেখানে ফেলে। কিছু ক্ষেত্রে মুরগির বিষ্ঠা সরাসরি নালা, খাল, নদী বা বিলে ফেলা হয়। পুকুর বা গর্তে জমানো উপচে বা বর্ষায় খাল-বিলে তা মেশে। মোটকথা, দেশের বাণিজ্যিক মুরগির খামারের বিপুল পরিমাণ বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, নয়তো বর্জ্য হিসেবে নদী-নালায় মেশে। যদিও মাছ চাষে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার নিষিদ্ধ বলে জানা যায়।
বাণিজ্যিক খামারে সর্বোচ্চ উৎপাদন নিশ্চিত করতে ঘন করে বিদেশি জাতের মুরগি পালন করা হয়। যেগুলো প্রাকৃতিক জাতের মতো সহিষ্ণু নয়। গাদাগাদি পরিবেশে সেগুলোর গণহারে সংক্রামক রোগে আক্রান্তের ঝুঁকিও থাকে। রোগ ও মড়ক প্রতিরোধ এবং দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে অধিক খাদ্যের পাশাপাশি নানা অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, খনিজ, এমনকি কীটনাশকও যুক্ত হয়। এসব উপাদানের খুব কম অংশই মুরগি গ্রহণ করতে পারে। বেশির ভাগই বিষ্ঠার সঙ্গে বেরিয়ে যায়।
বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বাণিজ্যিক খামারের মুরগির বিষ্ঠায় রয়েছে নানা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক, প্রটোজোয়া ও কৃমি। এদের অনেকটাই হাঁস-মুরগি, গবাদি পশু, মানুষসহ প্রাণীর জন্য মারাত্মক রোগ সৃষ্টিকারী। ব্যাকটেরিয়ার একটি অংশ আবার অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী। মুরগির খাবারের সঙ্গে নিয়মিত অল্প মাত্রায় অ্যান্টিবায়োটিক মেশানোর ফলে অনেক জীবাণু অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করে।
একটি গবেষণায় যুক্তরাষ্ট্রে পরীক্ষা করা সব খামারেই অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী জীবাণু দেখা গেছে। কিছু প্রজাতিতে ৭টি পর্যন্ত অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন জিন ছিল। ব্যাকটেরিয়াতে থাকা জিনগুলো এক প্রজাতি থেকে অন্য প্রজাতিতেও পরিবাহিত হতে পারে। কাজেই হাঁস-মুরগি সংশ্লিষ্ট নয় এমন জীবাণুরও অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি।
এই অ্যান্টিবায়োটিক যখন মাটি বা পানিতে মেশে তখন সেখানকার জীবাণুর কিছু অংশকে ধ্বংস করে, আর কিছু তা সহ্য করতে পারে। ফলে দেখা যায় সেখানকার বাস্তুতন্ত্রে অণুজীবের ভারসাম্য নষ্ট হয়। যার প্রভাব পড়ে সমগ্র পরিবেশের ওপর। এটা বৃহত্তর পরিসরে জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী করে তুলতে পারে। এতে অন্যান্য গৃহপালিত ও বন্য পশু-পাখি, মাছ, উদ্ভিদ, এমনকি মানুষও আক্রান্ত হতে পারে।
যদিও বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক ৩০ দিনের মধ্যে নিজে থেকেই ক্ষয় হয়ে যায়, কিন্তু কিছু দীর্ঘস্থায়ী, যা দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশে বিরূপ প্রভাব অব্যাহত রাখে। কিছু অ্যান্টিবায়োটিক যেমন ক্লোরোটেট্রাসাইক্লিন শস্য ও শাকসবজিতে মিশে যেতে পারে ও সেখান থেকে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে দীর্ঘ মেয়াদে জীবাণুর অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী করে তোলার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যা তৈরি করতে পারে।
এ ছাড়া কিছু ক্লোরিন মেশানো অ্যান্টিবায়োটিকযুক্ত মুরগির বিষ্ঠা পোড়ালে তা ডায়ক্সিন নিঃসরণ করে, যা অত্যন্ত বিষাক্ত ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী উপাদান। এটা নিঃশ্বাসের সঙ্গে বা পানিতে মিশে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই পুড়িয়ে মুরগির বিষ্ঠা থেকে রেহাই পাওয়ারও উপায় নেই। মুরগির বিষ্ঠা থেকে এসব অ্যান্টিবায়োটিক চুইয়ে ভূগর্ভস্থ পানিতেও মিশে যেতে পারে, যা পরে মানুষের শরীরে প্রবেশের ঝুঁকি থাকে।
এ ছাড়া পোকার আক্রমণ ঠেকানোর জন্য বাণিজ্যিক মুরগির খাবারে নানা ধরনের কীটনাশক মেশানো হয়, যার অবশেষ বিষ্ঠায় থেকে যায়। এসব কীটনাশকের রাসায়নিক পদার্থ পরিবেশ, বিশেষত পানি দূষণে ভূমিকা রাখে। পাশাপাশি অনেক কীটনাশকে অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ক্লোরিন মেশানো হয়।
বাণিজ্যিক মুরগির খাদ্যে নানা ভারী ধাতু নানারূপে যুক্ত করা হয়। ফলে বিষ্ঠায় নানা ভারী ধাতুর উপস্থিতি থাকে, যা বেশি মাত্রায় থাকলে বা দীর্ঘদিন ধরে জমা হলে মানুষ ও পশু-পাখির স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ওপর এর মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়তে পারে।
উপরন্তু বাণিজ্যিক খামারের মুরগির বিষ্ঠায় কয়েক ধরনের হরমোন থাকে, যা মেরুদণ্ডী প্রাণীদের প্রজননতন্ত্র গঠন ও প্রজননে ভূমিকা রাখে।
এসব হরমোন বিষ্ঠার সঙ্গে নির্গত হওয়ার পর দুই বছর পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। পানির সঙ্গে মিশে জলাশয়ে গেলে মাছের প্রজনন ও উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। এটি আমাদের প্রাণিজ আমিষ খাদ্যের আরেকটি প্রধান উৎসকে সীমিত করে দিতে পারে।
মুরগির বিষ্ঠা থেকে অ্যামোনিয়া, মিথেন ও নাইট্রাস অক্সাইডের মতো গ্যাস উৎপন্ন হয়। যার সবই পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে মিথেন ২০ বছর মেয়াদে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে কার্বন-ডাইঅক্সাইডের চেয়ে ৮০ থেকে ৮৭ গুণ ক্ষতিকর।
ওদিকে জাতীয় পশুপালন বিধিমালা-২০২৩ খামার বর্জ্য ব্যবস্থার বিষয়ে শুধু এটা পরিবেশবান্ধব ও সংশ্লিষ্ট বিধি অনুযায়ী হতে হবে বলেই ক্ষান্ত হয়েছে। তবে পরিবেশ ব্যবস্থাপনায় বলা হয়েছে, খামারের জন্য যেন পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের কোনো ক্ষতি না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের ‘আধুনিক ধানের চাষ’ বইয়ের ২৫তম সংস্করণে ধানক্ষেতে বিপুল পরিমাণ মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহারকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করা হয়েছে।
অথচ দেখা যাচ্ছে, বর্তমানে বাণিজ্যিক মুরগির খামারের বিষ্ঠা যেভাবে ফেলা বা ব্যবহার করা হয় তা থেকে মানুষ ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি, চিকিৎসা খরচ ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কাই শুধু নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থা বা বাস্তুতন্ত্রের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কাও যথেষ্ট। সে তুলনায় আমাদের বিধি ও নীতিমালা অপ্রতুল, আর সচেতনতা ব্যবস্থা নেই বললেই চলে।
এ সমস্যার আকার ও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব এত সুদূরপ্রসারী যে আমাদের সামনে শুধু প্রশ্ন এই নয় যে, আমরা বাণিজ্যিক মুরগির খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কীভাবে করব। বরং আমাদের সামনে আসল প্রশ্ন, আমরা সস্তায় অধিক মাংস ও ডিম উৎপাদন করতে গিয়ে মুরগি পালনে এভাবে খাবারে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন, কীটনাশক ইত্যাদি ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার করব কিনা? খাদ্য ব্যবস্থা, পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রকে হুমকির সম্মুখীন করব কিনা? নাকি নিরাপদ, টেকসই, পরিবেশবান্ধব কিন্তু তুলনামূলক কম উৎপাদনশীল বিকল্প অনুসন্ধান করব?
আবু আলা মাহমুদুল হাসান: গবেষক
সূত্র: সমকাল