শিরোনাম:

গণভোটে জিতেছে ‘হ্যাঁ’, পক্ষে পড়েছে ৪ কোটি ৮০ লাখ ভোট

মেমোরি চিপ সংকটে চীনের দিকে ঝুঁকছে এইচপি, ডেল, এসার ও আসুস

বদলে যাওয়া তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা

অবশেষে মামলা থেকে স্থায়ী জামিন পেলেন হিরো আলম

চামড়ার জুতা ফেটে যাচ্ছে? যেভাবে যত্ন নেবেন

এখন প্রয়োজন জাতীয় ঐক্যে রাষ্ট্র মেরামত

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ১৩, ২০২৬
মোহাম্মদ গোলাম নবী

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি সাধারণ নির্বাচন শুধু নয়; একই সঙ্গে একটি দীর্ঘ কর্তৃত্ববাদী শাসন অধ্যায়ের সমাপ্তি ও নতুন পথচলার সূচনা।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার কর্তৃত্ববাদী শাসনের অবসান হওয়ার ১৮ মাস পর অনুষ্ঠিত বৃহস্পতিবারের নির্বাচনে জনগণ শুধু নতুন সরকার গঠনের রায় দেয়নি; একই সঙ্গে পূর্বেকার ভোট না দিতে পারা ভীতিময়, কেন্দ্রীভূত ও দলীয়কৃত রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধেও রায় দিয়েছে।

নতুন সরকারের কাছে সবচেয়ে বড় বিষয় হওয়া উচিত দেড় যুগে ভেঙে পড়া রাষ্ট্র কাঠামো পুনর্গঠনে কাজ করা। কারণ এই সময়ে রাষ্ট্রের ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে গেছে। বাংলাদেশের তিনটি বড় কাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে, যার প্রভাব ক্ষেত্রবিশেষে কয়েক দশক পর্যন্ত থাকবে, যদি না নতুন করে ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড শুরু হয়। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভেঙে পড়া রাষ্ট্রের কাঠামোগত ক্ষতিগুলো মেরামতই হবে আগামী সরকারের প্রধানতম দায়িত্ব।

প্রথমত, শেখ হাসিনার আমলে গণতন্ত্রের মূল শর্ত নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করা হয়েছিল। সংসদ ছিল কিন্তু জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্ক দুর্বল হয়ে পড়েছিল। বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের সম্পর্কে পুনর্গঠন শুরু হলো। নতুন সরকারের প্রথম দায়িত্ব হবে গণতান্ত্রিক চর্চার জায়গাগুলো উন্মুক্ত রাখা এবং জনপরিসরে গণতন্ত্র চর্চার সুযোগ বাড়ানো, যাতে মানুষ বুঝতে পারে গণতন্ত্রচর্চার দিক থেকে তারা আগের থেকে ভালো আছে এবং আরও ভালোর দিকে এগোচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিগত সরকারের সময় দুর্বল করা হয়েছে। রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়; আইন, বিধি ও প্রতিষ্ঠানের নিয়মে চলার কথা থাকলেও শেখ হাসিনার শাসনামলে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, বিচার ব্যবস্থা সবকিছু দলীয় প্রভাবাধীনে চলে গিয়ে যাওয়ায় পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা হারিয়েছিল। ব্যক্তি শক্তিশালী হওয়ায় প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল। সিদ্ধান্তগুলো জনবিরোধী ও অনির্ভরযোগ্য হয়ে পড়েছিল। এখন নতুন সরকারের সামনে চ্যালেঞ্জ হবে প্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রাতিষ্ঠানিকতা ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু করা। কাজটি যে কত কঠিন; অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের অভিজ্ঞতা থেকে সুস্পষ্ট।

তৃতীয়ত, দুর্নীতি বিগত শাসনামলে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছিল। প্রকল্প মানেই ব্যয় বৃদ্ধি; নিয়োগ মানেই অনিয়ম; ব্যাংক মানেই লুট– এমন এক সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। যেখানে সততা ছিল ব্যতিক্রম। ফলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়েছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি। সার্টিফিকেটনির্ভর শিক্ষা যেখানে সহজ পরীক্ষা; উচ্চ নম্বরের বন্যা এবং প্রকৃত শিক্ষার অভাব দক্ষতাহীন প্রজন্ম তৈরি করেছে। মৌলিক পড়ালেখা ও বিশ্লেষণী ক্ষমতায়ও ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এই ক্ষতি এক সরকারের মেয়াদে পূরণ করা সম্ভব নয়। এটি কয়েক দশকের কাজ।

স্বাস্থ্য খাতেও একই চিত্র। অবকাঠামো বেড়েছে, মান বাড়েনি। চিকিৎসক, শিক্ষক ও দক্ষ ব্যবস্থাপনা ছাড়া নতুন নতুন মেডিকেল কলেজ গড়ে তোলা হয়েছে। কমিউনিটি ক্লিনিকের নামে রাজনৈতিক নিয়োগ বেড়েছে। জনস্বাস্থ্য ও প্রতিরোধমূলক চিকিৎসার বদলে কাগুজে সম্প্রসারণ ঘটেছে। ফলে স্বাস্থ্যসেবার ওপর জনগণের আস্থা কমেছে।

এই ক্ষতিগুলো প্রজন্মগত সংকটের রাস্তা তৈরি করেছে। এখানেই দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যারা সংসদে যাবে এবং যারা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছে কিন্তু সংসদে যাবে না তাদের মধ্যেও ঐক্য তৈরি করতে হবে, যাতে রাষ্ট্রের সংস্কারে সংসদ ও সংসদের বাইরে থাকা দলগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারে।

স্বস্তির বিষয় হলো, নতুন সরকারকে শূন্য থেকে শুরু করবে না। অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে বিভিন্ন খাতে একাধিক সংস্কার কমিশন কাজ করেছে। এসব বিষয়ে বিশদ পর্যালোচনা ও সুপারিশভিত্তিক রিপোর্ট তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা নির্ণয় এবং সম্ভাব্য সমাধানের পথরেখা ইতোমধ্যে তৈরি করেছে। যদিও সেখানে সমালোচনা আছে। তারপরও এগুলোকে ভিত্তি ধরে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে আরও শানিত করা সম্ভব। কিন্তু সে লক্ষ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং জাতীয় সংসদে ঐকমত্য দরকার হবে।

কারণ কাঠামোগত সংস্কার কখনও একদলীয় সিদ্ধান্তে টেকসই হয় না। নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা, বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা, প্রশাসনের পেশাদারিত্ব কিংবা দুর্নীতি দমনের মতো বিষয়গুলো দলীয় সুবিধা-অসুবিধার হিসাব দিয়ে সমাধান করা যায় না। এগুলো রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রশ্ন।

এই জায়গায় আমাদের একটি বাস্তব শিক্ষা আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের ওপর পূর্ণ সমর্থন থাকার পরও তাদের দক্ষতার ঘাটতি থাকায় তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে ব্যর্থ হয়েছে। ফলে অনেক ভালো উদ্যোগও তারা বাস্তবায়ন করতে পারেনি। এই অভিজ্ঞতার আলোকে আগামীতে যারা সরকার গঠন করবে ও বিরোধী দলে থাকবে তাদের বুঝতে হবে; ইচ্ছা যথেষ্ট নয়। প্রাতিষ্ঠানিক শক্তিই পরিবর্তনের পূর্বশর্ত, যা অন্তর্বর্তী সরকার আমলাতন্ত্রের বিরোধিতা হিসেবে উল্লেখ করেছিল।

এবারের নির্বাচনে প্রায় চার কোটি তরুণ ভোট দিয়েছে। চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান ও অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে এই তরুণ প্রজন্ম নানাভাবে রাষ্ট্রের ভালো-মন্দে যুক্ত হয়েছিল। তাদের কেউ কেউ আবার নির্বাচনেও অংশ নিয়েছে। তাদের একটি সত্য মেনে নিতে হবে: গণঅভ্যুত্থান রোমান্টিক হলেও রাষ্ট্র গঠন শ্রমসাধ্য বিষয়। ফলে কথায় কথায় রাস্তায় নেমে আসা, ভীতি ছড়ানো কিংবা নিজেদের ক্ষমতার বহিঃপ্রকাশ রাষ্ট্র গড়ার জন্য প্রতিবন্ধক। কারণ রাষ্ট্র গড়তে লাগে আইন, বিধি, প্রশাসন ও কাঠামো। আবেগ দিয়ে পরিবর্তনের সূচনা হলেও তাকে টেকসই করতে হয় ধৈর্য ও নিয়ম মেনে।
তাই নতুন সরকারের সকল পক্ষকে ক্ষমতা প্রদর্শনের চেয়ে ক্ষমতার সীমা নির্ধারণে বেশি মনোযোগী হতে হবে। কারণ প্রকৃত গণতন্ত্রে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ জরুরি। এ ছাড়াও সংসদকে শক্তিশালী করা ও স্থানীয় সরকারের কাজে সংসদ সদস্যদের যুক্ত না করাও খুব দরকারি পদক্ষেপ। আমাদের মনে রাখতে হবে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং বিকেন্দ্রীকৃত স্থানীয় সরকার ছাড়া প্রকৃত রাষ্ট্র মেরামত সম্ভব নয়।

আরেকটি বিষয় নিয়ে এখনই কথা বলা দরকার। সেটা হলো রাষ্ট্রের বৈশ্বিক পরিচিতি। নতুন সরকারকে দায়িত্ব লাভের শুরুতেই বিগত দিনগুলোতে দীর্ঘদিনের দলীয়করণ ও স্বৈরতান্ত্রিক ভাবমূর্তির কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বাংলাদেশের পরিচয় পুনরুদ্ধারে মনোযোগী হতে হবে। বিশ্বের রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে আস্থা পুনর্গঠন করার জন্য শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়, কূটনৈতিক ও নৈতিক অবস্থান দিয়েও বাংলাদেশকে নতুনভাবে উপস্থাপন করতে হবে।

বিশ্বে সামরিক শক্তিধর বা ধনী দেশের অভাব নেই। কিন্তু মানবিক, শান্তিপ্রিয় ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের উদাহরণ বিরল। বাংলাদেশ চাইলে এখানেই নিজের আলাদা জায়গা তৈরি করতে পারে সকল ধর্ম-বর্ণ ও মতের মানুষের সহাবস্থানের ভিত্তিতে একটি মানবিক রাষ্ট্র, শান্তিনির্ভর কূটনীতি এবং দায়িত্বশীল উন্নয়নের মডেল হিসেবে। এটিই হতে পারে আমাদের আগামী দিনের ‘সফট পাওয়ার’।
এই ব্র্যান্ডিংয়ের সবচেয়ে বড় ভিত্তি হতে পারে তারুণ্য। বাংলাদেশের তরুণ জনগোষ্ঠীই সবচেয়ে বড় কৌশলগত সম্পদ। সঠিক নীতি ও আন্তর্জাতিক অবস্থান তৈরি করা গেলে এই তরুণরাই বৈশ্বিক শ্রমবাজার, প্রযুক্তি, কূটনীতি ও মানবিক নেতৃত্বে নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। রাষ্ট্রের নতুন পরিচয় সরাসরি তাদের ভবিষ্যতের সঙ্গে যুক্ত– এ কথা আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোকে বুঝতে হবে।
নিবন্ধের শেষে এসে আবারও মনে করিয়ে দিতে চাই, গণঅভ্যুত্থান মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল কিন্তু রাষ্ট্র গঠন সবসময় সংযমের কাজ। নতুন সরকারকে মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কোনো একটি দলের নয়; এটি সবার। তাই প্রতিহিংসার পরিবর্তে জবাবদিহি; দমনের পরিবর্তে সংস্কার এবং দলীয়করণের পরিবর্তে পেশাদারিত্বের নীতিতে এগোতে হবে।

সংসদে ঐকমত্য তৈরি, সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবগুলো যাচাই-বাছাই করে বাস্তবায়ন, নির্বাচন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী, বিচার ব্যবস্থাকে স্বাধীন, প্রশাসনকে নিরপেক্ষ এবং শিক্ষা-স্বাস্থ্য খাতে বাস্তব পরিবর্তন আনার মতো কয়েকটি কাজ যদি আগামী পাঁচ বছরে শুরু করা যায়, তাহলেই আজকের নির্বাচন অর্থবহ হবে। অন্যথায় শুধু সরকার বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্র একই জায়গায় রয়ে যাবে। বাংলাদেশের সামনে এখন এক ঐতিহাসিক সুযোগ। এই সুযোগ হাতছাড়া হলে ক্ষতিটা শুধু একটি সরকারের নয়, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের হবে।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত