শিরোনাম:

মেমোরি চিপ সংকটে চীনের দিকে ঝুঁকছে এইচপি, ডেল, এসার ও আসুস

বদলে যাওয়া তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা

অবশেষে মামলা থেকে স্থায়ী জামিন পেলেন হিরো আলম

চামড়ার জুতা ফেটে যাচ্ছে? যেভাবে যত্ন নেবেন

সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ বাঁচাবেন কী ভাবে?

ভোরে কিচিরমিচির, সন্ধ্যায় ডানার নাচন তিরাইল এখন পাখিদের স্থায়ী আবাস

ডেইলি রিপোর্টঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ১৩, ২০২৬

প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার তিরাইল গ্রাম। শুধু শীত মৌসুমেই নয়, এখন বছরের প্রায় পুরো সময়জুড়েই হাজার হাজার শামুকখোলসহ নানা প্রজাতির পাখি এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। ভোরের আলো ফুটতেই কিচিরমিচিরে মুখর হয়ে ওঠে গ্রাম, আর সন্ধ্যা নামলেই আকাশজুড়ে ডানার নাচন তিরাইল তখন হয়ে ওঠে এক জীবন্ত পাখির রাজ্য।

গ্রামের কড়ই, শিমুল ও বাঁশবাগানজুড়ে গড়ে উঠেছে শামুকখোল পাখির বিশাল কলোনি। কোথাও মা পাখি ছানাদের মুখে তুলে দিচ্ছে খাবার, কোথাও দল বেঁধে নীড়ে ফিরছে, আবার কেউ খাবারের সন্ধানে উড়ে যাচ্ছে বিস্তীর্ণ আকাশে। বিশেষ করে সূর্যাস্তের সময় একসঙ্গে হাজারো পাখির নীড়ে ফেরার দৃশ্য এলাকাবাসীর কাছে প্রতিদিনের এক অনন্য প্রাকৃতিক নিদর্শনে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয়দের কাছে ‘শামুকখোল’ নামে পরিচিত এই সারসজাতীয় পাখি মূলত খাল-বিলের শামুক, মাছ ও পোকামাকড় খেয়ে জীবনধারণ করে। ধূসর-সাদা দেহ, কালো প্রান্তযুক্ত ডানা ও বাঁকা ঠোঁটের জন্য সহজেই চোখে পড়ে এ পাখি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায়ও এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক দশকেরও বেশি সময় ধরে পাখিগুলো তিরাইল গ্রামে নিয়মিত প্রজনন করছে এবং এখন এটি তাদের স্থায়ী আবাসস্থলে পরিণত হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম (৬২) বলেন, আগে শীত এলেই পাখি আসত, এখন আর যায় না। সারা বছরই থেকে যায়। তিরাইল এখন ওদের স্থায়ী ঘর হয়ে গেছে। কৃষক রহিম সরদার (৪৫) বলেন, ভোরে পাখির ডাকেই আমাদের ঘুম ভাঙে, সন্ধ্যায় ডানার শব্দে মন শান্ত হয়। এটা শুধু সৌন্দর্য না— আমাদের জীবনের অংশ হয়ে গেছে। গৃহবধূ রাবেয়া খাতুন (৩৮) বলেন, “পাখির বাচ্চা ফোটে, বড় হয়, উড়তে শেখে— সবকিছু এখানেই হয়। এটা প্রমাণ করে ওরা এখন এখানেই স্থায়ী।

তবে এই সৌন্দর্যের আড়ালে রয়েছে শঙ্কার বার্তা। স্থানীয়দের অভিযোগ, কিছু অসচেতন মানুষের শিকার ও নিধনের কারণে পাখির সংখ্যা আগের তুলনায় কমছে। বিশেষ করে রাতে ফাঁদ পাতা ও গুলতি ব্যবহার করে পাখি শিকারের ঘটনাও মাঝে মাঝে ঘটছে বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত নজরদারি না থাকলে একদিন এই পাখির রাজ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার লায়লা জান্নাতুল ফেরদৌস বলেন, তিরাইল গ্রামে পাখির স্থায়ী আবাস গড়ে ওঠা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। এটি শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নয়, একটি পরিবেশগত সম্পদও। আমরা পাখি নিধন বন্ধে সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করছি এবং যেকোনো ধরনের শিকার বা ক্ষতিকর কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাখি ও প্রকৃতি রক্ষায় এলাকাবাসীর সহযোগিতা অপরিহার্য।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রতিবছর শীত মৌসুমে নাটোরে বিপুল সংখ্যক অতিথি পাখির আগমন ঘটে। পাখির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি বন বিভাগের তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। অতিথি পাখি হত্যা ও নিধন আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ উল্লেখ করে জানানো হয়েছে, এ ধরনের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হবে।

অতিথি পাখি শুধু নয়, এখন স্থায়ী বসবাসকারী এই পাখিরাই তিরাইলের প্রকৃত পরিচয় হয়ে উঠেছে। তারা শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়ায় না, বরং পরিবেশের সুষম ভারসাম্য রক্ষায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তাই এই পাখির গ্রামকে রক্ষা করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। সচেতনতা, সামাজিক প্রতিরোধ ও কার্যকর প্রশাসনিক উদ্যোগই পারে তিরাইলকে দেশের অন্যতম পাখির গ্রাম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে।

সূত্র: দৈনিক বাংলা

পূর্ববর্তী সংবাদ পরবর্তী সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত