জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট সমঝোতার জন্য ৫০ আসন খালি রাখলেও ইসলামী আন্দোলন শেষ পর্যন্ত এককভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশনিতে যাচ্ছে বলে আভাস পাওয়া যাচ্ছে।
চরমোনাই পীর মুফতি রেজাউল করিম নেতৃত্বাধীন এই দলটি শুক্রবার বিকাল সাড়ে ৩টায় সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে। সেখানেই এ বিষয়ে ঘোষণা আসতে পারে বলে দলটির একজন কেন্দ্রীয় নেতা জানিয়েছেন।
তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “সারাদেশে ২৬৮ সংসদীয় আসনে আমাদের দলীয় মনোনয়ন জমা দেওয়া হয়েছে। শেষ পর্যন্ত এক-দুজন বাতিল হতে পারে। ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচন করবে।”
এর আগে বৃহস্পতিবার রাতে ইসলামী আন্দোলনের একাধিক নেতা বলেছিলেন, জামায়াতের জোটে তাদের ফেরার সম্ভাবনা ‘নেতিবাচক’; আবার বিএনপির সঙ্গে যাওয়ার ‘সম্ভাবনাও’ নেই।
সেক্ষেত্রে ধর্মভিত্তিক কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে নতুন জোট গড়ার চিন্তাভাবনা ছিল তাদের। তবে সেটাও হচ্ছে না বলেই এখন আভাস মিলছে।
এ বিষয়ে প্রশ্ন করলে দলের কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করীম মারুফ বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আজ বিকালে পুরানা পল্টনে আমাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আমাদের সংবাদ সম্মেলন। সেখানেই বিস্তারিত তুলে ধরা হবে।”
ইসলামী আন্দোলনের আমির সৈয়দ রেজাউল করীম ওই সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে তিনিই দলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করতে পারেন।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে। মনোনয়নপত্র বাছাই শেষে আপিল নিষ্পতির ধাপে রয়েছে নির্বাচন কমিশন। ২০ জানুয়ারি প্রার্থী চূড়ান্ত হবে।
নির্বাচন সামনে রেখে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বে যে ‘১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য’ গড়ে উঠেছে, তার সূচনা ঘটে ধর্মভিত্তিক আট দলের যুগপৎ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন এবং সংসদ নির্বাচনের আগে গণভোটের দাবিতে শুরু হয়েছিল সেই যুগপৎ আন্দোলন।
শুরুতে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), নেজামে ইসলাম পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি (বিডিপি) ছিল এই মোর্চায়।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে এলে এই মোর্চাকে নির্বাচনি জোটে রূপ দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। এর মধ্যে মনোনয়নপত্র জমার সময় শেষ হওয়ার আগের দিন জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও এলডিপি এবং তার পরদিন এবি পার্টি এই জোটে যোগ দেয়।
কিন্তু ইসলামী আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি দল এনসিপির জোটে আসা নিয়ে আপত্তি তোলে। শেষ পর্যন্ত মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসকে রাজি করানো গেলেও ইসলামী আন্দোলনের সঙ্গে জামায়াত জোটের দূরত্ব বেড়ে যায়।
গত দুই সপ্তাহে আগামী নির্বাচনের আসন সমঝোতা নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে মতৈক্যে পৌঁছাতে পারছিল না ইসলামী আন্দোলন। তাদের দাবি ছিল দেড়শর বেশি আসন। সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী আসন না পাওয়ায় বৃহস্পতিবার ‘১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্যের’ বৈঠকে যায়নি দলটি।
বৃহস্পতিবার রাত ৯টার পর ঢাকার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সংবাদ সম্মেলনে এসে আসন ভাগাভাগির হিসাব তুলে ধরেন জামায়াতের নায়েবে আমির সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের।
তাতে জামায়াতের ভাগে ১৭৯টি, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৩০টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২০টি, খেলাফত মজলিস ১০টি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি ) ৭টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টি ৩টি, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টি ২টি ও বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট পার্টির ভাগে আসন পড়ে ২টি আসন।
জোটের অন্যান্য শরিক দল— ইসলামী আন্দোলন, জাগপা ও বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের জন্য আসন চূড়ান্ত করা হয়নি।
জামায়াতে ইসলামী ‘আশা’ করছিল, ইসলামী আন্দোলন শেষমেশ তাদের জোটেই যোগ দেবে এবং সেই ‘আশা’ থেকে ৪৭টি আসনের বিষয়ে তারা সিদ্ধান্ত নেয়নি।
তাহের বলেন, “বাকি আসনগুলো আমাদের আরো যারা আছে, আমরা আশা করি, ঐক্যমতের ভিত্তিতে উনারা (ইসলামী আন্দোলন) আমাদের সঙ্গে থাকবেন। তখন আমরা ওনাদের আসনগুলো যেগুলো বাকি আছে, সেসব বিষয়ে আপনাদেরকে জানাব।”
তবে জামায়াত যখন সংবাদ সম্মেলন করে আসন ভাগাভাগির হিসাব তুলে ধরছিল, তখন ইসলামী আন্দোলনের তরফে একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি আসে।
তাতে বলা হয়, শুক্রবার বিকাল ৩টায় পুরানা পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ইসলামী আন্দোলনের নির্বাচনি জোটের ভাবনা সম্পর্কে জানানো হবে।
সেক্ষেত্রে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটে ফেরার কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা জানতে চাইলে দলটির সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ ইফতেখার তারিক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ফেরার সম্ভাবনা নেগেটিভ।”
সেক্ষেত্রে নতুন কোনো জোট গঠন করতে যাচ্ছেন কিনা, বা বিএনপির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা আছে কিনা, সেই প্রশ্ন করা হয় ইফতেখার তারিককে।
জবাবে তিনি বলেন, “জোট গঠনের বিষয়টা কাল সংবাদ সম্মেলনে জানানো হবে। আর বিএনপির সঙ্গে কোনো সমঝোতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নেই।”
জোটের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বৃহস্পতিবার রাতের সংবাদ সম্মেলনের পর বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক ইসলামী আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতার সঙ্গে আলাপ করেন।
তবে তাতে কোনও সমাধান আসেনি জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় একজন নেতা শুক্রবার সকালে বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইসলামী আন্দোলন কিছু ব্যাখ্যা হাজির করে নির্বাচনি ঐক্য থেকে বেরিয়ে যাবে।”
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিব মাওলানা আহমদ আবদুল কাইয়ুম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “২০১৮ সালে ৩০০ আসনে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলাম। আপিলে একটি আসন বাদ পড়ে, ২৯৯ টি আসনে প্রার্থিতা করেন মনোনীতরা। ২০০৮ সালে ১৬৬ আসনে নির্বাচন করে আমরা ১.৫ পার্সেন্ট ভোট পেয়েছিলাম।”
ইসলামী আন্দোলনের প্রভাবশালী একজন নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, আলোচনায় আসন সমঝোতার বিষয়টি সামনে থাকলেও ‘আরও কিছু কারণ’ রয়েছে, যেগুলো জামায়াতসহ অন্যদের সঙ্গে ঐক্য থেকে বিরত রেখেছে চরমোনাই পীরকে।
ওই নেতার ভাষ্য, কিছুদিন আগে একটি দৈনিক পত্রিকায় জরিপের পর জামায়াতের আমির দলীয়প্রধানদের বৈঠকে জরিপের ফলাফল নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
“জামায়াতের পক্ষ থেকে অন্যদের কোণঠাসা করে ফেলা হয়। একদিকে তারা বিএনপির সঙ্গে জাতীয় সরকারের প্রস্তাব করে। আবার আলাদা জোটের কথাও বলে। তারা আসলে কোন পক্ষে? সরকারেও আছে, বিরোধী দলেও আছে?”
বিকালে অনুষ্ঠেয় সংবাদ সম্মেলনে চরমোনাই পীর রেজাউল করীম এ প্রসঙ্গেও কথা বলতে পারেন বলে আভাস দেন ইসলামী আন্দোলনের প্রচার বিভাগের একজন নেতা।
সূত্র: বিডিনিউজ২৪