শিরোনাম:

মেমোরি চিপ সংকটে চীনের দিকে ঝুঁকছে এইচপি, ডেল, এসার ও আসুস

বদলে যাওয়া তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা

অবশেষে মামলা থেকে স্থায়ী জামিন পেলেন হিরো আলম

চামড়ার জুতা ফেটে যাচ্ছে? যেভাবে যত্ন নেবেন

সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ বাঁচাবেন কী ভাবে?

রাস্তা অবরোধ মানেই জীবনের মৃত্যু

ডেইলি রিপোর্টঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৫, ২০২৬
ইকরাম কবীর

আমরা যখন রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ ও আন্দোলন করি, তখন শুধু গাড়িগুলোকে থামিয়ে রাখি না; মানুষের জীবনও থামিয়ে দিই। সকালবেলা যে মানুষ বেরিয়েছিলেন অফিসের উদ্দেশে, তিনি আটকে গেলেন এবং জানেন না– তিনি গন্তব্যে পৌঁছতে পারবেন কিনা। যে মা সন্তানকে স্কুলে নামিয়ে দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন, তিনি জানেন না তাঁর সন্তান ক্লাস ধরতে পারবে কিনা। অ্যাম্বুলেন্সে শায়িত রোগীর কানে পৌঁছায় না অবরোধকারীদের দাবিদাওয়ার কোনো শব্দ। তিনি এখন জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছেন।

মানুষের এসব জীবন-মরণ সমস্যা আমরা মানুষের চোখ ও মন নিয়ে দেখছি না এবং চিন্তা করছি না।

আমাদের দেশে ‘রাস্তা অবরোধ’ এখন অনিয়মের নিয়মে পরিণত। শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ বিভিন্ন গোষ্ঠী নিজেদের বঞ্চনার কথা বলতে রাস্তায় নামে। তাদের দাবিগুলো একেবারেই অযৌক্তিক মনে করি না। প্রশাসনের গাফিলতির কারণে বছরের পর বছর তারা ভুক্তভোগী। কিন্তু সাধারণ মানুষের সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন এসব দাবির মূল্য দিতে হয় এমন জনকে, যার সঙ্গে সেই সংকটের কোনো সম্পর্কই নেই।

ঢাকার সায়েন্স ল্যাব, টেকনিক্যাল মোড়, বনানী, শাহবাগ– এ নামগুলো এখন আর পাড়া-মহল্লা নয়; আমাদের জন্য আতঙ্ক। সবাই জানে, এসব জায়গায় চলাচল আটকে গেলে ঢাকা শহরের শিরা-উপশিরা বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু মানুষের এই কষ্ট আমাদের কি আর ভাবাচ্ছে না? নাকি এই অস্বাভাবিকতাকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নিয়েছি?

সাত কলেজের শিক্ষার্থীদের ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাদেশের দাবি অনেক দিনের। তারা বলছে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে তারা রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছে। ওদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যু, তারপর তার সহকর্মীদের ক্ষোভে ফেটে পড়াও অস্বাভাবিক নয়। এ দেশে মানুষ যখন ন্যায়বিচার পায় না, তখন রাস্তাই তাদের শেষ ভরসা হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই ভরসার মূল্য যখন সাধারণ মানুষকে দিতে হয়, তখন ন্যায়বিচারের ধারণাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়।

একজন রিকশাচালককে বলতে শুনেছি– ‘আমি দিন আনি, দিন খাই। এক দিন গাড়ি চালাতে না পারলে বাসায় হাঁড়ি চড়ে না।’ দেশে কোটি কোটি মানুষ আছে, যাদের কোনো সঞ্চয় নেই, কোনো বিকল্প নেই। আন্দোলনকারীদের মাইকের উচ্চ স্বর তাদের জীবনে কোনো অর্থ দেয় না।

আমাদের আইন উপদেষ্টা যখন সামাজিক প্রতিরোধের কথা বলেন, তাঁর কথা নিয়েও আমরা ভাবি। সামাজিক প্রতিরোধ মানে কি আরেক দল রাস্তায় নামবে? নাকি আমরা সবাই মিলে বলব– হ্যাঁ, হ্যাঁ; দাবিদাওয়া চালিয়ে যান, কিন্তু আমাদের চলাচল বন্ধ করবেন না? যদি প্রতিটা অবরোধের বিপরীতে আরেকটা প্রতিরোধ দাঁড়িয়ে যায়, এ শহরে কী ঘটতে পারে বলে আপনার মনে হয়?

ঢাকা শহরের চলাচলের বাস্তবতা জটিল। এখানে রাস্তা অপ্রতুল, বিকল্প পথ নেই, পরিকল্পনার অভাব। পরিকল্পনাগুলো আসলে অ- এবং কু-পরিকল্পনা বলেই আমরা সাধারণ মানুষ মনে করি। একটা মোড় বন্ধ করে দিলেই পুরো শহর অচল। এই কাঠামোগত দুর্বলতার সুযোগ নিয়েই রাস্তা অবরোধ সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কিন্তু কার্যকর কার জন্য? অবরোধকারীদের জন্য হয়তো আনন্দদায়ক, কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে অবরোধ এক চরম নিষ্ঠুরতা।

একতরফা দায় কাউকে দেওয়া যাবে না। তবে রাষ্ট্রের দায় অনেক বড়। সময়মতো সিদ্ধান্ত না নেওয়া, প্রতিশ্রুতি দিয়ে চুপ করে থাকা– এসবই মানুষকে রাস্তায় নামতে বাধ্য করে। যদি মন্ত্রণালয় শুরুতেই স্পষ্ট করে জানাত– কবে অধ্যাদেশ হবে, কীভাবে, কেন দেরি হচ্ছে, তাহলে এতবার সাত কলেজের অবরোধ হয়তো হতো না। তেমনি সড়ক দুর্ঘটনার পর দ্রুত বিচার ও দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ থাকলে শ্রমিকরা রাস্তায় বসে থাকত না।

এখানে একটি বিষয় উল্লেখ্য, আন্দোলনের ধরন কি সব সময় এক রকমই হতে হবে? রাস্তা বন্ধ না করে কি প্রতিবাদ করা যায় না? নির্দিষ্ট স্থান, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মানুষের দুর্ভোগ কমিয়ে কি আন্দোলন করা যায় না?

এখন সমাধানের পথ খোঁজা জরুরি। এমন করে মানুষের জীবন চলতে পারে না।

রাষ্ট্রকে একটা সুস্পষ্ট প্রতিবাদ ব্যবস্থাপনা নীতিমালা তৈরির কথা ভাবতে হবে। কোথায়, কখন, কতক্ষণ, কীভাবে প্রতিবাদ করা যাবে, তা আইনের মাধ্যমে নির্ধারণ করা দরকার। এটা দমন নয়– শৃঙ্খলা। রাষ্ট্র প্রতিবাদকে সম্মান করবে। একদিকে প্রতিবাদ হচ্ছে, কিন্তু কর্তাব্যক্তিরা তাকিয়েও দেখছেন না; তা করা যাবে না।
বড় শহরগুলোতে নির্দিষ্ট ‘প্রতিবাদ এলাকা’ থাকতে পারে, যেখানে আন্দোলনকারীরা যা

বেন, সংবাদমাধ্যম থাকবে, তবে জরুরি সড়কগুলো খোলা থাকবে। এতে আন্দোলনও হবে, আমাদের জীবনও চলবে। সংলাপ বাধ্যতামূলক হতে হবে। কোনো দাবিতে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকার আলোচনায় বসতে বাধ্য থাকবে। আলোচনা ব্যর্থ হলে তবেই বড় কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে। জরুরি সেবার জন্য যাতায়াত বাধ্যতামূলক করতে হবে। অ্যাম্বুলেন্স, অগ্নিনির্বাপণ, স্কুলবাস, রপ্তানিমুখী প্রতিষ্ঠান– এগুলো যেন কোনো অবস্থাতেই আটকে না থাকে প্রতিবাদ-বিক্ষোভের কারণে।

তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দরকার মানুষের মানসিকতায়। আমরা কি আন্দোলনকে শুধু চাপ প্রয়োগের কৌশল হিসেবে দেখব, নাকি ন্যায্যতার প্রতিফলন হিসেবে? ন্যায্যতা নিয়ে ভাবলে আমরা কখনও আপামর মানুষদের শাস্তি দেব না।

অবরোধ, আন্দোলন এবং মব সন্ত্রাসে আমরা আজ ক্লান্ত, কিন্তু নির্বাক নই। আমরা বুঝি কার দাবি ন্যায্য, কার নয়। এটাও বুঝি, প্রতিদিন রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা কোনো সমাধান নয়। রাষ্ট্র, আন্দোলনকারী ও সমাজ– এই তিন পক্ষই যদি সাধারণ মানুষের কষ্টকে বুঝতে না শেখে, তাহলে রাস্তা ও জীবন বন্ধ হবে এবং আমরা সবাই পরাজিত হবো।
রাস্তা সবার। প্রতিবাদও সবার অধিকার। কিন্তু এই দুইয়ের সংঘর্ষে যেন বারবার সাধারণ মানুষ হেরে না যায়।

ইকরাম কবীর: কথাসাহিত্যিক
ekabir@gmail.com

সূত্র: সমকাল

পূর্ববর্তী সংবাদ পরবর্তী সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত