শিরোনাম:

মেমোরি চিপ সংকটে চীনের দিকে ঝুঁকছে এইচপি, ডেল, এসার ও আসুস

বদলে যাওয়া তরুণ প্রজন্মের জীবনধারা

অবশেষে মামলা থেকে স্থায়ী জামিন পেলেন হিরো আলম

চামড়ার জুতা ফেটে যাচ্ছে? যেভাবে যত্ন নেবেন

সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ বাঁচাবেন কী ভাবে?

খাদ্য নিরাপত্তায় জিএমও বিতর্ক

ডেইলি রিপোর্টঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৬, ২০২৬
মোহাম্মদ আসিফ চৌধুরী

মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জার এক গল্পে দেখা যায়, দরিদ্র এক ব্যক্তির কাছে কেবল এক টুকরো রুটি ছিল খাদ্য হিসেবে। তিনি রেস্তোরাঁর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সুপের পাত্রের ওপর তার রুটি ধরে রাখলেন, যাতে ঘ্রাণ রুটির সঙ্গে মিশে যায়। রেস্তোরাঁর মালিক এই ‘ঘ্রাণ’ ব্যবহারের জন্য অর্থ দাবি করলে দরিদ্র লোকটি তা দিতে অসমর্থ হন। ফলে রেস্তোরাঁর মালিক কাজির দরবারে ক্ষতিপূরণ মোকদ্দমা করে।

কাজি আর কেউ নন স্বয়ং মোল্লা নাসিরুদ্দিন হোজ্জা। রেস্তোরাঁতে সুপ ছিল, কিন্তু দরিদ্র ব্যক্তির সেই খাদ্য কেনার সক্ষমতা ছিল না। নাসিরুদ্দিন হোজ্জা এই নালিশের অভিনব বিচারিক প্রতিকার দেন। তিনি রেস্তোরাঁর মালিকের কানের কাছে নিজের পকেট থেকে মুদ্রা ঝাঁকিয়ে মুদ্রার শব্দকে সুপের ঘ্রাণের মূল্য হিসেবে প্রদান করেন।

এই গল্পের সূত্র ধরে আমরা অনুমান করতে পারি, প্রাচীনকাল থেকেই বিশ্বে খাদ্য নিরাপত্তা একটি প্রধান সমস্যা। বিশ্বের সব মানুষ পুষ্টিকর খাবার পেটভরে খেতে পায় না। আফ্রিকা ও এশিয়ায় এই সংকট সবচেয়ে বেশি। সব মানুষ সর্বদা তাদের সক্রিয় ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যে শারীরিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রবেশাধিকার পাবেন।

এটাই খাদ্য নিরাপত্তা। সবুজ বিপ্লব থেকে হাইব্রিড যুগ খাদ্য সংকট মোকাবিলায় কৃষি গবেষণা, সেচব্যবস্থা, রাসায়নিক সার ও উন্নত জাতের ধান ব্যবহারের সবুজ বিপ্লবের (১৯৭০-৯০ দশক) ফলে কৃষিতে উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছিল পরিবেশগত সমস্যা– মাটির জৈবগুণের অবক্ষয়, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার ও পানিদূষণ।

বর্তমানে খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়লেও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত হয়নি। বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যাগুলো খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থাকে অনিশ্চিত করে রেখেছে। সবুজ বিপ্লব আমাদের শিখিয়েছে, প্রযুক্তি ব্যবহার করে খাদ্য ঘাটতি মেটানো সম্ভব। হাইব্রিড যুগে কৃষির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বহুজাতিক কোম্পানি, পেটেন্ট ও বিশ্বায়ন। এ অবস্থায় কৃষক একদিকে উৎপাদন বাড়াচ্ছে, অন্যদিকে স্বনির্ভরতা হারাচ্ছে। এই দ্বৈত বাস্তবতা আজকের খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান অন্তরায়।

প্রযুক্তির মাধ্যমে খাদ্য নিরাপত্তা পৃথিবীতে বেগুন, ভুট্টা, পেঁপে, কলা, শসা. ক্যানোলা, সুগারবিট, আপেল, স্ট্রবেরি, বরই, কিশমিশ, তরমুজ, ক্যাপসিকাম, টমেটো, মটরশুঁটি, তুলা, আলু, আনারস, স্যামন মাছ, সয়াবিন ইত্যাদি জিএমও। এ ছাড়া গোলাপ, পিটুনিয়াসহ বিভিন্ন ফুল, তামাকসহ আরও কিছু গাছকে জেনেটিক্যালি মডিফাই করা হয়েছে। বিশ্বে বিশেষ করে আমেরিকায় মুরগি, গরু, শূকর, স্যামন ও অন্যান্য মাছকে জিএমও খাদ্য খাওয়ানো হয়।

১৯৮০ সালে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট জিএমও পেটেন্ট করার অনুমতি দিলে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো জিএমও গবেষণায় প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করে। বাণিজ্যিকভাবে জিএমও প্রথম উৎপাদন শুরু হয় ১৯৯৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল, চীন, ভারত– এই ছয়টি দেশেই জিন রূপান্তরিত খাদ্য যেমন সয়াবিন, ভুট্টা, সুগারবিট, শসা, পেঁপে, আলু, ক্যানোলা, টমেটো, ধান ইত্যাদির উৎপাদন ও কেনাবেচা শুরু হয়।

২০০৮ সালে সারাবিশ্বে উৎপাদিত শস্যের প্রায় ৯% ছিল জিএমও। জেনেটিক্যালি মডিফায়েড অর্গানিজম প্রযুক্তিতে জিনগত বা বংশাণু প্রকৌশলের মাধ্যমে জীবের ডিএনএ পরিবর্তন করে নতুন বৈশিষ্ট্য যোগ করা হয়। কৃষিতে উচ্চ ফলন, রোগ ও পোকামাকড় প্রতিরোধ ক্ষমতা (বিটি ফসল) এবং পুষ্টির মান বৃদ্ধির (গোল্ডেন রাইস) ক্ষেত্রে এর ব্যবহার রয়েছে।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে ইনসুলিন ওষুধ উৎপাদনেও এই প্রযুক্তির ব্যবহার হয়। তবে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি, পরিবেশগত প্রভাব এবং কৃষকের অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ও বিতর্ক রয়েছে। করপোরেট বিজ্ঞানীরা অধিকাংশ জিএমওকে নিরাপদ মনে করলেও এর বাণিজ্যিকীকরণে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত প্রভাবের মূল্যায়ন প্রয়োজন।

পরিবেশ ও নৈতিক প্রশ্ন জিন-পরিবর্তিত ফসল পরিবেশে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাব ফেলতে পারে। যেমন– বন্য প্রজাতির সঙ্গে জিনের মিশ্রণ, জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি বা কোম্পানির হাতে কৃষকের নির্ভরতা। গবেষকরাই জোর দিয়ে বলছেন, জিএমও প্রযুক্তির ঝুঁকি মূল্যায়ন শুধু পরীক্ষাগার বা স্বল্পমেয়াদি ফলাফলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না।

দীর্ঘ মেয়াদে মানুষের স্বাস্থ্য, মাটি ও পরিবেশের ওপর প্রভাব এবং প্রাকৃতিক ফসলে জিন প্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। অন্যপক্ষে বিগত আমলের অপশাসনের সরকারি মুখপাত্রদের যুক্তি– যদি নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ঠিকভাবে হয়, তাহলে জিএমও আমাদের খাদ্য নিরাপত্তায় টেকসই সমাধান দিতে পারে।

প্রশ্নটা তাই প্রযুক্তির নয়; এর ব্যবহার ও নৈতিক ব্যবস্থাপনার। খাদ্য নিরাপত্তা কেবল উৎপাদনের নয়, ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্ন। যখন কৃষক, প্রযুক্তি ও প্রকৃতি একসঙ্গে কাজ করবে, তখনই টেকসই খাদ্য নিরাপত্তা সম্ভব। প্রযুক্তি তখনই আশীর্বাদ, যখন এটি মানুষের খাদ্যের অধিকার রক্ষা করবে এবং প্রকৃতির সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রাখবে।

মোহাম্মদ আসিফ চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, রাজনীতি ও প্রশাসন বিভাগ, গণ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র: সমকাল

পূর্ববর্তী সংবাদ পরবর্তী সংবাদ
সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত