মঙ্গলবার , ২৭ জানুয়ারি ২০২৬ | ২২শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. উদ্যোক্তা
  6. খুলনা
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চট্টগ্রাম
  10. চাকরি
  11. জাতীয়
  12. ঢাকা
  13. তথ্য প্রযুক্তি
  14. ধর্ম
  15. নারী ও শিশু

মানবাধিকার সাদ্দামের প্যারোল বঞ্চনা এবং প্রশাসনের অমানবিকতা

প্রতিবেদক
শিরোনাম ২৪
জানুয়ারি ২৭, ২০২৬ ৯:২৮ পূর্বাহ্ণ

যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি বাগেরহাটের ছাত্রলীগ নেতা জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও ৯ মাসের শিশুসন্তানের মর্মান্তিক মৃত্যু নিছক পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভেতরে মানবিকতা ও আইনের অবস্থান নিয়েও গভীর প্রশ্ন তুলেছে। একজন বন্দি শেষবারের মতো তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে বিদায় জানাতে পারবেন কিনা– এ প্রশ্নে রাষ্ট্র যেভাবে দায় এড়ানো ও পরস্পরবিরোধী বক্তব্যের আশ্রয় নিয়েছে, তা সাধারণ নাগরিকদের জন্য স্বস্তিকর নয়।

বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম সূত্রে জানা যাচ্ছে, সরকার ও যশোর জেলা প্রশাসন দাবি করেছে– সাদ্দামের পরিবার প্যারোলে মুক্তির জন্য আবেদনই করেনি। অথচ বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক স্বীকার করেছেন, পরিবার তাঁর কাছে গিয়েছিল এবং প্যারোল বিষয়ে কথা বলেছিল। শোকাহত পরিবারের সদস্যরা ছুটির দিনে জেলা প্রশাসকের বাংলোতে গিয়ে লিখিত আবেদন জানানো সত্ত্বেও যদি সেটি ‘আবেদন’ হিসেবে বিবেচিত না হয়, তবে প্রশ্ন উঠতেই পারে– রাষ্ট্র কি কেবল প্রশাসনিক আনুষ্ঠানিকতাকে ঢাল বানিয়ে মানবিক দায়িত্ব এড়িয়ে যেতে পারে?

ঘটনাটি নিছক প্রশাসনিক ‘যোগাযোগ বিভ্রাট’ নয়; প্রশাসনিক পদক্ষেপের ব্যর্থতা। সর্বোপরি রাষ্ট্রের পদস্থ ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিষ্ঠুরতার দৃষ্টান্ত, যেখানে একজন বন্দির ন্যূনতম সাংবিধানিক ও মানবিক অধিকারকে পদ্ধতিগতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদ আইনের দৃষ্টিতে সমতার নিশ্চয়তা দেয় এবং ৩৫ অনুচ্ছেদ ন্যায়বিচারের অধিকার নিশ্চিত করে। একজন বন্দি হলেও তিনি সংবিধানের বাইরে নন। বন্দিত্ব মানে কেবল চলাচলের সীমাবদ্ধতা, মানবিক মর্যাদা বা পারিবারিক সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন করা নয়। স্ত্রী ও সন্তান হারানোর মতো চরম পরিস্থিতিতে একজন বন্দিকে শেষবারের মতো জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দেওয়া সংবিধানসম্মত ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক।

বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদে (আইসিসিপিআর) স্বাক্ষরকারী। এই সনদের বিধান রাষ্ট্রের জন্য ঐচ্ছিক নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইনি বাধ্যবাধকতা। সনদটির ১০(১) অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে– ‘স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত প্রত্যেক ব্যক্তিকে মানবিকতা ও মানুষের সহজাত মর্যাদার প্রতি পূর্ণ সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে আচরণ করতে হবে।’ সাদ্দামের ক্ষেত্রে এই বিধান কতটা প্রতিপালিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যুর মতো চরম ও হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে একজন বন্দিকে জানাজা ও দাফনে অংশ নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে মাত্র কয়েক মিনিটের জন্য কারা ফটকে মরদেহ দেখানো কি মানবিক আচরণের সংজ্ঞার মধ্যে পড়ে? নাকি এটি প্রশাসনের দায়সারা আনুষ্ঠানিকতা মাত্র?

আমাদের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ১ জুন যে প্যারোল সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করেছে, সেখানে স্পষ্টভাবে বলা আছে– নিকটাত্মীয়ের মৃত্যু, জানাজা বা দাফনের মতো ক্ষেত্রে মানবিক বিবেচনায় প্যারোল দেওয়া যেতে পারে। এই নীতিমালার আলোকে প্রশ্ন উঠছে– স্ত্রী ও শিশুসন্তানের মৃত্যু কি ‘বিশেষ মানবিক’ পরিস্থিতি নয়?
জেলা প্রশাসক ও কারা কর্তৃপক্ষ চাইলে দ্রুত সমন্বয়ের মাধ্যমে সাদ্দামের প্যারোলের ব্যবস্থা করতে পারত না? নিশ্চয় পারত। কিন্তু ইচ্ছার অভাব, দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা এবং খুব সম্ভবত রাজনৈতিক পরিচয়ের বিবেচনা এই মানবিক সিদ্ধান্তকে আটকে দিয়েছে।

বাংলাদেশে এর আগেও অহরহ মানবিক বিবেচনায় প্যারোল দেওয়া হয়েছে। ২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি বিএনপি নেতা শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাস প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মায়ের জানাজায় অংশ নেন। গত ১৬ জানুয়ারি চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতা মাহফুজুল হক তাঁর মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান। ২০২৫ সালের ১৯ জুন গাজীপুরের শ্রীপুরে মাওনা ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম রিপন মায়ের জানাজায় অংশ নেওয়ার জন্য প্যারোলে মুক্তি পান। এ ধরনের নজির যখন রাষ্ট্র নিজেই তৈরি করেছে, তখন সাদ্দামের ক্ষেত্রে ভিন্ন মানদণ্ড কেন?

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও প্যারোল-বিষয়ক বিস্তর উদাহরণ রয়েছে। ভারতে রাজীব গান্ধী হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত নলিনী শ্রীহরণকেও ২০১৯ সালে প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল কন্যার বিয়ের প্রস্তুতি ও অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য। এখানে অপরাধের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত, তবু ভারতীয় রাষ্ট্র ও বিচার ব্যবস্থা এই বাস্তবতাকে স্বীকার করেছে– প্যারোল শাস্তির অবসান নয়; মানবিকতার সাময়িক স্বীকৃতি।

জুয়েল হাসান সাদ্দামের ঘটনায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কারও দায় নিতে না চাওয়া। বাগেরহাট জেলা প্রশাসন বলছে, যশোরের দায়িত্ব। যশোর বলছে, আবেদনই হয়নি। কারা কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘আমাদের এখতিয়ার নেই’। এই ‘নো ম্যানস ল্যান্ড’-এর মাঝখানে পড়ে গেল একটি পরিবার, একটি জীবন ও একটি শেষ বিদায়।

সাদ্দামের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্রের অমানবিকতা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, বাংলাদেশে বন্দিদের মানবাধিকার এখনও অনেকাংশে প্রশাসনিক সদিচ্ছানির্ভর। অথচ সংবিধান, আন্তর্জাতিক সনদ, রাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিমালা– সবই বলছে, মানবিকতা কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি অধিকার। এই অধিকার রক্ষায় ব্যর্থতার দায় জেলা প্রশাসন, কারা কর্তৃপক্ষ, সংশ্লিষ্ট সরকারি মহল– কেউই এড়াতে পারে না। ন্যায়বিচার কেবল আদালতের রায়ে নয়, রাষ্ট্রের আচরণেও প্রতিফলিত হতে হয়। সাদ্দামের ঘটনায় সেই ন্যায়বিচার ব্যর্থ হয়েছে– এটাই এই হৃদয়বিদারক ঘটনার সবচেয়ে কঠিন উপলব্ধি।

আবু আহমেদ ফয়জুল কবির: মানবাধিকারকর্মী

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ - অন্যান্য