
একটি বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ অংশ নিতে না পারলেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘাটতি হচ্ছে না। গণঅভ্যুত্থানের পর যারা মাঠে আছে, তাদের মধ্যে বিভিন্ন ইস্যুতে বিভক্তি দেখা দিতে সময় লাগেনি। নির্বাচন সামনে রেখে তাদের একাধিক পক্ষে বিভক্ত হতেও দেখা গেল। রাজনৈতিক-আদর্শগত প্রশ্নেও ভিন্নতা কম পরিলক্ষিত নয়। এ অবস্থায় আগের মতো ‘পাতানো নির্বাচন’ অন্তত হচ্ছে না। পাতানো নির্বাচনে ভোটারের সামনে সত্যিকার বিকল্প থাকে না বলে এর আকর্ষণও থাকে না।
নির্বাচন সবচেয়ে আকর্ষণীয় হয় তখন, যখন অন্তত দুটি রাজনৈতিক পক্ষ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে ওঠে। আমাদের মতো দেশে সরকার ও নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী কিনা, সেটাও দলগুলোর বড় বিবেচ্য। কোনো পক্ষ জয়ের ব্যাপারে পুরো আশাবাদী না হলেও নির্বাচনে আগ্রহের সঙ্গে অংশ নেবে, যদি নিশ্চয়তা পায় তার প্রাপ্যটুকু অর্জন বিষয়ে। এবারের নির্বাচনে এসব ক্ষেত্রে পরিস্থিতি নেতিবাচক নয়। প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ বিষয়ে প্রশ্ন তুললেও কারও আপত্তিই কিন্তু জোরালো নয়।
যারা বিজয়ী হবে বলে বেশির ভাগের ধারণা, সেই বিএনপি যে কোনো পরিস্থিতিতে নির্বাচনে ইতিবাচক থাকবে– এটাই স্বাভাবিক। অপর পক্ষ জামায়াতে ইসলামী রীতিমতো জোট গঠন করে জোরেশোরে নির্বাচনে নেমেছে। সত্যি বলতে, অনেক আগে থেকেই তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তোলার। সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দেরিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানে আগ্রহী হলেও তারা এতে অনাগ্রহী ছিল না। দিনক্ষণ স্থির হওয়ার পর তারা নির্বাচন নিয়ে বড় দ্বিমত করেনি।
যথানিয়মে নির্বাচনে এসে কর্মী-সমর্থকদের মাঝে এমন আশাবাদও জাগিয়ে তুলেছে– এবারই তারা ক্ষমতায় আসবে। রাষ্ট্রক্ষমতায় আসতে চাওয়া দোষের কিছু নয়। গণতন্ত্রে এটাই বরং স্বাভাবিক। এ ক্ষেত্রে শর্ত একটাই– নির্বাচন হতে হবে নিরপেক্ষ। এটা স্বচ্ছ বলেও প্রতিভাত হতে হবে।
প্রস্তুতি দৃশ্যমান না হলেও অন্তর্বর্তী সরকার বলেই যাচ্ছে, ‘ইতিহাসের সেরা’ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। মাঠে থাকা সব দলের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ থাকলেও নির্বাচনের প্রধান অংশীজন ভোটারের কতটা অংশগ্রহণ এতে থাকবে, সে বিষয়ে অবশ্য এখনও সংশয় রয়ে গেছে। নির্বাচনের সঙ্গে এবার যে গণভোট হতে যাচ্ছে; পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকলেও তাতে ভোটারের অংশগ্রহণ বেশি করে কমে যেতে পারে। সরকার নিজে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও ভোটারের মনোভাব বোঝা যাচ্ছে না।
সংস্কার আলোচনায় থাকা দলগুলোর অবস্থানও সুস্পষ্ট নয়। তবে ভোটারের অংশগ্রহণ কম হলেও নির্বাচন কিংবা গণভোট, কোনোটাই আইনত অগ্রহণযোগ্য হবে না। ‘রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা’র প্রশ্ন অবশ্য থাকবে। গণঅভ্যুত্থানের পর অনুষ্ঠেয় নির্বাচনটি ভোটারের বিপুল অংশগ্রহণে ধন্য না হলে একটা অপূর্ণতা কিংবা অস্বস্তি থেকেই যাবে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।
সরকার ও ইসির দায়িত্ব– শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নিরপেক্ষ থাকা এবং সেটা অব্যাহতভাবে প্রদর্শন; দুই, নির্বাচনের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে সামর্থ্যের পুরোটা ব্যয় করা। পুলিশের অবস্থা তো কারও অজানা নয়। আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার ও সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে অগ্রগতি সন্তোষজনক নয়। এমন পরিস্থিতিতে ভোটাররা কতটা স্বস্তি বোধ করবেন, সেটা সহজে বোধগম্য। এ অবস্থায় সেনা সদরদপ্তরে গিয়ে প্রধান উপদেষ্টা সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের উদ্দেশে যেভাবে দায়িত্ব পালনের আহ্বান জানিয়েছেন, তার পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন হতে হবে।
গণঅভ্যুত্থানের সময় থেকে মাঠে থাকা সেনাবাহিনীর ভূমিকা অবশ্য সংযত। বিতর্ক এড়িয়ে তারা সরকারকে সহায়তা জোগাচ্ছে, নানা উস্কানির মধ্যেও। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন অনুষ্ঠানে তাদের এখন বলিষ্ঠ ভূমিকা নিতে হবে। নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর পর্যন্ত মাঠে তাদের উজ্জ্বল উপস্থিতির বিকল্প নেই।
মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই, নির্বাচনী আচরণবিধি প্রয়োগের মতো ক্ষেত্রে ইসির ভূমিকা নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। মনোনয়ন প্রদানে রাজনৈতিক দলগুলোও সুনাগরিকের প্রত্যাশা পূরণ করেনি। এসব দিক থেকে গতানুগতিক নির্বাচনই হতে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও এ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশ গণতন্ত্রের দিকে যাবে বলে প্রত্যাশা। তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচনের পর একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের অভিজ্ঞতা হবে জনগণের– এটা কম নয়।
ভোটারের এক-তৃতীয়াংশই তরুণ বলে বিবেচিত। তাদের রাজনৈতিক মনোভাব অনেকটাই অজানা। এ কারণেও নির্বাচনটি আকর্ষণীয়। বয়স্ক ভোটারদেরও বড় অংশ বিগত তিনটি নির্বাচনে অংশগ্রহণের আগ্রহ পায়নি। সরকার ও ইসির দায়িত্ব– এই নির্বাচনে জনগণের সব পক্ষের আগ্রহ ধরে রাখা।
পাশাপাশি গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী সব পক্ষের দায়িত্ব শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ধরে রাখার। ক্ষমতাচ্যুত দল ও তাদের সমর্থকরা নির্বাচন বানচাল করতে চাইবে কিনা; চাইলেও সামর্থ্য রয়েছে কিনা– তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। তবে সরকার ও মাঠে থাকা দলগুলো সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে একমত থাকলে গোলযোগ সৃষ্টির সুযোগ কমবে। ক্ষমতাচ্যুত পক্ষ এমনটিও মনে করতে পারে, বিদ্যমান পরিস্থিতির চাইতে একটি নির্বাচিত সরকারের শাসনামল তাদের জন্য কিছুটা হলেও অনুকূল হবে।
তবে নির্বাচন কেমন হবে, সেটা বহুলাংশে নির্ভর করে সরকার ও মাঠে থাকা দলগুলোর ওপর। বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণ বিষয়ে আগ্রহী পশ্চিমাদের সমর্থনও বড় বিষয়। ইতিবাচক দিক হলো, সেনাবাহিনী শুরু থেকেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পক্ষে। এ কাজে সহায়তা করে দ্রুত ব্যারাকে ফেরার বিষয়ে আগ্রহের কথা তারা জানিয়েছে বারবার। দেশরক্ষা বাহিনীকে দীর্ঘদিন ব্যারাকের বাইরে রাখাটা নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরাও ইতিবাচকভাবে দেখছেন না।
ফলাফলের কিছুটা হলেও অনিশ্চয়তা যে কোনো নির্বাচনের বড় আকর্ষণ। এবারের নির্বাচনে সেটা থাকছে। যাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা কম, তাদের কিন্তু সম্ভাবনা রয়েছে বড় বিরোধী দল হিসেবে আত্মপ্রকাশের। প্রথমবারের মতো তারা এ সুযোগ লাভ করেছে গণঅভ্যুত্থানের বদৌলতে। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে তারা এবার রয়েছে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায়। কিছু কৌশলের আশ্রয় নিয়ে গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর সুযোগও পেয়েছে তারা। নির্বাচন বিলম্বিত হওয়াও তাদের জন্য ইতিবাচক হয়েছে।
এর সুফল পেতে হলে তাদের কিন্তু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পথেই থাকতে হবে। গোলযোগপূর্ণ নির্বাচন বরং অধিকতর শক্তিশালী দলের পক্ষে চলে যেতে পারে। এতে অবশ্য গণতন্ত্রে উত্তরণটাই কলুষিত হবে। আর মাঠে থাকা দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সম্পর্কের অধিকতর অবনতি ঘটবে এতে। রাজনীতিতে হাজির হবে নতুন মেরূকরণ, যাতে ক্ষমতাচ্যুত পক্ষও ভূমিকা গ্রহণের সুযোগ পাবে। এটা সম্ভাব্য বিরোধী দলটির জন্য ইতিবাচক কিছু না হয়ে বরং স্থায়ী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে হাজির উভয় পক্ষেরই উচিত হবে নিজেদের জন্য অসাধারণ এ সুযোগ কাজে লাগানো। সামনে তো আরও নির্বাচন হবে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন রাষ্ট্র সংস্কারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণের সুযোগও করে দিচ্ছে। এ অবস্থায় পরাজয়কে সহজভাবে গ্রহণের মানসিকতা প্রদর্শনও কঠিন কিছু নয়।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
সূত্র: সমকাল