বৃহস্পতিবার , ২৯ জানুয়ারি ২০২৬ | ২৩শে মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
  1. অন্যান্য
  2. অর্থনীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. উদ্যোক্তা
  6. খুলনা
  7. খেলাধুলা
  8. গণমাধ্যম
  9. চট্টগ্রাম
  10. চাকরি
  11. জাতীয়
  12. ঢাকা
  13. তথ্য প্রযুক্তি
  14. ধর্ম
  15. নারী ও শিশু

আমলা-মন্ত্রীর আবাসন: বিশ্ব বনাম বাংলাদেশ

প্রতিবেদক
শিরোনাম ২৪
জানুয়ারি ২৯, ২০২৬ ৯:২৬ অপরাহ্ণ

ঢাকার মন্ত্রিপাড়ায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী এবং সাংবিধানিক সংস্থার প্রধানদের জন্য তিনটি বহুতল ভবনে ৭২টি ফ্ল্যাট নির্মাণের উদ্যোগের খবর সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন হবে আট হাজার ৫০০ থেকে ৯ হাজার ৩০ বর্গফুট এবং পুরো প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৮৬ কোটি টাকা।

ভবনগুলোতে থাকবে সুইমিংপুল, জিমনেশিয়াম, কমিউনিটি স্পেস, বিলাসবহুল আসবাব ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা। যদিও বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান জানিয়েছেন, এ ধরনের কোনো প্রস্তাব এখনও উপদেষ্টা পরিষদের সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত কমিটির সামনে ‘আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন’ করা হয়নি।

সংবাদমাধ্যমে যেভাবে চিত্র ও তথ্যসহ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে তাতে বোঝা যায় ক্রয়সংক্রান্ত কমিটিতে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপিত না হলেও প্রশাসনিক পর্যায়ে এমন একটি পরিকল্পনার অস্তিত্ব রয়েছে। আর এখান থেকেই রাষ্ট্রের অগ্রাধিকার, রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও ক্ষমতার দর্শন নিয়ে গভীর প্রশ্ন আকারে সামনে আসে।

সরকারি আবাসন পরিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় মন্ত্রীদের বসবাসের জন্য বর্তমানে ৭১টি বাংলো ও ফ্ল্যাট রয়েছে। মন্ত্রিপাড়ায় আছে ১৫টি বাংলোবাড়ি, বেইলি রোডে তিনটি ভবনে রয়েছে ৩০টি ফ্ল্যাট, প্রতিটির আয়তন সাড়ে পাঁচ হাজার বর্গফুট। গুলশান ও ধানমন্ডিতেও মন্ত্রীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা রয়েছে। অর্থাৎ বাস্তবে মন্ত্রীদের আবাসনের কোনো সংকট নেই।

এমন বাস্তবতায় নতুন করে ৭২টি বিশাল আকৃতির ফ্ল্যাট নির্মাণের প্রশাসনিক উদ্যোগ কেন নেওয়া হচ্ছে সে প্রশ্নটি এড়ানো যায় না। শোনা যায়, এমন প্রকল্পে বেশি আগ্রহী আমলাদের একাংশ। কারণ মন্ত্রীরা নতুন ভবনে উঠলে বর্তমানে ব্যবহৃত বড় ফ্ল্যাটগুলো তাদের জন্য উন্মুক্ত হবে। ফলে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে এটি কেবল আবাসন প্রকল্প নয়, এটি ক্ষমতার ভেতরের পুনর্বণ্টনের এমন এক রাজনীতি যেখানে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ব্যবস্থাপনা ক্রমশ আমলাতান্ত্রিক সুবিধা বৃদ্ধির যন্ত্রে পরিণত হয়।

প্রকাশিত সংবাদের সূত্রে সামাজিক মাধ্যমে ফ্ল্যাটের আয়তন নিয়ে অনেকে কথা বলছেন। যেখানে সরকারের নিম্নপদের কর্মচারীরা পান ৬৫০ বর্গফুটের বাসা সেখানে মন্ত্রীদের জন্য ৯ হাজার বর্গফুটের ফ্ল্যাট মানে সাধারণ মানুষের বাসস্থানের থেকে চৌদ্দ গুণ বড় আয়তন যা এমন রাজনৈতিক বার্তাও দেয় যেখানে রাষ্ট্র নিজেই যেন শ্রেণিভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি ঘোষণা করছে যা সামাজিক বৈষম্যকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতায় বাংলাদেশের এই উদ্যোগ আরও স্পষ্টভাবে মূল্যায়ন করা যায়। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পর শ্রীলঙ্কা সরকারি ব্যয়ে বড় ধরনের কাটছাঁট করেছে। মন্ত্রীদের জন্য বিলাসবহুল আবাসন প্রকল্প বাতিল করা হয়েছে এবং সরকারি বাসভবনের আয়তন নামিয়ে আনা হয়েছে দুই থেকে সাড়ে তিন হাজার বর্গফুটে। শ্রীলঙ্কার নীতিনির্ধারকরা প্রকাশ্যেই স্বীকার করেছেন, অর্থনৈতিক বিপর্যয় তাদের শিখিয়েছে যে রাজনৈতিক বিলাসিতা রাষ্ট্রের জন্য কতটা আত্মঘাতী হতে পারে।

অন্যদিকে ভারতে দিল্লির ঐতিহাসিক লুটিয়েন্স এলাকার পুরোনো বাংলোগুলো আকারে বড় হলেও নতুন বরাদ্দের ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবনের আয়তন তিন থেকে পাঁচ হাজার বর্গফুটে সীমাবদ্ধ। কেরালা, পশ্চিমবঙ্গ ও তামিলনাডুসহ একাধিক রাজ্যে মুখ্যমন্ত্রীরা তুলনামূলক সাধারণ সরকারি বাসভবনে বসবাস করেন। পাকিস্তানেও বেশির ভাগ মন্ত্রী পুরোনো সরকারি বাসভবন বা গেস্টহাউসে বসবাস করেন যার গড় আয়তন আড়াই থেকে চার হাজার বর্গফুট। নেপাল ও ভুটানে মন্ত্রীদের সরকারি বাসভবন আরও ছোট। দেড় হাজার থেকে তিন হাজার বর্গফুট।

ইউরোপ ও আমেরিকার দিকে তাকালে আমাদের আমলা ও মন্ত্রীদের লজ্জাই পেতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রে মন্ত্রীদের জন্য সরকারি আবাসন কমপ্লেক্স নেই; অধিকাংশই সাধারণ অ্যাপার্টমেন্টে বসবাস করেন। রাষ্ট্র শুধু নিরাপত্তা ও পরিবহন সুবিধা দেয়। যুক্তরাজ্যেও একই চিত্র। প্রধানমন্ত্রী ১০ ডাউনিং স্ট্রিটে থাকলেও অন্য মন্ত্রীরা নিজস্ব বা ভাড়া ফ্ল্যাটে বসবাস করেন। জার্মানি, কানাডা ও স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলোতে মন্ত্রীরা সাধারণ নাগরিকদের মতোই জীবনযাপন করেন। নরওয়ে, সুইডেন ও ফিনল্যান্ডে অনেক মন্ত্রী গণপরিবহন ব্যবহার করেন, নিজের বাজার নিজে করেন।

এই আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের এমপি, মন্ত্রী, সচিবরা যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে সরকারি বাসভবনে থাকেন সেটা শুধু ব্যতিক্রমী নয় বরং এক ধরনের রাজনৈতিক পশ্চাৎ-মুখিতা। এটি সেই মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ যেখানে রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে রাজকীয় আরামের উৎস হিসেবে দেখা হয়, জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হিসেবে নয়।

এই ধরনের প্রকল্পের চিন্তা করার আগে এই অর্থ দিয়ে হাজারো ভূমিহীন পরিবারকে টেকসই আবাসন দেওয়ার কথা ভাবা দরকার। এখানেই রাজনৈতিক দর্শনের প্রশ্নটি অনিবার্য হয়ে ওঠে। ইউরোপ ও আমেরিকায় রাষ্ট্রের দর্শন হলো: রাষ্ট্র মন্ত্রীর জীবন সহজ করবে কিন্তু বিলাসী করবে না। ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত থাকবে দায়িত্ব, সংযম ও জবাবদিহিতা। আর আমাদের দেশের চর্চা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় রাষ্ট্র মন্ত্রীর জীবন রাজকীয় করবে।

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্ত পাওয়ার যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটার প্রতিফলন রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শনে থাকতে হবে। পূর্বের সাথে বর্তমান ও আগামীর পার্থক্য গড়তে হবে নৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে মন্ত্রীদের হতে হবে জনগণের প্রথম সারির সেবক। তাদের জীবনযাপন হতে হবে সাধারণ মানুষের কাছাকাছি এবং সামাজিক দায়বদ্ধতায় পরিপূর্ণ।

যারাই আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় যাক তারা যদি এই বোধকে ধারণ করতে পারে তবেই উন্নয়ন ভবন, সেতু ও রাস্তার গণ্ডি পেরিয়ে আস্থা, ন্যায় ও ন্যায্যতা এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তির ওপর দাঁড়াতে পারবে। রাষ্ট্রের শক্তি তখন শাসকের আরামে নয়, জনগণের বিশ্বাসে জায়গা করে নেবে।

মোহাম্মদ গোলাম নবী: কলাম লেখক; প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক, রাইট টার্ন

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ - অন্যান্য