ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দোরগোড়ায়। রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীরা যার যার সাধ্যমতো ভোটারদের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন। যে সময় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি ও ইশতেহার নিয়ে অংশীজনসহ সকলের আলোচনা জরুরি, তখন দেশজুড়ে রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার ও নারীর অবস্থান নিয়ে তুমুল বাদ-প্রতিবাদ চলছে। দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ায় নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এ অবস্থায় আরেক প্রধান দল বিএনপির সঙ্গে সুদীর্ঘকালের সখ্য ছিন্ন করে জামায়াত সব ইসলামী দলের ভোট এক বাক্সে নিয়ে আসবার পরিকল্পনা করেছিল। ইসলামী আন্দোলনসহ ১১ দলীয় জোটের মাধ্যমে বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেষ্টা করেছিল। একপর্যায়ে আসন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে ইসলামী আন্দোলন জোট থেকে বেরিয়ে এককভাবে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন দেয়। প্রার্থী সংখ্যার দিক থেকে একক দল হিসেবে বিএনপির পরই তাদের অবস্থান।
ইসলামী আন্দোলন আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ জানায়, জামায়াত পথভ্রষ্ট হয়েছে বলে তারা জোট ছিন্ন করেছে। তাদের অভিযোগ, শরিয়া আইনের বদলে প্রথাগত আইনি পদ্ধতিতেই জামায়াত দেশ পরিচালনা করতে চায়। অবশ্য জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান আলজাজিরার সঙ্গে সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেছেন– তাঁর দল একবারে নয়, ধাপে ধাপে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন করবে।
সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন, মাদক থেকে যেমন একবারে মুক্ত করা সম্ভব নয়, ধাপে ধাপে সুস্থ করতে হয়, সেভাবেই ধীরে ধীরে শরিয়া আইন বাস্তবায়ন হবে। একই সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, জামায়াতের আমির পদে কখনোই কোনো নারী দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না।
জুলাই সংস্কার প্রস্তাবনায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিটি দল থেকে কমপক্ষে ৫ শতাংশ নারীর মনোনয়ন প্রদানের অঙ্গীকারের কথা থাকলেও কোনো দলই তা বাস্তবায়ন করেনি। জামায়াত বা ইসলামী আন্দোলন; কেউই কোনো নারী প্রার্থীকে মনোনয়ন দেয়নি। তবে জামায়াতের নির্বাচনী প্রচারণায় তাদের নারী কর্মীরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন; বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন।
এদিকে গত শনিবার রাতে জামায়াতের আমিরের অফিসিয়াল এক্স হ্যান্ডলে প্রকাশিত নারীর অধিকার ও কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ সংক্রান্ত একটি পোস্টে ‘আপত্তিকর শব্দ’ ব্যবহারের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সমালোচনা চলছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে প্রথমে অ্যাকাউন্ট হ্যাকের দাবি করা হলেও পরে দলটি জানিয়েছে, ডিভাইসের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল সংঘবদ্ধ চক্র (সমকাল, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)। জামায়াতের যুক্তি মেনে নিয়েই সংশয় প্রকাশ করা যায়, সংঘবদ্ধ চক্র নারী ইস্যুতে একটিমাত্র পোস্ট দিয়ে পরবর্তী ৯ ঘণ্টার জন্য নিঃশব্দ হয়ে গেল!
আর কোনো কিছুতেই হ্যাকারদের বলবার মতো বাক্য ছিল না! উপরন্তু জামায়াত হ্যাকারদের কর্মকাণ্ডে এই পোস্ট লিখিত হয়েছে জানালেও পোস্টের কোন কোন বক্তব্যে তাদের আপত্তি; জানায়নি। নিশ্চয়ই কর্মজীবী নারীদের নিয়ে জঘন্য শব্দে তাদের আপত্তি; তবে নারী নেতৃত্ব ও কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গে জামায়াতের অবস্থান পোস্টে প্রদত্ত বক্তব্যের সমান্তরাল। জামায়াতের আমির পূর্বাহ্ণেই তা আলজাজিরার সঙ্গে আলাপে পরিষ্কার করেছেন।
২.
ধর্মভিত্তিক রাজনীতিচর্চায় নারী-পুরুষের অধিকারসহ মৌলিক বিভিন্ন চাহিদা সমাজে কীভাবে পরিপূরণ করা হবে, তা নানামাত্রিক আলোচনার সূচনা করে। রাষ্ট্র ইহলৌকিক প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্রের কাছে জনসাধারণের চাহিদাও সংগত কারণে ইহজাগতিক ও সমকালীন বিবেচনাবোধজাত। রাষ্ট্র কোনো নাগরিকের পারলৌকিক সুখের জন্য কাজ করে না। সকল নাগরিক রাষ্ট্র থেকে সমান অধিকার ও সুবিধা পাওয়ার যোগ্য। নারী-পুরুষ, ধর্ম-বর্ণ-পেশা নির্বিশেষে এটিই মানবিক রাষ্ট্রের ন্যূনতম বৈশিষ্ট্য। সেখানে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিতে নাগরিকদের মধ্যে লিঙ্গভিত্তিক বিভাজনের চেষ্টা অবশ্যই নাগরিক অধিকার হরণের শামিল।
সাম্প্রদায়িক বা ধর্মভিত্তিক রাজনীতি পৃথিবীর নানা দেশসহ আমাদের সমাজে বহু বছর যাবৎ ক্রিয়াশীল। প্রাচীন মিসর থেকে গত শতকের পাকিস্তান-ভারত বিভাজন কিংবা নানা সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক ক্ষমতাকে বৈধ করবার উপায় হিসেবে দৈব বিশ্বাসকে সামনে দাঁড় করানো হয়েছে। পৃথিবীর যেখানেই ধর্মকে রাজনৈতিক অভীষ্ট উপায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, সেখানেই নর-নারী কিংবা মত-পথের মানুষ নির্বিশেষে রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে। ধর্মাশ্রিত গোষ্ঠী জনসমক্ষে নারীর উপস্থিতি প্রত্যাশা করে না। সে কারণে আইন করেই নারীর ঘরবন্দি তারা নিশ্চিত করে। আফগানিস্তানে তালেবান শাসন এর প্রকৃষ্ট ও সমকালীন উদাহরণ। সে দেশে ১২ বছর পেরোনোর পর মেয়েদের জন্য স্কুল নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কর্মক্ষেত্রে তাদের প্রবেশাধিকার শূন্যের কোঠায় পৌঁছেছে।
৩.
সমাজে বহুমত থাকবে। নির্বিঘ্নে মতপ্রকাশের পরিসর গণতন্ত্রে প্রয়োজন। আর এ কারণেই চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে ধর্ম-বর্ণ-রাজনৈতিক মতপার্থক্য নির্বিশেষে সকলে মিলে স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে আন্দোলনে শামিল হয়। যে কোনো মতকে সমূলে ও যেনতেনভাবে দমনের বিরুদ্ধেই ছিল সেই আসামান্য গণজাগরণ। যার শুরুর নেতৃত্বে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। এদের মধ্যে ছাত্রীদের অতুল বীরত্বগাথা উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে আছে।
দেশের অকুতোভয় নারীদের সমান অধিকার নিশ্চিত করবে না রাষ্ট্র– রাজনীতিতে সেই আলোচনা এখন চলমান। ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো যুক্তি দিচ্ছে: নৈতিকতা ও পর্দাপ্রথার অভাবে অনৈতিকতা সমাজে প্রভাব বিস্তার করেছে।
যুক্তির বিরুদ্ধে অসহিষ্ণু আচরণ থেকে সকলকে বেরিয়ে আসতে হবে। যুক্তি-বুদ্ধির চর্চা বাড়িয়ে বিবেচনাবোধের উন্মেষে কাজ করতে হবে। নারী বা পুরুষ বাস্তবিক অর্থে সমাজ তৈরি করে। সমাজই শিখিয়ে দেয়– তুমি নারী। তোমার জন্য এই-এই কাজ নিষিদ্ধ; তোমার চুল দেখা গেলে তুমি ধ্বংস হয়ে যাবে! নিজেরা নিয়ন্ত্রক ও প্রধান হয়ে সমাজে আসন গেড়ে বসবার জন্য পুরুষরাই এসব নারীর ওপর প্রয়োগ
করতে চায়।
পরম করুণাময় স্রষ্টার কাছে তার যাবতীয় সৃষ্টিই সমমর্যাদার। নইলে একটি মাত্র ধর্ম অবশিষ্ট রেখে অন্য সকল ধর্মের সৃষ্টি-প্রজনন বন্ধ করে দিতে পারতেন স্রষ্টা। তা হয়নি; হবেও না কোনোদিন। সৃষ্টির বৈচিত্র্যই বহুত্ববাদ, নানা মত-পথ। আর বিশ্বাস সবসময়ই অতি ব্যক্তিগত। যার যার স্রষ্টাকে ব্যক্তি তার তার মতো অনুভব করেন। ব্যক্তির পাপ-পুণ্যের বিচার তার স্রষ্টা তার সাথেই করবেন। এতে ইহজাগতিক রাষ্ট্র বা তার দায়িত্বরত রাজনীতিকদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই। বরং ব্যক্তি যাতে রাষ্ট্রের কাছ থেকে গণতন্ত্র, বাকস্বাধীনতা, সমমর্যাদাসহ মৌলিক অধিকার নিশ্চিন্তে পেতে পারেন, তার দায়িত্ব নিতে হবে রাজনীতিকদের। যে কোনো মতবাদের রাজনীতিবিদদের সেটিই দায়িত্ব।
এই দায়িত্ব পালনে যদি তারা বিশেষ কোনো ধর্মে নির্দেশিত পথ অবলম্বন করতে চান, সেটিও তাদের আয়ত্ত করতে হবে সব লিঙ্গ-ধর্ম-মত-পথের মানুষের সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করবার মধ্য দিয়ে। পরস্পরের প্রতি সংশয় বা অভিযোগ নয়; পরমতসহিষ্ণুতার সঙ্গে সকলের কথা শুনবার পরিসর অবশ্যই সমাজে তৈরি করতে হবে। সরকারসহ সব রাজনৈতিক দল পরমতসহিষ্ণুতার সঙ্গে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ধর্মের ব্যবহার ও অনুশীলনে নিজেদের সততা ও দায়বদ্ধতা প্রকাশ করবে, এটিই প্রত্যাশা করি।
মাহবুব আজীজ: উপসম্পাদক,
সমকাল; সাহিত্যিক
mahbubaziz01@gmail.com
সূত্র: সমকাল










