
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে নির্বাচন হতে যাচ্ছে। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে গণভোট না হলেও এবারের নির্বাচনটি বিশেষ তাৎপর্যবহ। যে দেশে পরপর তিনটি অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন হয়েছিল এবং তারই প্রেক্ষাপটে ঘটেছে রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থান, সেখানে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজনও বড় সংস্কার বলে বিবেচিত হবে। কেমন নির্বাচন গ্রহণযোগ্য, সেটা কাউকে বলে দিতে হবে না। গ্রহণযোগ্য একাধিক নির্বাচনের অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে।
বে প্রায় পৌনে ১৩ কোটি ভোটারের তরুণ অংশের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা নেই এমন নির্বাচনের। বিপুলসংখ্যক বয়স্ক ভোটারও বিগত নির্বাচনগুলোয় ভোট দিতে আগ্রহী হয়নি। অতিসাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, ৯০ শতাংশ ভোটারই ভোট দিতে আগ্রহী এবার। নির্বাচনের পরিবেশ শেষতক ইতিবাচক থাকলে ভোটের হার সন্তোষজনক হবে বলে ধারণা। ৮৭ শতাংশ ভোট পড়ার রেকর্ডও রয়েছে দেশে।
এ দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়েও বিতর্ক থাকে; সেটা অবশ্য সংকটের জন্ম দেয় না যদি পরাজিত পক্ষ সংসদে গিয়ে বসে এবং সরকার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারে। ‘গ্রহণযোগ্য’ বিভিন্ন নির্বাচন নিয়েও পরাজিত পক্ষ কম অভিযোগ করেনি। সেসব অভিযোগ জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অবশ্য গুরুত্ব পায়নি।
গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত কোনো নির্বাচনের ফল পুরোপুরি বদলে দিয়ে কাউকে ক্ষমতায় আনা হয়েছে, এমনটি শোনা যায়নি। যেমন ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি খারাপ করলেও তাদের কেউ দাবি করে না যে, দলটি বিজয়ী হতো। ১৯৭৯ সালের নির্বাচন নিয়েও আওয়ামী লীগারদের বক্তব্য হলো, চাপের মুখে থেকে নির্বাচনটি করতে না হলে তারা প্রাপ্ত আসনের হয়তো আরও ৫০ শতাংশ বেশি পেতেন।
তাতেও দলটি বিজয়ী হতো না। এত যে প্রশংসিত ১৯৯১ সালের নির্বাচন; তা নিয়েও জাতীয় পার্টি (জাপা) একই অভিযোগ করতে পারে। আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত দল অবশ্য সবসময়ই চাপের মুখে থেকে নির্বাচন করে। এটা নিয়তির মতো।
শুধু চাপে থাকার নিয়তি নয়; আওয়ামী লীগ আসন্ন নির্বাচনে অংশই নিতে পারছে না কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায়। দলটির নেতৃস্থানীয় প্রায় সবাইকে হয় দেশ ছাড়তে, না হয় কারাগারে যেতে হয় ক্ষমতাচ্যুতির পরপরই। তাদের একটি অংশ এখন ‘নো বোট নো ভোট’ প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে এতে সমর্থকরা কতখানি সাড়া দেবেন, স্পষ্ট নয়।
একাধিক জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগ সমর্থকদের একাংশ ভোট দিতে যাবেন এবং তাদের সিংহভাগ বিএনপিকে ভোট দিতে ইচ্ছুক। বাস্তবে কী ঘটবে, আমরা জানি না। নির্বাচনের শেষ দিকে ভোটারদের একাংশের মনোভাবে বড় পরিবর্তন আসতেও দেখা যায়। তবে কট্টর সমর্থকদের মধ্যে হেলদোল পরিলক্ষিত হয় না।
নির্বাচনে অংশগ্রহণের আইনগত সুযোগ থাকলেও বিদ্যমান প্রতিকূল পরিবেশে আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিত কিনা; নিলেও কেমন করত; সেটা এখন বলা কঠিন। বিগত তিনটি নির্বাচনে তার সহযোগী জাতীয় পার্টিকেও প্রচণ্ড চাপের মুখে নির্বাচন করতে হচ্ছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের কার্যালয় আক্রান্ত হয়েছে একাধিকবার।
রংপুর অঞ্চলের বাইরে তারা স্বাভাবিকভাবে প্রচার চালাতে পারছে বলে খবর নেই। হালে দলটি আরেক দফা ভাঙনের শিকার হয়েছে। গণঅভ্যুত্থানের শেষ দিকে কিছুটা অবস্থান বদলালেও দলটি রেহাই পায়নি। তারপরও জাপা নির্বাচনে আছে এবং অঞ্চলবিশেষে হয়তো খুব খারাপ করবে না। আওয়ামী লীগের ‘দোসর’ বিবেচিত অন্যান্য দল আইনগত সুযোগ থাকলেও নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
তাদের প্রধান নেতারা হয় আত্মগোপনে, নয়তো কারাগারে। তবে বিগত শাসনামলে প্রায় নিয়মিতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী একটি ধর্মভিত্তিক দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে বাধাহীনভাবে। কিছুদিন আগেও তারা জামায়াত জোটে থেকে রীতিমতো ‘আন্দোলনে’ শামিল ছিল। তাদের ইশতেহার ঘোষণার খবরও গণমাধ্যমে এসেছে গুরুত্বের সঙ্গে।
বিএনপি বাদে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রধান দলগুলোর ইশতেহার ঘোষণা হয়ে গেছে। আজ শুক্রবার বিএনপির ইশতেহার ঘোষণার কথা। নির্বাচিত হলে তারা কী কী করতে চায়, সেই ধারণা অবশ্য ইতোমধ্যে দেওয়া হয়েছে। মাঠে থাকা দলগুলোর মধ্যে যে কোনো স্বাভাবিক নির্বাচনে বিএনপিরই ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
গণঅভ্যুত্থানের পর দ্রুত নির্বাচন হলে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা আরও বেশি ছিল। দ্রুত নির্বাচন আয়োজনের বিরোধী পক্ষগুলো বেশি তৎপর ছিল তখন। নির্বাচন আয়োজনের বদলে চলে দীর্ঘ সংস্কার আলোচনা। এর ধারাবাহিকতায় নির্বাচনের সঙ্গে গণভোটও হতে যাচ্ছে। আর এতে ‘হ্যাঁ’র পক্ষে সরকারের প্রচারণা নিয়ে প্রশ্ন উঠলেও প্রত্যাশা রয়েছে এর মধ্য দিয়ে অন্তত কিছু মৌলিক সংস্কারে অগ্রগতি হওয়ার।
তবে ‘না’ জয়যুক্ত হলেও বিজয়ী দলের প্রতি দাবি থাকবে তার নিজস্ব সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়নের। নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব দলই কমবেশি রাষ্ট্র সংস্কারের পক্ষে, এটা লক্ষণীয়। সবচেয়ে বেশি ক্ষমতাপ্রত্যাশী দল বিএনপির নিজের ৩১ দফা সংস্কার প্রস্তাবের কথা সবারই জানা।
নির্বাচনটা শেষতক হতে যাচ্ছে এবং এর পরিবেশ এখন পর্যন্ত খারাপ নয়; এটাও স্বস্তিকর। তপশিল ঘোষণার পরও অনেকে নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছিলেন। তৎপর ‘ভিউ ব্যবসায়ী’দের বাইরে সাধারণ মানুষও নির্বাচন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলে সেটা বিবেচনার বিষয় বৈ কি। রাজনৈতিক দলগুলো বাধাহীনভাবে অংশ নিতে পারলেই গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের শর্ত পূরণ হয়ে যায় না। ভোটারদেরও এর পরিবেশ বিষয়ে আশ্বস্ত হওয়া জরুরি। আশঙ্কার তুলনায় এ পর্যন্ত কম সহিংসতা ঘটায় তারা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে শেষ সময়ে পরিবেশ সহিংস হয়ে ওঠার শঙ্কা রয়েছে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার ও বিপজ্জনক সন্ত্রাসী গ্রেপ্তারে অগ্রগতি কম বলে।
আওয়ামী লীগ মাঠে না থাকলেও এবারের নির্বাচনে বিএনপির দীর্ঘদিনের মিত্র জামায়াতে ইসলামী জোটসঙ্গীদের নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে নেমেছে। ক্ষমতায় চলে আসার বিষয়েও আশাবাদী দেখা যাচ্ছে তাদের। এ উপাদান নির্বাচনকে আকর্ষণীয় করলেও শেষ মুহূর্তে এটা পরিবেশকে সহিংস করে তুলতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার শঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
এটা মোকাবিলায় সরকারের পাশাপাশি সশস্ত্র বাহিনীর সতর্কতাও বিশেষভাবে কাম্য। গণঅভ্যুত্থানের পর একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন করা না গেলে এর দায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকেই নিতে হবে। গণতন্ত্রে উত্তরণের বদলে দেশ অধিকতর বিপর্যয়ের মুখে পড়লে বাংলাদেশ সেসব দেশের কাতারে শামিল হবে, যারা গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরশাসনের অবসান ঘটালেও তা থেকে কোনো সুফল পায়নি।
নির্বাচনে জনগণ প্রধান অংশীজন বটে। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিযোগিতামূলক অংশগ্রহণ এর অপরিহার্য শর্ত। তবে জনপ্রশাসন, ব্যবসায়ী সম্প্রদায়, সংবাদমাধ্যম, আন্তর্জাতিক মহলসহ বিভিন্ন পক্ষ একে প্রভাবিত করতে পারে। এর মধ্যে জনইচ্ছার সর্বোচ্চ প্রতিফলন ঘটানোর চেষ্টায় থাকতে হয় নির্বাচন কমিশনকে। আর সরকারকে জোগাতে হয় সহায়তা।
আমরা শেষ পর্যন্ত আশা করে থাকব, নির্বাচনে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর কোনো প্রশ্ন উঠবে না। সরকারে যারাই আসুক; তাদের দায়িত্ব গ্রহণও থাকুক বিতর্কের ঊর্ধ্বে।
হাসান মামুন: সাংবাদিক, কলাম লেখক
সূত্র: সমকাল