সাপ্তাহিক ছুটির সঙ্গে সামনে সংসদ নির্বাচনের ছুটি। এর কয়েকদিন পরে রোজা। ঠিক এমন সময় চট্টগ্রাম বন্দরে ধর্মঘটে ভোগ্যপণ্য সরবরাহ দারুণভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, তারা পণ্য খালাস করতে পারছেন না। এতে পণ্য সরবরাহে সংকট তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বাড়ছে বিলম্ব মাশুল। যার প্রভাব পড়বে পণ্যের দামে।
ব্যবসায়ীরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও রোজাকেন্দ্রিক সরবরাহ সচল রাখতে দ্রুত বিষয়টি সুরাহা কামনা করছেন।
বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯৭ শতাংশের বেশি হয় চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। এ বন্দর আমদানিনির্ভর ভোগ্যপণ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। কিন্তু ধর্মঘটে বন্দরের কার্যক্রম প্রায় পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। ফলে আমদানি ভোগ্যপণ্য খালাস নিয়ে তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা।
নিউমুরিং টার্মিনাল ইজারা না দেওয়াসহ চার দফা দাবিতে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে ধর্মঘট শুরু করেন শ্রমিক–কর্মচারীরা। এতে সকালে বন্দরের বহির্নোঙর ও জেটিতে পণ্য ওঠানো–নামানো বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে গত সপ্তাহেও এ ধর্মঘট চলে।
এতে আমদানিনির্ভর ছোলা, ডাল, তেল, চিনি, খেজুরের মতো পণ্যের দাম হু হু করে বেড়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। রোজা শুরু হতে আর দুই সপ্তাহও বাকি নেই। এই সময়ে এসব পণ্যের সরবরাহ কমে গেলে দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের (এমজিআই) উপ-মহাব্যবস্থাপক তসলিম শাহরিয়ার জাগো নিউজকে বলেন, ‘দেশের একমাত্র বন্দরে এমন অচলাবস্থা সার্বিক পণ্য আমদানিতে প্রভাব ফেলবে। বন্দরে আমাদের আমদানি পণ্যের কনটেইনার আছে, সেগুলো খালাস হচ্ছে না, ড্যামারেজ আসবে। রোজার অনেক পণ্য এসেছে। সেগুলো সরবরাহ বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব বাজারে পড়বে।’
আরেক খাদ্যশস্য আমদানিকারক বিএসএম গ্রুপের চেয়ারম্যান আবুল বশর চৌধুরী বলেন, ‘শবেবরাতের ছুটি, সামনে নির্বাচনের ছুটি। এর পরপরই শুরু হবে রমজান। এর মধ্যে এ কর্মবিরতিতে পণ্য কীভাবে খালাস হবে—এ নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। অনেক আমদানিকারকের পণ্য এখন বন্দরে আটকা।’
তিনি বলেন, ‘এ পরিস্থিতি দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য অচলাবস্থার দিকে নিচ্ছে, যা আরও দীর্ঘমেয়াদি হলে খুব সমস্যা তৈরি করবে। এজন্য সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।’
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ জাগো নিউজকে বলেন, ‘লজিস্টিকস বা সরবরাহ খাত বিঘ্নিত হলে কিংবা বন্দরে দীর্ঘ অচলাবস্থা তৈরি হলে তা জাতীয় অর্থনীতিতে মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির আকারের তুলনায় আমাদের বন্দরের সক্ষমতা ও দক্ষতা এখনো অনেক কম। সে অবস্থায় অচলাবস্থা কাম্য নয়।’
চট্টগ্রাম বন্দরে গত ৩১ জানুয়ারি শনিবার থেকে আংশিক কর্মবিরতি শুরু হলেও মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেন চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা মো. ইব্রাহিম খোকন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘সরকার যতক্ষণ ইজারা প্রক্রিয়া থেকে ফিরে না আসবে ততক্ষণ এ কর্মসূচি চলবে।’
তবে রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে বর্তমান সরকারের আমলে কোনো চুক্তি হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন।
বিকেলে রাজধানীর বেইলি রোডে ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, নিউমুরিং টার্মিনাল নিয়ে সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) কাঠামোর আওতায় আলোচনা শুরু হয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ এবং অপর পক্ষের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে একটি প্রকল্পভিত্তিক পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা চলছে।
এ ঘোষণার পরও এখন পর্যন্ত আন্দোলনকারী তাদের ধর্মঘটের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। ফলে বন্দর থেকে আমদানি পণ্যের ডেলিভারি, কনটেইনার হ্যান্ডলিং, জেটিতে জাহাজ আনা নেওয়া, অফডক থেকে কনটেইনার আনা-নেওয়া, বন্দরের ভেতরে পণ্যবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ। তবে বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য খালাস স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানা যায়। কিন্তু পণ্য বন্দর থেকে খালাস হচ্ছে না।
সূত্র: জাগোনিউজ২৪