শিরোনাম:

নওগাঁয় স্ত্রীকে পিটিয়ে হত্যা, স্বামী আটক

নারী-‎শিশু নির্যাতন বন্ধে মহিলা জামায়াতের মানববন্ধন, ১০ দফা প্রস্তাবনা

ইফতারের পর মাথাব্যথা? এড়াবেন যেভাবে

খেজুর দিয়ে রোজা ভাঙা কেন উপকারী

ইফতারে সুস্বাদু ডিমের চপ

মব সহিংসতার ন্যায্যতা যেভাবে তৈরি করা হচ্ছে

শিরোনাম২৪ঃ
প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৪, ২০২৬
ড. আখতার সোবহান মাসরুর

ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নয়, একটি ভাষিক শাসনও বটে। ফ্যাসিবাদ বন্দুক দিয়ে শুরু হয় না, শুরু হয় শব্দ ও ভাষা দিয়ে। আগে ভাষার অর্থ ভাঙে, তারপর যুক্তি ভাঙে, শেষে মানুষ। ভাষা এখানে শুধু বাস্তবতা বর্ণনা করে না; বরং বাস্তবতা নির্মাণ করে। কে মানুষ আর কে শত্রু, কে কথা বলার অধিকার রাখে, রাখে না–এসবের অনেকটাই ভাষার মধ্য দিয়ে নির্ধারিত হয়। ফ্যাসিবাদী কথন ভিন্নমতকে অপরাধে পরিণত করে এবং সহিংসতার নৈতিক ন্যায্যতা তৈরি করে।

ফ্যাসিবাদের ভাষা সাধারণত স্লোগানভিত্তিক, আবেগপ্রবণ ও বিদ্বেষমূলক। এখানে যুক্তির স্থান নেয় ভয়, ঘৃণা ও বিদ্বেষ। অপরকে হত্যা করার আগে তাকে ভাষার মাধ্যমে হত্যাযোগ্য করে তোলা হয়। ট্যাগিংয়ের ফলে হত্যা আর অপরাধ থাকে না, তা হয়ে ওঠে পরিষ্কার অভিযান। এ ভাষা পুরুষতান্ত্রিকও বটে, নারীকে নষ্টা, বেপর্দা, ভ্রষ্টা বলে। সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধীদের প্রতি মহলবিশেষের নারীর জননেন্দ্রিয়কে যৌন রূপক হিসেবে ব্যবহার করে পুরুষতান্ত্রিক গালি দেওয়ার প্রবণতা লক্ষণীয়।

সহিংস শব্দের সঙ্গে কোনো কোনো ক্ষেত্রে যৌন শব্দ মিশিয়ে নতুন একটা নয়া ফ্যাসিবাদী ভাষা গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশে সহিংসতাকে স্বাভাবিক ও বৈধ করে তোলা হচ্ছে ভাষা দিয়েই। গণপিটুনি হয়ে যাচ্ছে ‘জনরোষ’, হামলাকারীরা ‘বিক্ষুব্ধ জনতা’, ‘তৌহিদি জনতা’ ইত্যাদি।

ফ্যাসিবাদ সহিংস ভাষা দিয়ে চিন্তাকে হত্যা করে। উম্বার্তো একো বলেন, ফ্যাসিবাদের একটি বৈশিষ্ট্য হলো ভাষাকে গরিব করে ফেলা। তখন দ্বৈত বিভাজনে আমরা ভালো আর ওরা খারাপে পরিণত হয়। জর্জ অরওয়েল তাঁর ডিস্টোপিয়ান রাজনৈতিক ফিকশন ‘১৯৮৪’-এ ফ্যাসিবাদ কী করে নতুন ভাষা (নিউস্পিক) তৈরি করে, তা দেখান। অন্যত্র তিনি বলেন, ভাষা চিন্তাকে দূষিত করে আবার চিন্তাও ভাষাকে দূষিত করে। বাংলাদেশে আমাদের এই দুই অবক্ষয়ই হয়েছে। সাধারণ পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাষাকেও তার খেসারত দিতে হচ্ছে।

ভাষাজ সহিংসতার কারণে বাংলাদেশের সমাজ ও রাজনীতিতে পারস্পরিক আলোচনা ও বোঝাপড়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে, যে কোনো বিরোধিতা শত্রুতায় রূপ নিচ্ছে। ইউর্গেন হেবারমাস মনে করেন, ফ্যাসিবাদ কেবল ভীতি উৎপাদন আর একনায়কত্ব নয়, এটা ভাষা ও পারস্পরিক যোগাযোগ ধ্বংস করে। গণতন্ত্র টিকে থাকে যুক্তিনির্ভর ভাষা ও মুক্ত সংলাপের মাধ্যম হিসেবে, কিন্তু ফ্যাসিবাদে ভাষা আর বোঝাপড়ার মাধ্যম থাকে না, হয়ে ওঠে দমনের কৌশলগত হাতিয়ার।

মাঠ থেকে শুরু করে সামাজিক মাধ্যম সব জায়গায় ঘৃণা-ভাষা ও হুমকি বাড়ছে। যুক্তির বদলে আবেগ ও বিদ্বেষ, আলোচনার বদলে মব-মানসিকতা বাড়ছে।

আমাদের দেশে রাজনৈতিক ইসলামের ক্ষমতাকেন্দ্রিক সহিংস ব্যাখ্যার সঙ্গে সাধারণ মানুষের আধ্যাত্মিক ইসলামের বুঝ ও ব্যাখ্যার পার্থক্য আছে। ফ্যাসিবাদ টেকস্ট বা রচনার একাধিক ব্যাখ্যায় ভয় পায়, ফলে টেকস্টের অর্থের বহুমাত্রিক সম্ভাবনা ও পুনর্ব্যাখ্যাকে দমন করে। ফরাসি দার্শনিক পল রিক্যার মনে করেন, ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করতে হলে ব্যাখ্যার অধিকার রক্ষা করতে হবে।

কোনো রচনার একক অর্থ মানতে অস্বীকৃতি ও বহু বর্ণনা ফিরিয়ে আনতে হবে। সন্দেহের ভাষ্য (হারমেনিউটিকস অব সাসপিশন) টিকিয়ে রাখতে হবে। প্রতিটি ক্ষমতার ভাষ্যের সামনে প্রশ্ন ছুড়ে দিতে হবে। কারণ ব্যাখ্যা বেঁচে থাকলেই চিন্তা বেঁচে থাকবে, আর চিন্তা বেঁচে থাকলেই ফ্যাসিবাদ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বাংলাদেশে বড় ধরনের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও পুঁজিতন্ত্র বা আর্থসামাজিক কাঠামোগত পরিবর্তন নিয়ে কোনো আলাপ নেই। যত আলোচনা হচ্ছে সবটা ওপরভাসা, লোক দেখানো, বাহ্যিক, রেটরিক। ওয়াল্টার বেনজামিন বলেন, ফ্যাসিবাদ জনগণকে সংগঠিত করে কিন্তু সম্পত্তির কাঠামোতে কোনো পরিবর্তন আনে না। বাস্তব ক্ষমতায় হাত দেয় না। জনগণকে ভাষা ও আবেগ দিয়ে মোহিত রাখা হয় কিন্তু শ্রেণিবৈষম্য ও শোষণ আগের মতোই থাকে।

ফ্যাসিবাদ শুধু একটি রাজনৈতিক শাসন ব্যবস্থা নয়, এটি একটি ভাষিক ও নান্দনিক প্রকল্পও বটে। এতে মানবজাতি নিজের ধ্বংসকে নান্দনিক আনন্দে অনুভব করতে শুরু করে। মানুষ যখন হানাহানি, যুদ্ধ, মৃত্যুকে দৃশ্যত চমৎকার মনে করতে শুরু করে তখন ফ্যাসিবাদ কায়েম হয়।

আলবার্টো টোসকানো মনে করেন, লেট ফ্যাসিবাদ বা আখেরি ফ্যাসিবাদ নিওলিবারাল সংকটের ভেতর গড়ে ওঠা এক ভাষিক, আইনি ও প্রশাসনিক কর্তৃত্ববাদ। লেট ফ্যাসিবাদ আর আগের মতো একনায়ক, ইউনিফর্ম বা প্রকাশ্য সর্বাত্মক মতাদর্শের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এটি গণতন্ত্র, মিডিয়া এবং নাগরিক ভাষার ভেতরেই নতুনভাবে জন্ম নেয়। আজকের ফ্যাসিবাদ গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই বাস করে। এটি কাজ করে ভাষা, বয়ান, স্লোগান, মিম, পুনরুক্তি ও সংকেত ভাষার মাধ্যমে।

লেট ফ্যাসিবাদ এলিটবিরোধী ভাষা ব্যবহার করলেও এলিটের পক্ষেই কাজ করে, ভান করে যে তারা দুর্নীতিগ্রস্ত এলিট ও এস্টাবলিশমেন্টের বিরুদ্ধে, কিন্তু কখনোই পুঁজিবাদকে কাঠামোগতভাবে আক্রমণ করে না; বরং ক্ষোভকে ঘুরিয়ে দেয়। ফ্যাসিবাদী ভাষা শুধু মতাদর্শকেন্দ্রিক নয়, কর্মমূলক। এই ভাষা সহিংস আচরণকে উস্কে দেয়। ভাষা এখানে হয়ে ওঠে সহিংসতার পূর্বপ্রস্তুতি।

ভাষার মধ্য দিয়েও প্রতিরোধ ও মুক্তির পরিসর তৈরি করা যেতে পারে। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ মানে শুধু নির্বাচন, আইন আর সভা-সমাবেশ নয়; এটি একটি ভাষিক ও সাংস্কৃতিক সংগ্রামও বটে। স্লোগানকে প্রশ্ন করা, বহু ব্যাখ্যার অধিকার রক্ষা করা, সহিংসতা ও বিদ্বেষের ভাষা ও বয়ানের উন্মোচন, মানবিক ও প্রতিরোধের ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখা–এসবই হতে পারে ভাষিক প্রতিরোধের অংশ। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই মানে শুধু রাষ্ট্রক্ষমতার বিরুদ্ধে নয়, ভাষার দখল পুনরুদ্ধারেরও সংগ্রাম।

ড. আখতার সোবহান মাসরুর: লেখক ও নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম ছাত্রনেতা

সূত্র: সমকাল

সর্বশেষ সংবাদ
সর্বাধিক পঠিত